টাকার টানাটানি কেবল রাতের ঘুম কেড়ে নেয় না। নিয়মিত অভাবের কারণে তৈরি হওয়া মানসিক চাপ মস্তিষ্কের গঠনেও প্রভাব ফেলতে পারে। এমনই আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে এসেছে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের একদল বিজ্ঞানীর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায়।
‘ইনোভেশন ইন এজিং’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, কয়েক বছরের সাময়িক টানাপোড়েন নয়, বরং দশকের পর দশক ধরে চলা দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক অভাব ও দুশ্চিন্তা মধ্যবয়সের পর মানুষের মস্তিষ্ককে দ্রুত বুড়িয়ে দিতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে স্মৃতিশক্তিতেও।
দীর্ঘ সাত দশকের অনুধাবন
১৯৪৬ সালের মার্চে যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া ২ হাজার ৭৫৯ জন মানুষের জীবনপ্রণালি পর্যবেক্ষণ করে গবেষণাটি চালানো হয়। বিজ্ঞানীরা ২৬, ৪৩ ও ৫৩ বছর বয়সে তাঁদের পারিবারিক আয়ের তথ্য সংগ্রহ করেন। পাশাপাশি ৩৬ থেকে ৫৩ বছর বয়সের মধ্যে তাঁরা বিল মেটাতে বা সংসার চালাতে আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, অন্তত দুবার সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ আয়ের সারিতে থাকা ব্যক্তিরা এবং নিয়মিত আর্থিক কষ্টে ভোগা ব্যক্তিরা ৫৩ বছর বয়সে স্মৃতিশক্তি ও চিন্তার গতি পরীক্ষায় তুলনামূলক কম নম্বর পেয়েছেন।
পরে ৬৯ থেকে ৭১ বছর বয়সে তাদের মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যান করা হয়। এতে দেখা যায়, যাদের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক অভাব ছিল, তাঁদের মস্তিষ্ক তুলনামূলক বেশি সংকুচিত বা শুকিয়ে গেছে এবং মস্তিষ্কের তরলপূর্ণ গহ্বর প্রসারিত হয়েছে। এগুলো মস্তিষ্কের দ্রুত বার্ধক্যের অন্যতম লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অভাব কেন মস্তিষ্কের ক্ষতি করে
বিজ্ঞানীদের মতে, আর্থিক সংকট মস্তিষ্ককে মূলত দুটি উপায়ে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। টাকার চিন্তায় দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপে থাকলে শরীরে একধরনের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হতে পারে। এটি মস্তিষ্কের কোষের ক্ষয় ত্বরান্বিত করতে পারে।
এ ছাড়া সংসারের বাজেট মেলানো, দেনা পরিশোধ কিংবা প্রয়োজন মেটানোর চিন্তায় মস্তিষ্কের বড় একটি অংশ ব্যস্ত থাকে। ফলে মনোযোগ দেওয়া বা সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটের কারণে মস্তিষ্কের ক্ষয় সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। পুরুষ, শৈশবে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হওয়া ব্যক্তি এবং অ্যালঝেইমার্স রোগের ঝুঁকিপূর্ণ জিন বহনকারীদের ক্ষেত্রে আর্থিক চাপের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিল।
বিশেষ করে ১৯৪৬ সালের প্রজন্মের পরিবারগুলোতে পুরুষদের একমাত্র উপার্জনকারী হিসেবে দেখা হতো। ফলে সংসারের মূল দায়িত্ব বহনের বাড়তি মানসিক চাপ তাঁদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এটি একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। তাই এর মাধ্যমে আর্থিক সংকট সরাসরি মস্তিষ্কের ক্ষয়ের কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
তবু বছরের পর বছর ধরে মানুষের জীবন পর্যবেক্ষণ করে পাওয়া এই গবেষণার ফল ইঙ্গিত দেয়, ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের মতো সমস্যা প্রতিরোধে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সচেতনতা ও জিনগত বিষয়গুলোর পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ।
স্মৃতিশক্তি ভালো রাখার উপায়
১. মস্তিষ্ককে সুস্থ ও সক্রিয় রাখতে কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে দৈনন্দিন কাজে স্মৃতিশক্তির সমস্যা তৈরি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
২. প্রতিদিন দ্রুত হাঁটা বা বায়বীয় ব্যায়াম করলে মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালন বাড়ে। এটি স্মৃতিশক্তি ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে।
৩. পাজল মেলানো, বই পড়া, নতুন বাদ্যযন্ত্র শেখা কিংবা নতুন কোনো শখের মাধ্যমে মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা যেতে পারে।
৪. বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটালে মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতা কমতে পারে, যা স্মৃতিভ্রম প্রতিরোধে সহায়ক।
৫. ক্যালেন্ডার বা ডায়েরিতে কাজের তালিকা রাখুন। চাবি ও মানিব্যাগের মতো প্রয়োজনীয় জিনিস নির্দিষ্ট স্থানে রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৬. প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে পারে।
৭. ফলমূল, শাকসবজি, পূর্ণশস্য ও মাছজাতীয় প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
৮. উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা অবসাদের মতো সমস্যার সঠিক চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোও গুরুত্বপূর্ণ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









