প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের করের বোঝা কমানো, কালো টাকা সাদা করার বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার এবং বিভিন্ন খাতে কর হ্রাসসহ একাধিক জনবান্ধব সংশোধনী প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেছেন তিনি।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমান বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি জাতি পুনর্গঠনের বাজেট। দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি ও বিরোধী—সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের সময় পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সরকার পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেও প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর বিষয়ে তিনি জানান, ইতোমধ্যে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ১৫টির বেশি ব্যাংক আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৬০টিরও বেশি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করেছে।
কর ব্যবস্থাকে আরও জনবান্ধব করার লক্ষ্যে ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ কর বছরের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ কর বছরের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ কর বছরের জন্য ৫ লাখ টাকা করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, জমি রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত প্রস্তাবিত বিশেষ বিধান নিয়ে জনমনে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রয়েছে—এমন বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তাই জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ওই বিধান সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের জন্য অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। একইভাবে ব্যাংক হিসাব খোলা, বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন এবং সম্পত্তি মিউটেশনের ক্ষেত্রে টিআইএন দাখিলের বাধ্যবাধকতাও প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন।
শিক্ষা খাতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত ১০ শতাংশ কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি গবেষণা কার্যক্রম জোরদার, ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব স্থাপন এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
স্টার্টআপ খাতে ৫০০ কোটি টাকার তহবিল গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, এটি তরুণ উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। এছাড়া ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সার্চ ইঞ্জিনে বিজ্ঞাপনের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করারও প্রস্তাব দেন।
দেশীয় শিল্পের বিকাশে চিংড়ি শিল্প, ওষুধ শিল্প, বৈদ্যুতিক তার, ফায়ার ডোর, এলইডি লাইট, প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড বিল্ডিং, ক্যাশনাট প্রসেসিংসহ বিভিন্ন খাতের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট কমানো বা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেন তিনি। পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব ভ্যাট কাঠামো গড়ে তুলতে স্বর্ণ, ডায়মন্ড ও রৌপ্য অলংকার, বিটিআরসির রেভিনিউ শেয়ারিং এবং মাছ সরবরাহ খাতে ভ্যাট পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সুশাসন জোরদারে সুপ্রিম কোর্টের জন্য অতিরিক্ত ১০০ কোটি টাকা এবং আইন মন্ত্রণালয়ের জন্য আরও ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন। একই সঙ্গে দক্ষ, সৎ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত জনপ্রশাসন গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
বক্তব্যের শেষদিকে পরিবেশবান্ধব বাহন হিসেবে সাইকেলের ওপর আরোপিত সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার জন্য অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









