খাদ্য আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োাজনীয় পুষ্টি সরবরাহের প্রধান উৎস। প্রতিদিন আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি তা আমাদের শরীরে ভেঙে গিয়ে শক্তি, প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানে রূপান্তরিত হয়। এই উপাদানগুলো আমাদের শরীরের বৃদ্ধি, মেরামত এবং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অপরিহার্য। দেশের খাদ্যপণ্যে দূষণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি প্রতিনিয়ত খাদ্যদূষণ বাড়াচ্ছে। ফলে আমাদের সন্তান, বাবা-মা, ভাই বোন আপনজন সবাই ভুক্তভোগী। বর্তমানে হামে শিশু মৃত্যু বেড়েছে, বিশেষ করে এইরকম বিভিন্ন রোগব্যাধি থেকে শিশুদের নিরাপদ রাখতে শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে সকলপ্রকার খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
নিজেদের স্বার্থেই আমাদের সকলকে একসঙ্গে এই সংকট মোকাবিলায় কাজ করতে হবে। দেশে খাদ্যপণ্যে দূষণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতির চিত্র ভয়ংকর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গবেষণা অনুযায়ী, খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত তিন ভাগের এক ভাগ শিশু মারা যাচ্ছে। শুধু খাদ্যবাহিত রোগে প্রতি বছর বিশ্বে ৬০ কোটি এবং বাংলাদেশে ৩ কোটি শিশু আক্রান্ত হয়। খাবারে চার ধরনের দূষণ থাকতে পারে।
ভারী ধাতু, কীটনাশক-জীবনাশক এর অবশিষ্টাংশ, তেজস্ক্রিয়তা ও জৈবদূষক। অন্যদিকে,হাঁস-মুরগির খামারগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ প্রয়োগ হয়। মুরগিকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলে তা ৭ থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত থেকে যায়। ২৮ দিন পার হওয়ার আগেই মুরগিকে বাজারজাত করা হলে সেই মুরগির মাংসের মাধ্যমে মানবদেহে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ঢুকতে পারে।
দেহের জন্য অত্যাবশ্যক পুষ্টি উপাদান শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট। সেই সঙ্গে প্রয়োজন আমিষ বা প্রোটিন; স্নেহ পদার্থ বা ফ্যাট, যাকে লিপিডও বলা হয়, আর দরকার ভিটামিন, মিনারেল বা খনিজ ও পানি। অত্যাবশ্যকীয় এসব পুষ্টি উপাদনগুলো আমরা বিভিন্ন ধরনের খাবারের মাধ্যমে পাই। পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য নিশ্চিত করতে গিয়ে কখনো কখনো যা খাচ্ছি তা নিরাপদ কি না, সে দিকটি উপেক্ষা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তা একটি জরুরি বিষয়। পাঠ্যপুস্তকে এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। খাদ্য ও পুষ্টি হলো জীবনের একান্ত প্রয়োজনীয় উপাদান।
সঠিক ও পরিমিত খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে একজন মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষ সঠিকভাবে কাজ করতে সক্ষম হয়। খাদ্য শুধু আমাদের ক্ষুধা মেটানোর মাধ্যম নয়; এটি আমাদের শরীরকে শক্তি জোগায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সাহায্য করে এবং সুস্থ জীবনযাপনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্য ও পুষ্টি নিয়ে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অপুষ্টি, খাদ্যের অভাব, দারিদ্র্য এবং অপর্যাপ্ত খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ পর্যাপ্ত পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিশু ও নারীদের মধ্যে অপুষ্টির হার বেশি। এছাড়া, ওজনাধিক্য এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণও বর্তমানে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এদিকে অপুষ্টি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। অপুষ্টি হলো যখন একজন ব্যক্তি পর্যাপ্ত পরিমাণে সঠিক পুষ্টি গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়। অপুষ্টির কারণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, শারীরিক এবং মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। পুষ্টির অভাবে শরীর দুর্বল হয়ে যায় এবং শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। শিশুদের মধ্যে এটি খুবই সাধারণ। পুষ্টির অভাবে শিশুরা অপুষ্টির শিকার হয় এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়। আবার অতিরিক্ত পুষ্টির ফলে শরীরের ওজন বেড়ে যায় এবং ফ্যাট জমা হয়। এটি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ইত্যাদির ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। ওজনাধিক্যের কারণে শরীরের কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দেয় এবং শারীরিক অসুস্থতা বৃদ্ধি পায়। খাদ্য ও পুষ্টি জীবনের অপরিহার্য অংশ। সঠিক খাদ্য গ্রহণ এবং পুষ্টির জ্ঞান শরীরের সুস্থতা, মানসিক বিকাশ এবং কর্মক্ষমতার জন্য অপরিহার্য।
বর্তমানে বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর শীর্ষে অবস্থান করছে খাদ্য সমস্যা। আমাদের দেশে বছরের প্রথম চার মাসের তুলনায় বছরের শেষ আট মাসে খাদ্যসংকটে থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই অনুয়ায়ী আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বড় ধরনের খাদ্যসংকটে পড়তে যাচ্ছে দেশের ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ। এই সময়ে চরম অপুষ্টির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে ১৬ লাখ শিশু। দেশের দুর্যোগপ্রবণ জেলাগুলোর মানুষ এই সংকটে পড়তে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাশিবিরসহ দেশের ৩৬ জেলার ৯ কোটি ৬৬ লাখের বেশি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য প্রকাশ করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিট (এফপিএমইউ) ও জাতিসংঘের তিন সংস্থা। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার বড় ঝুঁকি না থাকলেও সব সময় খাদ্য আমদানি করে দেশের চাহিদা মেটানো বেশ দুরূহ। খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে বহুল পরিচিত দেশগুলোতেও খাদ্য উৎপাদন কম হচ্ছে।
সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। খাদ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে। খাদ্যসংকট আর দুর্ভিক্ষ এক নয়। জলবায়ুজনিত ধাক্কা বিশেষ করে বন্যা, খরা, দূর্যোগ-এগুলো জীবিকা ক্ষতিগ্রস্থ করেছে; খাদ্যসংকটে; পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের চাহিদা বাড়লেও মানবিক সহায়তার তহবিল কমে গেছে এসবই খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। এদিকে সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে খাদ্যঘাটতি, অপুষ্টি ও ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে মূল্যায়ন করা হয়েছে পাঁচটি ফেজ বা ধাপে। ধাপ ১ : সর্বনিম্ন বা স্বাভাবিক, ধাপ ২ : চাপে থাকা, ধাপ ৩ : সংকটে থাকা, ধাপ ৪ : জরুরি অবস্থা এবং ধাপ ৫ : দুর্ভিক্ষ। এতে বলা হয়েছে, দেশের ৩৬ জেলায় বসবাসরত ৯ কোটি ৬৬ লাখের বেশি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ বছর কোনো জেলায় ধাপ-৫ অর্থাৎ দুর্ভিক্ষ দেখা যায়নি, দেখা যাওয়ার আশঙ্কাও নেই। খাদ্য সংকট সমাধানে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, সমন্বিত খাদ্য ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, খাদ্য অপচয় রোধ, এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য।
খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টির এই তথ্য কারও জন্যই স্বস্তিদায়ক নয়। সরকার, উন্নয়ন সহযোগি, বেসরকারি উদ্যোক্তা সবাইকেই খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টি কমাতে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব নিতে হবে। দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমাতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ভাটা, মূল্যস্ফীতির চাপ-সব মিলিয়ে নাগরিকদের বিশাল একটি অংশকে কায়দা করেই জীবনযাপন করতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক মন্দা, জলবায়ু বিপর্যয়, তহবিলের ঘাটতি, খাদ্যবৈচিত্র্যের অভাব-এই কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় যে ধরনের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা দরকার, নীতিনির্ধারণী জায়গায় তার বিস্তার ঘাটতি দেখা যায়। খাদ্য কেবল ক্ষুধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পূর্ণ পুষ্টি আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খাদ্যের অন্যতম শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে যদি প্রতিনিয়ত খাদ্যপণ্যে দূষণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া যায় তবে মহামারি আকার ধারণ করবে । নিঃসন্দেহে এটি একটি জাতীয় সংকট হয়ে দাঁড়াবে। দেশের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সূত্রমতে, আমাদের খাবারে ভারী ধাতু, কীটনাশক ও জীবনাশকের অবশিষ্টাংশ, তেজস্ক্রিয়তা এবং জৈবদূষক-এই চার ধরনের দূষকের উপস্থিতি লক্ষণীয়। সম্প্রতি ৮১৪টি নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে খাবারে অতিরিক্ত মাত্রায় সিসা বা সিসা ক্রোমেট পাওয়া গিয়েছে। এইসব ক্ষতিকারক উপাদান মানবদেহে প্রবেশ করিয়া মস্তিষ্ক, যকৃৎ, কিডনি, হাড় ও দাঁতে জমা হয়। এরফলে শিশুদের হাড় নরম হওয়ায় তা সরাসরি মস্তিষ্কে চলে যায়। এতে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। মূলত খাদ্যদূষণ শুরু হয় খাবারের কাঁচামাল তৈরি থেকেই। কৃষকের চাষাবাদের সময় রাসায়নিক দ্রব্য মিশানো থেকেই এই দূষণের সূত্রপাত হয়। এরপর সেই কাঁচামাল সংরক্ষণ করার জন্য রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে বাজারজাত করা হয়। অতঃপর হোটেলগুলো যখন খাবার তৈরি করে, তখন তৃতীয় স্তরের খাদ্যদূষণ হয় ও মানুষ শ্রী খাদ্য সমূহ ক্রয় করে থাকেন।
অধিকাংশ জনগণ মনে করে না যে ভেজাল খাবার বা খাদ্যদূষণ একটি অপরাধ। সেসব মানুষের এই বিবেক টুকু নেই যে , দূষিত বা ভেজাল খাদ্য নীরবে জনগণকে হত্যা করছে।
অপরদিকে বর্তমানে প্রতিনিয়ত শহরের অলিতে গলিতে বেড়ে উঠছে রাস্তার ধারের রেস্টুরেন্ট বা খাবারের দোকান। স্বল্পদামে খাবার খেতে ভিড়ও জমছে অনেক। এছাড়াও ফুটপাতে তৈরি অস্বাস্থ্যকর খাবারের রেস্তোরাঁগুলি খাদ্য সুরক্ষা ও গুণমান নিয়ে উদ্বেগের কারণ। এই ধরনের রেস্তোরাঁগুলি প্রায়শই স্বাস্থ্যবিধি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মান বজায় রাখতে পারে না, ফলে খাবার দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি হতে পারে।
মুখরোচক খাবার বলতেই মাথায় আসে ‘স্ট্রিট ফুড,’ যা সাধারণত রাস্তার পাশে তৈরি, বিক্রি ও খাওয়া হয়। নগরের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ (নারী ৬০ শতাংশ এবং পুরুষ ৪০ শতাংশ) দিনে অন্তত একবার স্ট্রিট ফুড খেয়ে থাকেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ৯০ শতাংশ স্ট্রিট ফুডই অনিরাপদ। ভেজাল খাদ্য খাওয়ার ফলে প্রতিবছর তিন লাখ লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় এবং ৫০ হাজার লোক ডায়াবেটিসে এবং আরও ২ লাখ লোক কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। ঢাকার ৯০ শতাংশ স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার খাবারই অনিরাপদ। এসব খাবারে ই-কোলাই ও সালমেনেলার মতো মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর জীবাণু পাওয়া যায়।
আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে এখনই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য সকল প্রকার প্রয়োজনীয় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই সংকট মোকাবিলায় কেবল সরকারের ভূমিকাই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি নাগরিকের সচেতনতা অপরিহার্য। উৎপাদন পর্যায়ে কৃষকদের কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার, খামারিদের ঔষধ প্রয়োগের বিধিনিষেধ মানা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে নৈতিকতা বজায় রাখা আবশ্যক। সরবরাহ ও বাজারজাত করার সময় সরকারি সংস্থাগুলোর নিয়মিত তদারকি ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা আবশ্যক।
লেখক : কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









