বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের মূল্যায়ন কেবল তাঁদের সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তাঁদের প্রভাব পরবর্তী কয়েক দশক জুড়ে রাষ্ট্র ও সমাজের গতিপথকে প্রভাবিত করে। জিয়াউর রহমান তেমনই এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সেনানায়ক থেকে রাষ্ট্রপতি-তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা যেমন নাটকীয়, তেমনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, জাতীয় পরিচয় বিনির্মাণ, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং দলীয় রাজনীতির বিকাশে তাঁর ভূমিকা গভীর ও সুদূরপ্রসারী।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, প্রশাসনিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতার অভাব নবীন রাষ্ট্রকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ধারাবাহিক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন গভীর সংকটে নিমজ্জিত, তখনই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসেন জিয়াউর রহমান।
তাঁর রাজনৈতিক উত্থান বোঝার ক্ষেত্রে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ঘটনাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। কেউ একে ‘সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান’ হিসেবে দেখেন, আবার কেউ সামরিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের ঘটনা হিসেবে মূল্যায়ন করেন। তবে মতপার্থক্য সত্ত্বেও একটি বিষয় অনস্বীকার্য-৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়েই জিয়াউর রহমান জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত হন এবং পরবর্তী রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণে নির্ণায়ক ভূমিকা গ্রহণের সুযোগ পান। এই ঘটনাকে ঘিরে বিতর্ক থাকলেও বাংলাদেশের ক্ষমতার ভারসাম্য, সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ”। তাঁর মতে, বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় কেবল ভাষা বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভিত্তিতে নয়, বরং স্বাধীন ভূখণ্ড, রাষ্ট্রসত্তা, ইতিহাস এবং জনগণের সম্মিলিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেও সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন। এই ধারণা বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিন্তায় একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করে। এর মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রের পরিচয়কে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। সমর্থকদের মতে, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম জাতিসত্তাকে আরও সুসংহত করেছে; সমালোচকদের মতে, এর ফলে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রচলিত ব্যাখ্যার সঙ্গে একটি নতুন মতাদর্শিক বিতর্কের সূচনা ঘটে। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করা কঠিন যে, স্বাধীনতার পর জাতীয় পরিচয় প্রশ্নে যে দীর্ঘমেয়াদি বিতর্ক ও রাজনৈতিক মেরুকরণ গড়ে উঠেছে, তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত এই ধারণা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের একাংশ মনে করেন, জিয়াউর রহমানের “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” ছিল মূলত রাষ্ট্রকেন্দ্রিক জাতীয় পরিচয় নির্মাণের একটি প্রচেষ্টা, যা যুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রের বাস্তবতা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজন থেকে উদ্ভূত। গবেষক রিচার্ড সিসন ও লিও রোজের মতো বিশ্লেষকরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিচয় গঠনের প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র ও জাতিসত্তার এই পুনঃসংজ্ঞায়নের বিষয়টিকে একটি বাস্তববাদী রাষ্ট্রচিন্তার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁদের মতে, এটি কেবল আদর্শিক অবস্থান নয়, বরং একটি নতুন রাষ্ট্রের টিকে থাকার কৌশলগত প্রয়াসও ছিল। একই সঙ্গে দেশীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের একটি অংশ মনে করেন, এই ধারণা জাতীয় পরিচয়ের বহুমাত্রিক ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করলেও এর ফলে মুক্তিযুদ্ধ-ভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে একটি দীর্ঘস্থায়ী মতাদর্শিক টানাপোড়েনও সৃষ্টি হয়।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনকে কেবল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ বা বহুদলীয় রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ করলে তাঁর চিন্তার পূর্ণাঙ্গ রূপ ধরা পড়ে না। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে ছিল কয়েকটি মৌলিক ধারণা-জাতীয় ঐক্য, উৎপাদনমুখী রাজনীতি, গ্রামকেন্দ্রিক উন্নয়ন, তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পায় যখন তা অর্থনৈতিক উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়। এ কারণেই তাঁর বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মসূচিতে উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি উন্নয়ন এবং স্থানীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি গ্রামকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করেন এবং উন্নয়নের সুফলকে রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার ও উপজেলা-কেন্দ্রিক প্রশাসনিক ধারণার বিকাশে লক্ষ্য করা যায়।
রাজনৈতিকভাবে তিনি একটি বিভক্ত জাতিকে বৃহত্তর রাষ্ট্রিক পরিচয়ের আওতায় ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। এই প্রচেষ্টার সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও রাষ্ট্রগঠন ও উন্নয়নকে একই সূত্রে দেখার প্রবণতা তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন পূর্ববর্তী রাষ্ট্রনেতাদের রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে যেমন কিছু ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে নতুন দিকনির্দেশনাও প্রদান করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্রগঠনের প্রধান লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, সাংবিধানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শভিত্তিক জাতীয় পরিচয় নির্মাণ। জিয়াউর রহমান সেই ভিত্তিকে অস্বীকার না করে রাষ্ট্রপরিচয়ের আলোচনায় ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক বাস্তববাদ এবং উন্নয়নকেন্দ্রিক রাজনৈতিক চিন্তার ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করেন। যেখানে স্বাধীনতার অব্যবহিত পর্বে রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল আদর্শগত পুনর্গঠন, সেখানে জিয়া রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কার্যকারিতা, উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সম্প্রসারণকে অধিক গুরুত্ব দেন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত কাঠামোর পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রতি তাঁর উৎসাহ একটি নতুন নীতিগত ধারা তৈরি করে। ফলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে তাঁকে কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বরং স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার ও উন্নয়ন কৌশল পুনর্নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রূপকার হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে কিছু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তাকে “ট্রানজিশনাল স্টেট মডেল” হিসেবে ব্যাখ্যা করেন-যেখানে একটি যুদ্ধোত্তর রাষ্ট্র আদর্শনির্ভর কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে প্রশাসনিক দক্ষতা ও উন্নয়নকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়। এই ব্যাখ্যায় তাঁকে কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের রূপান্তরপর্বের একজন গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অভিনেতা হিসেবে দেখা হয়। তবে একই সঙ্গে কিছু গবেষকের মতে, এই রূপান্তর প্রক্রিয়া রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বিকাশের ক্ষেত্রে সীমিত কাঠামো তৈরি করেছিল, যার প্রভাব পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও প্রতিফলিত হয়েছে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার পর একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামোর অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে তিনি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র পুনরায় উন্মুক্ত করেন। বিভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক শক্তিকে মূলধারায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আত্মপ্রকাশ করে। এর ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি হয় এবং ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র গড়ে ওঠে।
তবে এই পরিবর্তনের গুরুত্ব কেবল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ঘটনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। পরবর্তী চার দশকের বাংলাদেশের রাজনীতিকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, দেশের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা মূলত দুটি বৃহৎ ধারাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে-একদিকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, অন্যদিকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দর্শন। এই দ্বিমাত্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতা গঠনে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল মৌলিক। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং রাষ্ট্রের পরিচয় নিয়ে চলমান বিতর্কের পেছনেও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের গভীর প্রভাব বিদ্যমান।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান বাস্তববাদী ও উন্নয়নমুখী নীতি গ্রহণ করেন। দেশের অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে তিনি কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। খাল খনন কর্মসূচি, কৃষি সম্প্রসারণ, স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম এবং স্বনির্ভরতার ধারণা তাঁর নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। একই সঙ্গে তিনি বেসরকারি খাতের বিকাশকে উৎসাহিত করেন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেন। অনেক গবেষকের মতে, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী অর্থনীতি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশ এবং বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণের যে ভিত্তি তৈরি হয়, তার প্রাথমিক কাঠামো এই সময়েই দৃশ্যমান হতে শুরু করে।
পররাষ্ট্রনীতিতে জিয়াউর রহমান একটি বাস্তববাদী ও বহুমুখী কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক অবস্থান সুসংহত করার প্রেক্ষাপটে তিনি বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ককে নতুনভাবে বিন্যস্ত করেন। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার তাঁর পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। এই প্রক্রিয়ায় তিনি ঙৎমধহরংধঃরড়হ ড়ভ ওংষধসরপ ঈড়ড়ঢ়বৎধঃরড়হ-এর কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করেন, যার মাধ্যমে দেশটি মুসলিম বিশ্বের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নেটওয়ার্কে আরও দৃশ্যমান অবস্থান অর্জন করে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ করা হয়। উন্নয়নকেন্দ্রিক কূটনীতি, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক সহায়তা বৃদ্ধির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করেন। আঞ্চলিক পর্যায়ে সহযোগিতার ধারণাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যা পরবর্তীতে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোর ধারণাগত ভিত্তি গঠনে সহায়ক হয়। ফলে তাঁর পররাষ্ট্রনীতি কেবল আদর্শিক অবস্থান নয়, বরং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থনির্ভর একটি বাস্তববাদী কূটনৈতিক কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কেবল সাফল্যের আলোয় সীমাবদ্ধ নয়। সামরিক আদালত, রাজনৈতিক বিরোধী দমন এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও বিদ্যমান। সমর্থক ও সমালোচক উভয় পক্ষের ব্যাখ্যা মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, তাঁর রাষ্ট্রপরিচালনা ছিল এক জটিল ও অস্থির সময়ের বাস্তবতার মধ্যে গঠিত।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, রাষ্ট্রপরিচয়, উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্নে তাঁর চিন্তা ও কর্মকাণ্ড বারবার ফিরে আসে। তাঁর প্রবর্তিত রাজনৈতিক ধারাই পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করেছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান এমন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যার প্রভাবকে অস্বীকার করা যেমন অসম্ভব, তেমনি তাঁকে ঘিরে বিতর্ককে উপেক্ষা করাও অসম্ভব।
তিনি একদিকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তক এবং উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম রূপকার; অন্যদিকে তাঁর শাসনকাল গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। ফলে তাঁর উত্তরাধিকার কেবল একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে চলমান জাতীয় আলোচনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইতিহাসের নির্মোহ বিচারে জিয়াউর রহমানকে মূল্যায়ন করতে হলে আবেগ, পক্ষপাত কিংবা রাজনৈতিক আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর সময়, দর্শন, অর্জন ও সীমাবদ্ধতাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ বাংলাদেশের সমকালীন রাষ্ট্র ও রাজনীতির বহু মৌলিক প্রশ্নের শিকড় আজও তাঁর রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও রাষ্ট্রদর্শনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।
লেখক : অধ্যাপক, কবি ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









