বর্ষা এলেই দেশে শুরু হয় বৃক্ষরোপণের উৎসব। কোথাও শিক্ষার্থীদের হাতে চারা তুলে দেওয়া হয়, কোথাও জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তারা গাছ লাগিয়ে ছবি তোলেন, কোথাও ঘোষণা আসে হাজার হাজার চারা রোপণের।
ব্যানার, ফেস্টুন, প্রচার আর আনুষ্ঠানিকতার কমতি থাকে না। কিন্তু উৎসব শেষ হওয়ার পর সেই চারাগুলোর কী হয়, কতটি বেঁচে থাকে, কতটি পরিচর্যার অভাবে শুকিয়ে যায় তার হিসাব খুব কমই প্রকাশিত হয়। ফলে, বৃক্ষরোপণ অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ না হয়ে এক দিনের প্রচারণায় সীমাবদ্ধ থাকে। প্রশ্ন হলো, গাছ লাগানোর আগ্রহ এত বেশি হলে গাছ বাঁচানোর দায়িত্বে এত অনীহা কেন?
জলবায়ু পরিবর্তন, তাপপ্রবাহ, বায়ুদূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের বাস্তবতায় বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, ছায়া দেয়, মাটির ক্ষয় রোধে ভূমিকা রাখে এবং পাখিসহ নানা প্রাণীর আবাস তৈরি করে। শহরে গাছের উপস্থিতি তাপের তীব্রতা কমাতেও সহায়তা করে। অথচ উন্নয়নের নামে সড়ক সম্প্রসারণ, ভবন নির্মাণ ও অবকাঠামো তৈরির সময় বহু পরিণত গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে।
একদিকে নতুন চারা রোপণ, অন্যদিকে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন এই দ্বিমুখী নীতি পরিবেশ সংরক্ষণের দাবিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। একটি পরিণত গাছের পরিবেশগত অবদান কয়েক মাসে তৈরি হয় না। তার ছায়া, বিস্তৃত শিকড়, পাখির আশ্রয় এবং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক দীর্ঘ সময়ের ফল। সেই গাছ কেটে পাশে কয়েকটি চারা লাগালেই ক্ষতি পূরণ হয় না। নতুন গাছ বড় হতে সময় লাগে; সব চারাও টিকে থাকে না। তাই উন্নয়ন প্রকল্পে গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়ার আগে বিকল্প নকশা, গাছ সংরক্ষণের সুযোগ এবং পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু প্রকৃতিকে নির্বিচারে ধ্বংস করে নয়। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির বড় দুর্বলতা হলো সংখ্যার প্রতি অতিরিক্ত মোহ। কতটি চারা বিতরণ করা হলো, কতটি রোপণ করা হলো- এসব তথ্য সহজেই প্রচার করা যায়। কিন্তু এক বছর পর কতটি গাছ বেঁচে আছে, সেগুলো কতটা বেড়েছে, পানি ও পরিচর্যা পেয়েছে কিনা এসব তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা দুর্বল। অথচ সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি রোপিত চারার সংখ্যা নয়, গাছের টিকে থাকা। দশ হাজার চারা লাগিয়ে অধিকাংশ হারিয়ে ফেলার চেয়ে উপযুক্ত স্থানে এক হাজার চারা লাগিয়ে সেগুলোকে পরিচর্যায় বড় করে তোলা বেশি কার্যকর।
এ দায়িত্ব সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক সবার। কোনো প্রতিষ্ঠান বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিলে চারা রোপণ ও ছবি তোলার মধ্যেই কাজ শেষ করা উচিত নয়। কোন স্থানে কোন প্রজাতির গাছ উপযোগী, কে পরিচর্যা করবে, পানি দেওয়ার ব্যবস্থা কী এবং গাছ নষ্ট হলে পুনরায় রোপণ করবে কে এসব সিদ্ধান্ত আগেই নিতে হবে। প্রতিটি রোপণস্থলের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ এবং নির্দিষ্ট সময় পর গাছের অবস্থা যাচাই বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। ফলাফলও প্রকাশ করতে হবে জনসমক্ষে। শহরাঞ্চলে গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে স্থান নির্বাচন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যুতের তার, ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন, সড়কের নিরাপত্তা, পথচারীর চলাচল ও ভবিষ্যৎ অবকাঠামোর কথা বিবেচনা না করে চারা লাগালে পরে সেটি অপসারণের পরিস্থিতি তৈরি হয়। অনুপযোগী প্রজাতি নির্বাচন করলেও প্রত্যাশিত সুফল মেলে না। তাই স্থানীয় মাটি ও পরিবেশের সঙ্গে মানানসই প্রজাতি নির্বাচন করতে হবে। সড়কের উপযুক্ত অংশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খালি জায়গা, পতিত সরকারি জমি ও নগর উদ্যানকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে জমির প্রকৃত ব্যবহার ও জীববৈচিত্র্যের বিষয়টিও উপেক্ষা করা চলবে না।
গাছ রক্ষায় নাগরিক অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গাছের পরিচর্যা করতে পারে, পাড়া-মহল্লার সংগঠনগুলো রোপিত চারার তালিকা তৈরি করে নিয়মিত খোঁজ রাখতে পারে। বাড়ির আঙিনা কিংবা ছাদে গাছ লাগানোর পাশাপাশি বিদ্যমান গাছ রক্ষায়ও সচেতন হতে হবে। কিন্তু নাগরিক উদ্যোগকে সরকারি দায়িত্বের বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সড়কের পাশের গাছ, সরকারি জমির বৃক্ষ ও নগর উদ্যান সংরক্ষণের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। আইন প্রয়োগ ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করা জরুরি।
অনুমোদন ছাড়া গাছ কাটা, সবুজ এলাকা দখল কিংবা বৃক্ষরোপণ প্রকল্পের অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। গাছ কাটার অনুমতি, ক্ষতিপূরণমূলক রোপণ এবং পরিচর্যার অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। কোনো প্রকল্পে গাছ কাটা অনিবার্য হলে প্রথমেই তা এড়ানোর বিকল্প খুঁজতে হবে। একান্ত প্রয়োজন হলে প্রযোজ্য আইন ও পরিবেশগত বিবেচনা মেনে ক্ষতি কমাতে হবে। ক্ষতিপূরণমূলক রোপণও হতে হবে উপযুক্ত স্থানে, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার নিশ্চয়তাসহ।
বৃক্ষরোপণ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু একটি চারা মাটিতে পুঁতে দিলেই পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং সেখান থেকেই দায়িত্বের শুরু। তাই প্রতি বছর কতটি গাছ লাগানো হয়েছে, তার পাশাপাশি এক, তিন ও পাঁচ বছর পর কতটি গাছ বেঁচে আছে, সেই হিসাবও প্রকাশ করতে হবে। এতে প্রকৃত সাফল্য পরিমাপ করা যাবে, দায়িত্বহীনতা চিহ্নিত হবে এবং সরকারি অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে জবাবদিহি বাড়বে।
পরিবেশ রক্ষার নামে আনুষ্ঠানিকতা নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক ও পরিমাপযোগ্য উদ্যোগ। ব্যানারে সবুজের ছবি থাকলেই শহর সবুজ হয় না; সবুজ হয় যখন একটি গাছ নির্বিঘ্নে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়। তাই এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত- শুধু এ বছর কতটি গাছ লাগানো হয়েছে তা নয়, গত বছর লাগানো কতটি গাছ আজও বেঁচে আছে? এই হিসাব প্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে বৃক্ষরোপণের উৎসব চলবে, অথচ প্রকৃতির ক্ষয়ও থামবে না। গাছ লাগানোর কৃতিত্ব অনেকেই নিতে পারেন, কিন্তু গাছ বাঁচানোর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কারও থাকা উচিত নয়।
লেখক : শিক্ষার্থী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









