প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শাসনামলে নারী শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মসূচি নেওয়া ও সম্প্রসারণ করা হয়, যেমন- মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের উপবৃত্তি কর্মসূচি, যার মাধ্যমে দরিদ্র ও গ্রামীণ পরিবারের মেয়েদের বিদ্যালয়ে ভর্তি, পড়াশোনা অব্যাহত রাখা এবং বাল্যবিবাহ নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এরপর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশ এবং নারীদের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ফলে বিপুলসংখ্যক নারী শিক্ষিত হয় এবং তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশ নারীদের প্রথমে স্কুলে পাঠিয়েছে এবং তাদের কারখানায় কাজের সুযোগ করে দিয়েছে। আর ভারত নারীদের বাড়িতে বসেই এক বস্তা শস্য ধরিয়ে দিয়েছে।
তবুও, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, ভারতীয়রা কোনোভাবেই বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে থাকতে রাজি নয়। তাদের অন্ধ মিডিয়া, রাজনীতিবিদ ও জনগণ কেবল আজেবাজে বকতেই থাকে। বিশ্ববাজারে বিক্রি করার মতো বিশেষ কিছু ভারতের কাছে নেই। ভারত কেবল সারা বিশ্ব থেকে পণ্য কিনছে। ডলার আরো শক্তিশালী হচ্ছে এবং রুপি আরো দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি, ভারতের মাথাপিছু জিডিপিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কর্তৃক প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ বিশ্ব অর্থনীতি বিষয়ে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রামাণ্য প্রতিবেদন। অক্টোবর মাসে এ প্রতিবেদনে প্রকাশিত একটি তথ্য ভারতে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আইএমএফ বলছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ২,৮৮৬ ডলার হবে।
সেই তুলনায়, একজন ভারতীয়র গড় আয় ধরা হয়েছে ২,৭৪৯ ডলার, যা একজন বাংলাদেশির গড় আয়ের চেয়ে ১৩৭ ডলার কম। তবে, আইএমএফ এর তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালে ভারতের জিডিপি হবে প্রায় ৪ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলার, আর বাংলাদেশের জিডিপি হবে ৫০৬ বিলিয়ন ডলার। এর অর্থ হলো, ভারতের অর্থনীতি বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় আট গুণ বড়।
তবে, ভারতের অর্থনীতির এই বিশাল আকারের পেছনে তাদের বিশাল জনসংখ্যার ভূমিকা রয়েছে। কারণ, ১৪০ কোটি মানুষের দেশে জিডিপি তো বড় হবেই, যা বাংলাদেশের জনসংখ্যার তুলনায় আট গুণ বড়। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি জনসংখ্যা নয় বরং শক্তিশালী রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। তাই বাংলাদেশের মুদ্রার মান ভারতের রুপির মতো খারাপ হয়নি। আইএমএফ-এর তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যেখানে ভারতে ৫ শতাংশ। এছাড়া ভারতের প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের বেশি, অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটির দিক থেকেও বাংলাদেশ এখনো ভারতের পেছনে রয়েছে।
আইএমএফ-এর ভাষ্য অনুসারে, ২০২৯ সালের মধ্যে মাথাপিছু জিডিপির ক্ষেত্রে ভারত আবারও বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যাবে। ধারণা করা হচ্ছে, তখন ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হবে ৩,৬৬১ ডলার, আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হবে ৩,৩৩৪ ডলার। বাংলাদেশের সামনে একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে; ডলারের বিনিময় হার কিছুটা বেড়েছে। তবে, আইএমএফ-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। কারণ, ভারতের ধনী-গরিবের সম্পদের অসমতা, রপ্তানি হ্রাস এবং ডলারের মূল্য বৃদ্ধির ফলে ভারতের মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়ে গেছে।
এদিকে, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া মোদী সরকারকে নির্দেশ দিচ্ছে যেন এলআরএস-এর মাধ্যমে অর্থ বাইরে চলে যাওয়া বন্ধ করে। আন্তর্জাতিক মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সোনা কেনাও বন্ধ করা হয়েছে। ডলারের মাধ্যমে পাঠানো রেমিট্যান্স কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে ভারতের আরবিআই, যা তাদের অর্থনীতির পরিস্থিতি কতটা শোচনীয় তার ইঙ্গিত দেয়।
‘গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স’ (বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক)-এর নতুন তথ্য অনুসারে ১২২টি দেশের মধ্যে ভারত রয়েছে ১০০তম অবস্থানে। আর বাংলাদেশ রয়েছে ৮৪তম অবস্থানে, অর্থাৎ ভারতের চেয়ে ১৬ ধাপ এগিয়ে। যে ভারতের মিডিয়া এবং রাজনৈতিক নেতারা ব্যঙ্গ করে বলে, তারা বাংলাদেশকে খাদ্যশস্য সরবরাহ করে অথচ সেই ভারতের নিজেদের দেশেই ৮০ কোটি মানুষ বিনামূল্যে খাদ্যশস্য পাচ্ছে। ৮০ কোটি মানুষকে বিনামূল্যে রেশন দেওয়ার পরেও ভারতের শিশুরা বাংলাদেশের শিশুদের তুলনায় বেশি খর্বকায় বলছে কিছু গবেষণা। ক্ষুধা বা অনাহারের সূচকে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তাছাড়াও জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্স (লিঙ্গ বৈষম্য সূচক), প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স (সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচক) এবং গড় আয়ুর সূচকে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে আছে। হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স বা মানব উন্নয়ন সূচকেও (এইচডিআই) ভারত বর্তমানে বাংলাদেশের সমান অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ভারত পিছিয়ে পড়ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বা এআই খাতও খারাপ সময়ের মুখোমুখি হচ্ছে ভারত, আর বাংলাদেশে তারেক রহমানের সরকার এই খাতে দেশীয় প্রযুক্তিবিদ ও তরুণ উদ্ভাবকদের সহায়তার জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকার একটি বিশেষ 'এআই ইনোভেশন ফান্ড' গঠন করছে, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ৬৪ জেলায় বিনামূল্যে এআই প্রশিক্ষণের কর্মসূচি নিয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে ডিজিটাল খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে।
এই প্রসঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার একটি বিশেষ অবদান রয়েছে, তা হলো সস্তা শ্রমশক্তিকে তৈরি পোশাক শিল্পে কাজে লাগানো। আশির দশকে বাংলাদেশের কাছে তেল বা গ্যাসের বড় কোনো মজুদ ছিল না, ছিল না কোনো প্রযুক্তি পার্কও। বাংলাদেশের একমাত্র সম্পদ ছিল সস্তা শ্রমশক্তি, আর যে শ্রমশক্তিকে বাংলাদেশ কাজে লাগায়েছিল একটি নির্দিষ্ট শিল্পে, যা তৈরি পোশাক শিল্প। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৩৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা মোট রপ্তানির ৮১ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৮ শতাংশের সমান।
এই শিল্পে ৪৫ লক্ষ শ্রমিক কাজ করেন, যার মধ্যে ৫৭ শতাংশেরও বেশি নারী। লক্ষ লক্ষ পরিবারে মেয়েরা তাদের জীবনের প্রথম উপার্জিত অর্থ নিয়ে আসে। এর ফলে বিয়ের বয়স পিছিয়ে যায়, সন্তান জন্মের হার কমে এবং উপার্জিত অর্থ সরাসরি পুষ্টি ও শিক্ষার পেছনে ব্যয় হয়। সুতরাং, এটি কেবল বস্ত্র শিল্পের বিষয় নয়; বরং এটি একটি পুরো প্রজন্মের জন্য উন্নতির সোপান হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়েছে এবং এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে।
২০২৫ অর্থবছরে ভারতের বস্ত্র ও পোশাক রপ্তানির মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৬ বিলিয়ন ডলারে। এর মধ্যে পোশাক খাতের অবদান মাত্র ১৬ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয়ের অর্ধেক। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ কেবল পোশাক বিক্রি করেই যে পরিমাণ আয় করে, ভারত সুতা, বস্ত্র ও পোশাক- এই পুরো খাত মিলিয়ে ঠিক ততটাই আয় করে। অথচ বাংলাদেশ মূলত একটিমাত্র খাতের ওপর নির্ভরশীল। আর ভারতের সংস্থা 'নীতি আয়োগ'-এর প্রতিবেদন ও সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, ভারতের জিডিপিতে অটোমোবাইল শিল্পের, যার মধ্যে বিভিন্ন যানবাহন ও দুই চাকার গাড়ির যন্ত্রাংশ অন্তর্ভুক্ত, অবদান ৭ দশমিক ১ শতাংশ। আরো বিস্ময়কর বিষয় হলো, ভারতের মোট উৎপাদন খাতের জিডিপির ৪৯ শতাংশই আসে এই অটোমোবাইল বা গাড়ি উৎপাদন শিল্প থেকে। সহজ কথায়, ভারতের উৎপাদন খাতের অর্ধেকই পুরোপুরি এই অটোমোবাইল খাতের ওপর নির্ভরশীল।
সরকার যদি গাড়ি উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, তবে পুরো অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে বটে, তবে বাংলাদেশের সাথে এক্ষেত্রে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। কারণ, পোশাক শিল্প হলো শ্রমনির্ভর, এখানে যন্ত্রপাতির ব্যবহার থাকলেও কায়িক শ্রমের প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে, অটোমোবাইল শিল্প হলো পুঁজি নির্ভর, যেখানে যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেশি এবং মানুষের শ্রমের প্রয়োজন তুলনামূলক কম। ভারতে অ্যাসেম্বলি লাইনে রোবটের ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। আর এই গাড়িগুলো কাদের কাছে বিক্রি করা হয়? মূলত ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে, বিদেশে নয়, ফলে ডলার আসে না।
আর বাংলাদেশ বস্ত্র ও পোশাক বিদেশে রপ্তানি করে থাকে, ডলার আয় করে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে, ভারতের অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ শিল্প বৈশ্বিক বাণিজ্যের মাত্র ৩ শতাংশ। ভারতের কারখানাগুলোতে মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের প্রাপ্ত মজুরির অংশ ১৯৮১ সালে ছিল মোট উৎপাদনের ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে তা কমে মাত্র ১১ শতাংশে নেমে এসেছে; বর্তমানে আরো কম। অর্থাৎ, মুনাফা চলে যাচ্ছে বড় ব্যবসায়ীদের পকেটে। আগে যেখানে ব্যবসায়ীদের মুনাফা ভাগে যেত ১৫ শতাংশ, এখন সেই মুনাফা ৪৪ বা ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের উৎপাদন খাতে মাত্র ২ কোটি মানুষ কর্মরত আছে। ভারতের ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন জনসংখ্যার দেশে মাত্র ২০ মিলিয়ন মানুষ উৎপাদন খাতে যুক্ত। সরকারের নিজস্ব 'পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে'-এর তথ্য অনুসারে, অকৃষি খাতে কর্মরত, অর্থাৎ যারা শহরে বিভিন্ন কারখানায় কাজ করেন, তাদের মধ্যে ৭৩ দশমিক ১ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত। এর অর্থ হলো, সেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি নেই, প্রভিডেন্ট ফান্ড (পিএফ) সুবিধা নেই এবং কোনো নির্দিষ্ট বেতন কাঠামোও নেই।
অর্থাৎ, শিল্প খাতটি গড়ে উঠছে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে। মজার বিষয় হলো, ভারতে উৎপাদন কার্যক্রম চলছে; নানা ধরনের পণ্য ও গাড়ি তৈরি হচ্ছে এবং বিক্রিও হচ্ছে। রোলস-রয়েস বা ফেরারির মতো বিলাসবহুল গাড়ির ক্রেতাও রয়েছে। সমাজের একটি অংশ অত্যন্ত ধনী হয়ে উঠেছে এবং তারা দামি বাড়ি কিনছে। অথচ সাধারণ মানুষ ক্রমশ দরিদ্র হয়ে পড়ছে এবং মুদ্রাস্ফীতির কবলে পড়ছে। আর ঠিক এই কারণেই ভারতের সম্পদের বৈষম্য বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষ , আর ৫০ শতাংশ মানুষ গভীর খাদে আটকা পড়ে আছে। যে কারণেই ভারতের পরিসংখ্যান নিম্নমুখী। এটি কেবল বাংলাদেশের প্রসঙ্গ নয়; মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে ভারত কম্বোডিয়া, কঙ্গো এবং কেনিয়ার চেয়েও পিছিয়ে আছে।
গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স (বিশ্ব ক্ষুধা সূচক) ২০২৬-এ ভারতের স্কোর ছিল ২৪ দশমিক ১, যা ‘গুরুতর’ (সিরিয়াস) পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। ভারত ২০১২ সাল থেকেই এই ‘গুরুতর’ শ্রেণিতে রয়েছি। আর বাংলাদেশের স্কোর ১৯ দশমিক ২, যা ‘মাঝারি’ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত । ভারতে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৯ দশমিক ৩ শতাংশের ক্ষেত্রে ‘স্টান্টিং’ বা খর্বকায় অবস্থা দেখা যায়; অর্থাৎ, তাদের বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম। বাংলাদেশে এই হার ২৪ শতাংশ। এছাড়া ভারতে ১৯ শতাংশ শিশু ‘ওয়েস্টিং’-এর শিকার; অর্থাৎ, তাদের উচ্চতার তুলনায় তাদের ওজন অনেক কম। এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ হার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ, যেখানে এই হার ১২ দশমিক ৯ শতাংশ।
অপুষ্টির দিক থেকে ভারতের হার ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বাংলাদেশের ৮ দশমিক ২ শতাংশ। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর হারের ক্ষেত্রে ভারত কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে, তাদের হার ২ দশমিক ৭ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশের হার ৩ শতাংশ। ভারতের প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৩ জনই তাদের স্বাভাবিক উচ্চতা অর্জন করতে পারে না। এটি ভারতের একটি পুরো প্রজন্মের বাস্তব চিত্র। এটাই হলো নগ্ন সত্য। ভারতের শিশুরা কেন এখনও খর্বকায় এবং অপুষ্টিতে ভুগছে? কারণ, বিষয়টি কেবল পেট ভরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ, প্রোটিন, ডিম, দুধ বা ডালের মতো পুষ্টিকর উপাদান শিশুরা পায় না। শিশুদের উচ্চতা নির্ভর করে তাদের মায়ের স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা, শৌচাগারের সুবিধা এবং তাদের মায়ের শিক্ষার ওপর।
আর এখানেই বাংলাদেশ বাজিমাত করেছে। বাংলাদেশে শিশুদের খর্বকায় হওয়ার হার কমে যাওয়ার পেছনে চারটি বা পাঁচটি প্রধান কারণ যেমন- বাবা-মায়ের (বিশেষ করে মায়ের) শিক্ষা, পারিবারিক আয় বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার ব্যবহার, ছোট পরিবার গঠন এবং কন্যাশিশুর শিক্ষার পেছনে বিনিয়োগ। ১৯৯৪ সাল থেকে গ্রামীণ বাংলাদেশে ‘নারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় উপবৃত্তি কর্মসূচি’ বাস্তবায়িত হয়ে আসছে। শর্তগুলো ছিল, মেয়েদের উপস্থিতির হার ৭৫ শতাংশের বেশি হতে হবে এবং তাদের অবিবাহিত থাকতে হবে।
১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের ভর্তির হার ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যেখানে ছেলেদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার ছিল ২০ শতাংশ। ১৯৯৮ সাল নাগাদ, ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ভর্তির সংখ্যা বেশি হয়ে যায়। ওআরএফ-এর বিশ্লেষণ অনুসারে, বাংলাদেশে যেসব নারী কখনো স্কুলে যাননি, তাদের সন্তানদের খর্বকায় হওয়ার সম্ভাবনা ৪৭ শতাংশ। যেসব মায়ের মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়েছে, তাদের সন্তানদের মধ্যে মাত্র ১৮ শতাংশের শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও গবেষক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









