বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রতিভাবান গায়ক, গিটারিস্ট, সুরকার ও প্রযোজক জর্জ হ্যারিসন। বিশ্ববিখ্যাত ব্যান্ড দ্য বিটলস’র চার সদস্যের একজন হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। তবে তাঁর প্রতিভা কেবল গিটার বাজানো বা গান গাওয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল না সঙ্গীত পরিচালনা, রেকর্ড প্রযোজনা ও চলচ্চিত্র প্রযোজনাতেও তিনি সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
মূলত লিড গিটারিস্ট হলেও বিটলসের প্রায় প্রতিটি অ্যালবামেই হ্যারিসনের নিজের লেখা ও সুর করা একাধিক গান থাকত। তাঁর রচিত ও গাওয়া বিখ্যাত বিটলস গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ইফ আই নিডেড সামওয়ান, ট্যাক্সম্যান, হোয়াইল মাই গীটার জেন্টলী উইপস, হেয়ার কামস দ্য সান এবং সামথিং। বিটলস ভেঙে যাওয়ার পরও তাঁর জনপ্রিয়তা অটুট থাকে। সত্তরের দশকে তাঁর একক ক্যারিয়ারের বহু গান বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়, যেমন- মাই সুইট লর্ড, গিভ মি পিস অন আর্থ, অল দোজ ইয়ার্স এগো, গট মাই মাইন্ড সেট অন ইউ ইত্যাদি।
১৯৬০এর দশকের মাঝামাঝি থেকে জর্জ হ্যারিসন ভারতীয় সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। তিনি বিটলসের অন্যান্য সদস্যদেরও এই ধারার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ১৯৬৬ সালে তিনি তাঁর স্ত্রী প্যাটি বয়েডকে নিয়ে মুম্বাই সফর করেন এবং কিংবদন্তি সেতারবাদক পণ্ডিত রবি শংকরের কাছে সেতার শিক্ষা নেন।
১৯৬৮ সালে তিনি বিটলসের সদস্যদের সঙ্গে উত্তরাখণ্ডের ঋষিকেশে গিয়ে আধ্যাত্মিক গুরু মহর্ষী মহেশ যোগীর কাছে ধ্যান ও যোগশিক্ষা গ্রহণ করেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে শরণার্থীদের দুর্দশা দেখে পণ্ডিত রবি শংকরের অনুরোধে জর্জ হ্যারিসন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে ১ আগস্ট ঐতিহাসিক কনসার্ট ফর বাংলাদেশ আয়োজন করেন।
এই দাতব্য কনসার্টে হ্যারিসন ও রবি শংকর ছাড়াও অংশ নেন বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, রিঙ্গো স্টারসহ আরও অনেক শিল্পী।
কনসার্টে জর্জ হ্যারিসন তাঁর লেখা বিখ্যাত “বাংলা দেশ” গান পরিবেশন করেন। টিকিট, রেকর্ড ও চলচ্চিত্র থেকে প্রাপ্ত অর্থ ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্যে প্রদান করা হয়। এই কনসার্ট বিশ্বে প্রথম বড় মাপের মানবিক উদ্দেশ্যে আয়োজিত রক বেনিফিট কনসার্ট হিসেবে ইতিহাসে স্থান পায়।
দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর ২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর ৫৮ বছর বয়সে জর্জ হ্যারিসন মেটাস্ট্যাটিক নন–স্মল সেল লাং ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন।
জর্জ হ্যারিসন কেবল একজন সংগীত তারকা নন, তিনি ছিলেন সংস্কৃতির সেতুবন্ধনকারী ও মানবিক শিল্পী। ভারতীয় সঙ্গীত ও দর্শনকে পাশ্চাত্য পপসংগীতে অন্তর্ভুক্ত করা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্বমানবতার পক্ষে দাঁড়ানো এই দুই ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান অনন্য। তাঁর সৃষ্ট সুর ও মানবিক উদ্যোগ তাঁকে বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









