খুলনায় দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় সরকারি অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করা পুলিশ কনস্টেবল সম্রাট বিশ্বাসের মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক। পরিবারের দাবি—দাম্পত্য জীবনের অশান্তি এবং স্ত্রীর মানসিক চাপই তাকে আত্মহননের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে শ্বশুরবাড়ির পক্ষ। দাফনের একদিন পর গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার চরপদ্মবিলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, শোকাহত পরিবারের পরিবেশ এখনো ভারী হয়ে আছে। স্বজনদের চোখে অশ্রু আর কণ্ঠে অভিযোগের সুর।
সম্রাটের বোন সুবর্ণা সিকদার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ভাইয়ের কোনো কিছুর অভাব ছিল না। ওর পছন্দের মেয়ের সাথেই বিয়ে দিয়েছি। কিন্তু ওকে অনেক মানসিক চাপ দেওয়া হয়েছে। আমার ভাই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানুষ না—ওকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে।
সম্রাটের বাবা সৈলেন বিশ্বাস অভিযোগ করে বলেন, আমার ছেলে খুব ভালো ছিল। বিয়ের সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই সব শেষ হয়ে গেল। আমার ছেলে আত্মহত্যা করতে পারে না—ওর স্ত্রী ও শাশুড়ি মিলে ওকে বিভিন্নভাবে চাপ দিয়েছে।
সম্রাটের কাকাতো ভাই শংকর বিশ্বাস জানান, মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি খুলনায় গিয়ে মরদেহ আনেন। সেখানে সম্রাটের স্ত্রীর আচরণে তিনি শোকের কোনো প্রকাশ পাননি বলে দাবি করেন।
তিনি বলেন, তার আচরণ খুব স্বাভাবিক ছিল। পরে বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারি, তাদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। এমনকি অন্য কোথাও সম্পর্কের বিষয় নিয়েও বিরোধ ছিল বলে শুনেছি।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে পুলিশে যোগ দেন সম্রাট বিশ্বাস। সর্বশেষ সাতক্ষীরায় কর্মরত থাকলেও চার মাস আগে বদলি হয়ে খুলনা রেলওয়ে পুলিশে যোগ দেন। চাকরির সময় সহকর্মী পূজা দাসের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং গত আশ্বিন মাসে তারা কোর্ট ম্যারেজ করেন। আগামী ১৯ বৈশাখ আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের আয়োজন হওয়ার কথা ছিল।
তবে বিয়ের পর থেকেই তাদের সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয় বলে দাবি পরিবারের।
অন্যদিকে, সম্রাটের স্ত্রী পূজা দাস এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমাদের মধ্যে কোনো ঝামেলা ছিল না। কিছুদিন আগেও সব স্বাভাবিক ছিল। সে কেন আত্মহত্যা করেছে, তা আমি জানি না।
সম্রাটের শাশুড়ি শেফালী দাস দাবি করেন, চাকরি সংক্রান্ত হতাশা থেকেই এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তার ভাষ্য, সে সিআইডিতে বদলির জন্য চেষ্টা করছিল, কিন্তু হয়নি। এতে সে হতাশ ছিল। এছাড়া আলাদা থাকার বিষয়টিও তাকে কষ্ট দিত।
শ্বশুর সচিন দাস বলেন, তিনি বাইরে থাকেন, তাই তাদের দাম্পত্য জীবনে কী ঘটেছে সে বিষয়ে অবগত নন।
প্রসঙ্গত, গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে খুলনার সোনাডাঙ্গা রেলওয়ে পুলিশ লাইন্সে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় নিজের রাইফেল দিয়ে আত্মহত্যা করেন সম্রাট বিশ্বাস। পরে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে এনে দাফন করা হয়।
সম্রাটের মৃত্যু এখন শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, বরং সমাজের কাছে এক গভীর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এটি কি নিছক আত্মহত্যা, নাকি মানসিক চাপে বাধ্য হয়ে নেওয়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত?
ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









