ভারতীয় ভূগোলবিদ্যার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও অগ্রগণ্য নাম শিবপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (১৯০৩–১৯৮৯)। গবেষণা, শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি ভারতীয় ভূগোলচর্চাকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছিলেন। এই কারণেই তাঁকে যথার্থই “ভারতীয় ভূগোলচর্চার জনক” বলা হয়।
১৯০৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি নদিয়ার শান্তিপুরে তাঁর জন্ম। স্থানীয় বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়-এ এবং ১৯২৬ সালে ভূতত্ত্বে এম.এসসি. ডিগ্রি লাভ করেন।
উচ্চতর গবেষণার উদ্দেশ্যে তিনি ইউরোপে পাড়ি জমান এবং প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়-এ বিখ্যাত ভূগোলবিদ ইমানুয়েল দ্য মার্তোন ও পল ভিদাল দে লা ব্লাশ-এর অধীনে অসমের গারো, খাসি ও জয়ন্তিয়া পাহাড়ি উপত্যকার ভূপ্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করেন। এই গবেষণার জন্য তিনি ১৯৩৬ সালে ডি.লিট. ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণাগ্রন্থ ‘লে প্লাটু দে মেঘালয়া’এ মেঘপুঞ্জে আচ্ছাদিত পাহাড়ি মালভূমির নাম তিনি দেন “মেঘালয়”, যা পরবর্তীকালে ভারতের একটি রাজ্যের সরকারি নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়, এটি তাঁর ভূগোলচিন্তার সুদূরপ্রসারী প্রভাবের এক স্মরণীয় নিদর্শন।
১৯২৮ সালে তিনি রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও ভূগোল বিভাগের প্রধান নিযুক্ত হন। ১৯৩৩ সালে ইউরোপ থেকে দেশে ফিরে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং সেখানে ভূগোল বিভাগকে শক্তিশালী ও আধুনিক রূপ দেন। শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিভাগে ভূগোল বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন তাঁর শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকার প্রমাণ। ১৯৬৭ সালে অবসর গ্রহণের পরও তিনি সাম্মানিক অধ্যাপক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ভারতবর্ষের ভৌগোলিক গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য একটি জাতীয় পর্যায়ের সংস্থার প্রয়োজনীয়তা তিনি গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন। সেই ভাবনা থেকেই ১৯৩৩ সালের ২৯ জুলাই কলকাতায় তিনি কলকাতা ভৌগোলিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া নামে পরিচিত হয় এবং আজও ভারতের ভূগোলচর্চার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।
ভূগোলশাস্ত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৫ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে। অবশেষে ১৯৮৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি এই মহান ভূগোলবিদ পরলোকগমন করেন।
ড. শিবপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন কেবল একজন গবেষক বা শিক্ষক নন; তিনি ছিলেন ভারতীয় ভূগোলবিদ্যার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নির্মাতা ও দিকপাল চিন্তক। তাঁর প্রবর্তিত শিক্ষা, গবেষণা ও সংগঠনমূলক উদ্যোগ আজও ভারতীয় ভূগোলচর্চাকে দিশা দেখায় এবং তাঁকে অমর করে রেখেছে জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









