রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৫ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

সংরক্ষিত নারী আসন ত্যাগে-শিক্ষায় চোখ

প্রকাশিত: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম

আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম

সংরক্ষিত নারী আসন ত্যাগে-শিক্ষায় চোখ

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল উভয় জোটেই চলছে নানা হিসাব নিকাশ। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উভয় জোটই প্রার্থী নির্ধারণের কাজ চলমান। এর মধ্যে বড় দল হিসেবে গত তিনদিনে বিএনপির কয়েক হাজার প্রার্থী মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে। তবে প্রায় তিন হাজার ফরম বিক্রি শেষে জমা  হলেও কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত ত্যাগীদের মূল্যায়ন করার পক্ষে। বিশেষ করে বিগত ১৭ বছরে যারা মাঠে ময়দানে দলের হয়ে কাজ করেছেন। তবে বিএনপির বিপরীতে ভিন্ন চিন্তায় হাঁটছে বিরোধী দল জামায়াত। দলটির ১৩টি আসনে ত্যাগীদের পাশাপাশি একাডেমিক যোগ্যতাসম্পন্নদের এমপি করতে চান তারা। এ নিয়ে প্রস্তুতিও প্রায় চূড়ান্ত করছে দলটি।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের উপস্থিতিতে মুখর দলটির নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। এর মধ্যে বিএনপির ৩৬টি আসনের বিপরীতে তিনদিনে দলটির ৩ হাজারের মতো ফরম বিক্রি হলেও জমা পড়েছে কমপক্ষে ১৮শটি, যা গড়ে প্রতি আসনের জন্য ৫০ জন প্রার্থী। তবে দলীয়ভাবে কারো কাছে আবেদন চাওয়া হয়নি। তবু মনোনয়নপ্রত্যাশীরা আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। 

সূত্র বলছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে থাকা নারীনেত্রী এবং মহিলা দলের নেত্রীদের পাশাপাশি সাবেক ছাত্রদল-সংযুক্ত তরুণ নেত্রীরাও মনোনয়ন–দৌড়ে রয়েছেন। অনেকে অতীতের আন্দোলনে ভূমিকা, দলীয় আনুগত্য ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রোফাইল (জীবনবৃত্তান্ত) তৈরি করে নীতিনির্ধারণী নেতাদের কাছে পাঠাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ জ্যেষ্ঠ নেতা ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সাক্ষাৎ করে মনোনয়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। তবে এসবে কাজ হবে না জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, যতই শীর্ষ নেতাদের বাসায় দৌড়ঝাঁপ করুক না কেন কোনো লাভ নেই, বিশেষ করে যারা মনোনয়নের আশায় সক্রিয় রয়েছেন, তাদের সব দিক বিবেচনা করেই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন কারা সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পাবেন। তবে এবার নারী আসনে তরুণ নেত্রীদের মূল্যায়নের সম্ভাবনা বেশি। বিশেষ করে ছাত্রদলের নেত্রীরা ও বিএনপি থেকে মনোনয়নবঞ্চিতদের স্ত্রী যারা মাঠে ছিলেন তারা এগিয়ে থাকবেন।

এ নিয়ে শেষ তিনদিনে ছোটখাটো কিছু ঘটনাও লক্ষ্য করা গেছে। যেসব নেত্রী গত ১৭ বছরে মাঠে ময়দানে ছিলেন তারা হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসাদের ঠেকাতে মরিয়া। তারা বলছেন, এখন এমন অনেককেই দেখা যাচ্ছে যাদের অনেককে বিগত ১৭ বছরে ১৭ মিনিটের জন্যও দেখা যায়নি। সংরক্ষিত নারী আসন থেকে যারা এমপি হতে যাচ্ছেন তারা অনেকেই বসন্তের কোকিল। তাদের ভিড়ে ত্যাগীদের দলে ঠাঁই পেতে কষ্ট হবে বলে মনে হচ্ছে। তাদের দাবি, বিএনপির রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে ছিলেন না শতাধিক নারী, অথচ এখন প্রায় ৩ হাজার নারী এমপি হতে চাচ্ছেন! আমরা বসন্তের কোকিলদের দেখতে চাই না।

বগুড়া জেলা বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় মহিলা দলের নির্বাহী সদস্য সুরাইয়া জেরিন রনি বলেন, কণ্ঠশিল্পী কনক চাঁপা বিএনপির কে? সে কি দল করেছে? যারা আন্দোলনে ছিলেন, ১৭ বছর দলের হয়ে আমরা খেটেছি। জেরিন রনি বলেন, বগুড়ার রাজপথে, ঢাকার রাজপথে ছিলাম। ১৭ বার জেলে গিয়েছি। মহিলাদের মধ্যে সর্বোচ্চ মামলা খেয়েছি। কনক চাঁপা এতদিন কোথায় ছিল? আমাদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কেন? আমরা সুবিধাবাদীদের দেখতে চাই না। রাজপথে যারা লড়াই-সংগ্রাম করেছেন আমরা তাদের চাই। শেষদিন বেবী নাজনীনসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেক মনোনয়নপ্রত্যাশী নয়াপল্টনে ভিড় করেন।

কর্মীদের এমন চিন্তার সঙ্গে একমত বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে আমরা শতভাগ আনন্দিত নই। অনেক ত্যাগী নেতার মূল্যায়নের সুযোগ নেই। এমনকি অনেকে এমপি মনোনয়নই পাননি। হয়তো সংরক্ষিত মহিলা আসনেও দেখা যাবে এমন কাউকে এমপি বানানো হবে যাদের রাজপথে কোনো ভূমিকা ছিল না। তবে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ জানান, বসন্তের কোকিলদের দলে মূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই। সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে বিগত আন্দোলন সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সংসদে কথা বলার যোগ্যতাসম্পন্ন নেত্রীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। রিজভী বলেন, মনোনয়নের বিষয়টি দলের পার্লামেন্টারি বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে। বিগত আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সংসদে কথা বলার যোগ্যতাসহ অন্যান্য যোগ্যতাও বিবেচনায় রাখা হবে।

অন্যদিকে বিএনপির তুলনায় কিছুটা ভিন্ন পথে হাঁটছে জামায়াত। দলটির শীর্ষ নেতাদের মতে, পরিবারতন্ত্র নয়, বরং যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে যাদের একাডেমি যোগ্যতা ভালো এবং পেশাগত দক্ষতায় সমৃদ্ধ এমন যোগ্যতাসম্পন্ন নেতৃত্বকেই বেছে নিতে চায় দলটি। সেজন্য তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলেও জানা যায়।

সূত্র জানায়, বিভিন্ন মানদণ্ড বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল, শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকাকেন্দ্রিক প্রতিনিধিত্বের কথা চিন্তায় রয়েছে জামায়াতের। সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম, এমন যোগ্য প্রার্থীদের বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দল পরিচালনার যোগ্যতা, দলীয় পদকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে সততা, অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি দলের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন; যোগ্যতার সঙ্গে আইন প্রণয়ন ও জনগণের অধিকার বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
জামায়াতের চিন্তায় একজন নারী সংসদে গিয়ে নারীদের পক্ষে, জাতির পক্ষে কথা বলতে পারবে, এমন প্রার্থী দেবেন তারা। ক্রিকেট বোর্ডের মতো প্রার্থী দেবে না দলটি। তাই পরিবারতন্ত্র নয়; জামায়াত প্রাধান্য দিচ্ছে যোগ্যতাকে। জামায়াত সূত্রে জানা গেছে, এরইমধ্যে যারা জামায়াতের ব্যানারে এমপি হয়েছেন, তারা বিভিন্ন পরিক্রমায় জামায়াতের নেতৃত্বে এসেছেন। তাদের ওপর আস্থা আছে, তারা সমাজে কোনো প্রকার অসংগতির সঙ্গে জড়িত হবেন না। সংরক্ষিত নারী আসনের ক্ষেত্রেও একই রকম চিন্তা দলটির।
মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে দলীয় সূত্রে জানা যায়, মহিলা বিভাগের কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলদের মধ্য থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। তবে জামায়াতের যেসব নেতা, যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের পরিবারের কোনো সদস্য মনোনয়ন পাবেন না। এক পরিবার থেকে দুজন সংসদ সদস্য হতে পারবেন না। সম্ভাব্য নারী প্রার্থীদের তালিকায় কিছুটা সংযোজন-বিয়োজন হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেজন্য আগেভাগেই তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে না।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, যারা সংসদ সদস্য হয়েছেন তাদের পরিবারের কেউই সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পাবেন না। তবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে যারা এবার সংসদ সদস্য হতে পারেননি, তাদের স্ত্রী-কন্যাকে সংরক্ষিত আসনে বিবেচনা করা হতে পারে। এর মানে হলো, এক পরিবার থেকে দুজন সংসদ সদস্য হতে পারবেন না। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নেসা সিদ্দীকা ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মারদিয়া মমতাজের নাম আলোচনায় রয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দের স্ত্রী আইনজীবী সাবিকুন্নাহার মুন্নীও প্রার্থী হিসেবে বিবেচনায় রয়েছেন।

জোটের আসন কত
সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াত জোট পাচ্ছে ১৩টি আসন। নিয়ম অনুযায়ী, জামায়াত ১২টি ও এনসিপি ১টি আসন পেতে যাচ্ছে। তবে এনসিপি আরো একটি আসন চায় জামায়াতের কাছে।

এনসিপি সূত্র বলছে, সংরক্ষিত নারী আসনের বিষয়ে সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে কিছুটা আলোচনা হয়েছিল। এনসিপি দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন ও যুগ্ম সদস্যসচিব মাহমুদা আলমকে সংসদে দেখতে চায়।

এনসিপির বাইরে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে, জোটের এমন এক–দুটি দল সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী দিতে চায়। তবে জামায়াতের একটি সূত্র বলছে, এবার জামায়াত ও এনসিপির বাইরে অন্য কোনো দলকে সংরক্ষিত আসনের জন্য বিবেচনা করার সম্ভাবনা কম।

প্রসঙ্গত, আগামী ১২ মে ভোটের দিন নির্ধারণ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এক ব্রিফিংয়ে এ তফসিল ঘোষণা করেন ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ। তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২১ এপ্রিল। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ২২ ও ২৩ এপ্রিল। আপিল করা যাবে ২৬ এপ্রিল। আপিল নিষ্পত্তি হবে ২৭ ও ২৮ এপ্রিল। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৯ এপ্রিল। প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে ৩০ এপ্রিল। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১২ মে।

কাওছার আল হাবীব/এদিন

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.

সংরক্ষিত নারী আসন ত্যাগে-শিক্ষায় চোখ | The Daily Adin