পৃথিবীর উষ্ণায়নের হাত থেকে হারিয়ে যাওয়া হিমবাহের হাজার বছরের জলবায়ু ইতিহাস রক্ষার এক অনন্য প্রচেষ্টা চলছে অ্যান্টার্কটিকার বরফখণ্ডে।
ইউরোপীয় আল্পসের হিমবাহের বরফের নমুনা গত শীতে ৫০ দিনের সমুদ্র যাত্রা শেষে পৌঁছেছে পূর্ব অ্যান্টার্কটিক মালভূমির কনকর্ডিয়া স্টেশনে। সেখানেই গড়ে উঠেছে ‘আইস মেমরি স্যাঙ্চুয়ারি’ একটি বরফ গুহায় খোদাই করা বিশেষ ভল্ট, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য পৃথিবীর জলবায়ু ইতিহাস সংরক্ষণ করবে।
বিজ্ঞান ও মানবতার দায়িত্ব
আইস মেমরি ফাউন্ডেশনের (আইএমএফ) পরিচালক অ্যান-ক্যাথরিন ওলম্যান বলেন, এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। এই বরফ সংরক্ষণাগার রক্ষা করা শুধু বৈজ্ঞানিক দায়িত্ব নয়, এটি মানবতার জন্য এক ঐতিহ্য। হিমবাহগুলো জলবায়ু সংরক্ষণাগারের মতো কাজ করে—সংকুচিত বরফের স্তরের মধ্যে প্রাচীন বায়ুমণ্ডলের গ্যাস, অ্যারোসল ও দূষণ আটকে রাখে। অতীতের জলবায়ু ভালোভাবে বোঝা গেলে ভবিষ্যতের পরিবর্তন আরও নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব।
প্রথম সংগ্রহ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
প্রথম দুটি বরফ কোর—ফ্রান্সের মন ব্লাঙ্কের কোল দ্যু ডোম থেকে ৪২০ ফুট এবং সুইজারল্যান্ডের গ্র্যান্ড কোম্বিন থেকে ৩২৫ ফুট—মোট ১.৭ টন ওজনের। এগুলোর সঙ্গে যোগ হবে ইউরোপীয় আল্পস, তাজিকিস্তান, বলিভিয়া, সভালবার্ড এবং সম্ভবত রাশিয়ার নমুনা।
ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের এক-তৃতীয়াংশ হিমবাহ—যেমন যোসেমাইট, ডলোমাইটস ও কিলিমাঞ্জারো—২০৫০ সালের মধ্যে গলে যাবে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির ১.৫ ডিগ্রি লক্ষ্য অর্জন না হলে আরও বিপর্যয় হবে। বর্তমানে পৃথিবী ১.৩ ডিগ্রি উষ্ণ হয়েছে।
প্রযুক্তির সীমা অতিক্রম করে
কিংস কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিজ্ঞানী টম ম্যাথিউস বলেন, এই সংরক্ষণাগারের সর্বশেষ অধ্যায়—কার্বন ডাই অক্সাইডের অভূতপূর্ব ঘনত্ব—একটি গল্প বলে যা বলে দেয়, এই ইতিহাসের বই একদিন শেষ হবে।
তিনি আশা করেন, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নতুন আবিষ্কারের দ্বার খুলবে। আইএমএফ চেয়ারম্যান থমাস স্টোকার বলেন, ৫০ বা ১০০ বছর পর বিজ্ঞানীদের এমন বিশ্লেষণী ক্ষমতা থাকবে যা আজ কল্পনাও করতে পারি না।
প্রাকৃতিক ফ্রিজ
আইএমএফ পাঁচটি নতুন স্থান চিহ্নিত করেছে—ব্রিটিশ কলম্বিয়া থেকে আলাস্কার প্রশান্ত মালভূমি, দক্ষিণ আমেরিকার অ্যান্ডিজ, নরওয়ের সভালবার্ড উপঅ্যান্টার্কটিক দ্বীপপুঞ্জ এবং হিন্দুকুশ হিমালয়। এসব নমুনায় মোট ৩ লাখ বছরের তথ্য থাকবে বলে আশা। অ্যান্টার্কটিকার অভ্যন্তরকে বেছে নেওয়া হয়েছে কারণ এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ঠান্ডা ও স্থিতিশীল স্থান—জলবায়ু ও রাজনৈতিকভাবে। কনকর্ডিয়া স্টেশনের কাছে বরফ গুহায় বিদ্যুৎ ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে-৬১ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা বজায় থাকে। ৩০ ফুট গভীর ও ১১৫ ফুট লম্বা একটি গলিতে ১৬ ফুট উঁচু ও চওড়া একটি গুহা তৈরি করা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে বরফ চাপ পড়লে নতুন গুহা খোদাই করতে হবে।
আইনি জটিলতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
১৯৫৯-এর অ্যান্টার্কটিক চুক্তি মহাদেশকে শুধু শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অনুমতি দেয় এবং গবেষণার ফলাফল স্বাভাবিকভাবেই খোলা রাখতে হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে বরফ কোরের মালিকানা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।
ওলম্যান বলেন, বরফ কোরের জন্য কোনো আইনি মর্যাদা নেই, তাই আমাদের তৈরি করতে হবে। আমরা আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। তিনি বিশ্বাস করেন, এই প্রকল্প সীমান্ত পেরিয়ে মানব ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার এক আশাবাদী দৃষ্টান্ত। আমরাই শেষ প্রজন্ম যারা পদক্ষেপ নিতে পারে বলেন ওলম্যান।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









