কোরবানির ঈদ এলেই একসময় দেশের চামড়া শিল্পে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরত। এতিমখানা-মাদরাসা থেকে শুরু করে মৌসুমি ব্যবসায়ী—সবার চোখ থাকত কাঁচা চামড়ার বাজারে। কিন্তু সেই বাজারে নেমেছে ভয়াবহ ধস। বিগত কয়েক বছরের মতো এবারও কোরবানির পশুর চামড়া বাজারে ধস নেমেছে। সরকারের বেঁধে দেওয়া দর মানেননি ট্যানারি মালিক ও বড় আড়ৎদাররা। চামড়ার বাজারগুলো থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক কমে কাঁচা চামড়া কিনেছেন তাঁরা। ফলে বিভিন্নস্থান থেকে সংগৃহীত চামড়া বিক্রি করতে এসে মৌসুমি ও ছোট চামড়া ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিভিন্ন মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও এতিমখানা সংশ্লিষ্টরাও পর্যাপ্ত দাম পাননি। সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি না হওয়া শত শত গরুর চামড়া নদীর পাড়ে, সড়কে কিংবা খোলা জায়গায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও মাটিচাপা, কোথাও নদীতে নিক্ষেপ। পুরো পরিস্থিতি যেন দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতের ভয়াবহ পতনের প্রতিচ্ছবি। তবে এ বিষয়ে সরকারের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।
কোরবানির চামড়ার বাজারে প্রতিবছরই কেন এই বিপর্যয় ঘটে— এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। সরকারের কৃত্রিমভাবে দাম নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক বাজার হারানো, চীনের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা, ট্যানারির সংকট, পরিবেশগত সনদ না পাওয়া এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক বাজার কাঠামো— সব মিলিয়ে দেশের চামড়া শিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার প্রশাসনিকভাবে দাম নির্ধারণ করলেও বাজারে সেই দামে কেনার সক্ষমতা বা চাহিদা তৈরি করতে পারেনি। ফলে ঘোষিত মূল্য কার্যত কাগুজে ঘোষণায় পরিণত হয়েছে। সরকার কাঁচা চামড়ার ন্যূনতম মূল্য ঘোষণা করলেও তা কার্যকরে কোনো কার্যকর মনিটরিং নেই। ফলে বাজার পুরোপুরি মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, কোরবানির চামড়ার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশের চামড়া শিল্পকে আরও শক্তিশালী ও রপ্তানিমুখী খাতে পরিণত করা সরকারের লক্ষ্য। জুলাই মাসের মধ্যে চামড়া খাতের উন্নয়ন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের নীলডুমুর খেয়াঘাটে খোলপেটুয়া নদীর তীরে স্তূপ হয়ে পড়ে থাকা চামড়া কিংবা ফেনীর কাটাখালি নদীতে ফেলে দেওয়া শতাধিক গরুর চামড়া শুধু স্থানীয় সংকট নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির গভীর অসুস্থতার ইঙ্গিত বহন করে। তবে সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকারের চামড়ার মূল্য বেঁধে দেওয়া, দ্বিতীয়ত চামড়ার রপ্তানি বাজার সংকুচিত হওয়া। রপ্তানির ক্ষেত্রে চীনই একমাত্র ভরসা। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার মতো বড় বাজারের ক্রেতারা বাংলাদেশি চামড়ার বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, কাঁচা চামড়ার বাজার কয়েকটি বড় গ্রুপ ও ট্যানারি মালিকের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ঈদের সময় তারা সমন্বিতভাবে কম দামে চামড়া কিনে থাকে। ফলে গ্রামের মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো প্রতিযোগিতামূলক বাজার পায় না। অনেক এলাকায় পাইকাররা ইচ্ছাকৃতভাবে দেরিতে বাজারে আসে, যাতে চামড়া পচে যাওয়ার ভয় তৈরি হয় এবং সংগ্রাহকরা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। যদিও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মুক্তাদির বলেছেন, সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ, ব্যবসায়ী–আড়তদারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং মসজিদ–মাদরাসাভিত্তিক সংরক্ষণ কার্যক্রমের ফলে এবারের কোরবানির অধিকাংশ চামড়া ব্যবহার উপযোগী অবস্থায় সংগ্রহ করা সম্ভব হবে বলে সরকার আশাবাদী।
ঈদের চতুর্থ দিনেও রাজধানী ও আশপাশের এলাকা থেকে সাভারের চামড়াশিল্প নগরীতে চামড়া আসছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গতকাল দুপুর পর্যন্ত সাভারের ট্যানারিগুলোতে ৫ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৫টি কাঁচা চামড়া এসেছে। বিসিক চামড়াশিল্প নগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাঈয়ান বলেন, চামড়া আসার প্রক্রিয়াটি নির্বিঘ্ন করতে বিসিকের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে। বিসিকের তথ্য অনুসারে, ঈদের দিন বিকেল থেকে শুরু করে গতকাল রবিবার দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ১ হাজার ৭১৩টি চামড়াবাহী ট্রাক চামড়াশিল্প নগরীতে ঢুকেছে। রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা ছাড়াও কিছুটা দূর থেকেও অনেক ট্রাক আসার খবর পাওয়া গেছে। শিল্পনগরীতে আসা চামড়ার মধ্যে গরু ও মহিষের চামড়ার সংখ্যা বেশি। বিসিকের হিসাবে, গতকাল দুপুর পর্যন্ত শিল্পনগরীতে গরু ও মহিষের চামড়া এসেছে ৫ লাখ ১১ হাজার ৭০০টি। অন্যদিকে ১৬ হাজার ১৭৫টি ছাগল ও ভেড়ার চামড়া এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদুল আজহায় কাঁচা চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রতি বছরের মতো এবারও দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল সরকার। এবার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। তবে চামড়ার বাজারে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যায়নি। রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বাজারগুলোতে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়েছে সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক কমে। গত বছরের চেয়ে প্রতি পিস ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। এছাড়া এবারও ছাগলের চামড়া কেনায় আগ্রহ দেখান না ব্যবসায়ীরা। মাঠপর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া বিক্রির জন্য মূলত ট্যানারি ও বড় আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তারা বাধ্য হয়েই কম দামে চামড়া কিনছেন এবং বিক্রি করছেন।
রাজধানীর বৃহত্ত্বম চামড়ার বাজার লালবাগের পোস্তার আড়ৎগুলো ঘুরে কাঁচা চামড়ার দর পতনের চিত্র পাওয়া গেছে। ঈদের দিন সন্ধ্যার পর সেখানে দেখা গেছে, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া নিয়ে এলেও সরকার নির্ধারিত মূল্য পাননি। তাদের অভিযোগ, প্রতি বছর ঈদের আগে সরকার দাম ঘোষণা করলেও বাজার তদারকিতে কার্যকর ভূমিকা দেখা যায় না। ফলে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন।
চামড়া ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করতে লবণ, শ্রমিক ও পরিবহন মিলিয়ে গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা খরচ হয়। সে হিসাবে সরকারি নির্ধারিত দাম অনুযায়ী বাজারে যে দর থাকার কথা, বাস্তবে তার অর্ধেকেরও কমে বিক্রি হচ্ছে অধিকাংশ চামড়া। পোস্তা বাজারে ২০ পিস গরুর চামড়া বিক্রির জন্য নিয়ে এসেছিলেন মৌসুমি ব্যবসায়ী জাকির হোসেন। তিনি প্রতি পিস চামড়ার দাম ১ হাজার টাকা চাইলে আড়ৎ মালিকরা ৬৫০ টাকার বেশি দিতে রাজি হননি। পরে তিনি দাম কমিয়ে ৮০০ টাকা করলেও ক্রেতা মেলেনি। জাকির বলেন, গত বছর এই ধরনের চামড়া ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এবার সবাই ৬০০-৬৫০ টাকার বেশি বলতে চাচ্ছে না। সরকার দাম বাড়ালেও বাজারে তো তার কোনো প্রভাব নেই।
রাজধানীর অন্যান্য চামড়ার বাজারগুলোতেও সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, শ্যামলি, মিরপুর, মালিবাগ, মগবাজার, মুগদা, ধানমন্ডি, কলাবাগান, সায়েন্স ল্যাব ও শেওড়াপাড়া ঘুরে দেখা গেছে, ছোট আকারের গরুর কাঁচা চামড়া ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকায়, মাঝারি আকারের চামড়া ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায় এবং বড় আকারের চামড়া ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ সরকার ঘোষিত দরে একটি মাঝারি আকারের চামড়ার মূল্য হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা। একইভাবে বড় আকারের চামড়ার সম্ভাব্য মূল্য ছিল প্রায় ২ হাজার টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকার বেশি।
মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার দাম বাড়ালেও ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে সেই দাম পাননি তারা। ট্যানারি থেকে যে দর নির্ধারণ করা হয়, তার ভিত্তিতেই তারা মাঠপর্যায়ে চামড়া কেনাবেচা করেন। এতে শেষপর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়েন কোরবানিদাতা ব্যক্তি, মসজিদ-মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো। তবে তাঁরা বলছেন, এবার কোরবানির সংখ্যা কিছুটা কম হতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই ট্যানারি মালিকরা এবার ৭৫ থেকে ৮০ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, যা গত বছরের তুলনায় কম। তাছাড়া চামড়ার বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের অস্বচ্ছতা কাজ করছে। সরকার দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই দাম কার্যকর করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
জানতে চাইলে পোস্তা এলাকায় কাঁচা চামড়ার আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) সভাপতি টিপু সুলতান দাবি করেছেন, সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের মধ্যেই বেশির ভাগ বেচাকেনা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তো চোখের দেখায় কাঁচা চামড়া কিনি। এ জন্য দামে ৫০ টাকা কমবেশি হতে পারে।
তবে ট্যানারি মালিকরা কম দামে চামড়া কেনার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাখাওয়াত উল্লাহর দাবি, গত বছরের তুলনায় চামড়ার দাম কমেনি, বরং ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। তিনি নিজেই ৬৫০ থেকে ৯৫০ টাকা পর্যন্ত দামে চামড়া কিনেছেন। তিনি বলেন, রাজধানীর কাঁচা চামড়ার বাজার স্থিতিশীল রাখতে অনেক ট্যানারি এবার সরাসরি মাঠপর্যায়ে চামড়া কিনছেন। তবে বাজার পুরোপুরি জমতে সময় লাগে। ঈদের দিন দুপুর পর্যন্ত কেনাবেচা জমে না ওঠায় কোথাও কোথাও কম দামে বিক্রি হয়ে থাকতে পারে। বিকেল থেকে সন্ধ্যার পর দাম আরও বাড়তে পারে।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলেই মনে করছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর পোস্তাসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঈদের দিন সন্ধ্যার পর চামড়ার বাজার কিছুটা জমে উঠলেও দামে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। বড় আকারের চামড়া ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায়, মাঝারি আকারের চামড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় এবং ছোট চামড়া ১৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
এদিকে, গরুর মতো ছাগলের চামড়ার বাজারেও ধস নামে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতি পিস ছাগলের চামড়া মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায়ও বিক্রি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো দাম ছাড়াই চামড়া নিয়ে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জানান, ছাগলের চামড়া এখন অনেকের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ চামড়া বিক্রি করে সংরক্ষণ খরচও তুলতে পারছেন না তারা। এই কারণে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করেও লোকসানের মুখে পড়েছেন।
চামড়ার বাজারে এই অস্থিরতার বড় ভুক্তভোগী দেশের মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোও। কারণ অনেক মাদরাসার খরচের বড় একটা অংশ আসে প্রতিবছর সংগৃহীত কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি থেকে। সবচেয়ে বেশি চামড়া সংগ্রহ করে থাকে বিভিন্ন মাদরাসা ও এতিমখানা। অনেক কোরবানিদাতাই স্বেচ্ছায় তাদের পশুর চামড়া এসব প্রতিষ্ঠানে দান করেন। এই চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়েই মূলত লিল্লাহ বোর্ডিং, এতিমখানা এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও অন্যান্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়। কিন্তু কয়েক বছর ধরেই চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ছে। দাম কম থাকায় মাদরাসাগুলোর মধ্যেও চামড়া সংগ্রহে কিছুটা অনীহা দেখা যাচ্ছে। এ বছরও পর্যাপ্ত দাম না পাওয়ায় আগামী দিনগুলোতে তারা প্রতিষ্ঠান চালাতে হিমশিম খাবেন বলে ধারণা করছেন। খিলগাঁওয়ের নাজমুল হক মদিনাতুল উলুম কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাহবুবুল্লাহ বলেন, প্রতি বছর পরিকল্পিতভাবে চামড়া খাতকে ধ্বংস করা হচ্ছে। চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পেলে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এদিকে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বড় ক্রেতা এখন মূলত চীন। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, রপ্তানির বড় অংশই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে চীনা বাজারের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা এখন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনে অর্থনৈতিক মন্দা, শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় দেশটি আগের মতো চামড়া কিনছে না। এমনকি কিনলেও তুলনামূলক কম দামে কিনছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপ ও পশ্চিমা বাজারে প্রবেশে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশ এক ধরনের “সিঙ্গেল মার্কেট ট্র্যাপ”-এ আটকে গেছে। ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো এখনও সাভারের ট্যানারি শিল্পাঞ্চলের পরিবেশগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আন্তর্জাতিক মানের সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় অনেক বড় ব্র্যান্ড বাংলাদেশি চামড়া এড়িয়ে চলছে।
চামড়া খাতের ট্যানারি আয়ুব ব্রাদার্স লিমিটেডের পরিচালক বেলাল হোসেন বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় ট্যানারি মালিকরা কম দামে চামড়া কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। তার মতে, সরকারকে আগে চামড়া শিল্পের সমস্যার শিকড়ে যেতে হবে। সেখানে সমাধান করা গেলে কোরবানির চামড়ার মূল্য বেঁধে দেওয়া বা না দেওয়া তেমন প্রভাব ফেলবে না। বর্তমানে আমরা শুধু চীনের বাজারের ওপর ভরসা করে পুরো চামড়া খাত পরিচালনা করছি। সেখান থেকে বের হতে হলে আমাদের কারখানাগুলোকে কমপ্লায়েন্স করতে হবে। এ জন্য সরকারের সহায়তা প্রয়োজন।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম ১০ মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৯৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে তা হয়েছিল ৯৩ কোটি ২৫ লাখ ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাতে রপ্তানি আয় ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন বা ১১৪ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) চামড়া খাত থেকে মোট রপ্তানি আয় হয়েছিল ১ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন বা ১০৩ কোটি ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় কিছুটা কমে ১ দশমিক ১৭ বিলিয়ন বা ১১৭ কোটি ডলারে নেমে আসে, যা ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ১২৪ কোটি ডলার।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি আয় প্রতি অর্থবছরে ১ বিলিয়ন ডলারের ওপরে থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তি এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাজারের মেলবন্ধন তৈরি করা যাচ্ছে না। পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা এবং চামড়া খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া এ খাতের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
জানা গেছে, প্রান্তিক পর্যায়ের সংগ্রাহক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা প্রায়ই সরকার নির্ধারিত মূল্যে কাঁচা চামড়া বিক্রি করতে পারেন না। চামড়া সংরক্ষণের অন্যতম উপাদান লবণের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ ও দীর্ঘ প্রক্রিয়াকরণ ব্যয় মিলিয়ে মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হয়। চামড়া সংগ্রহ ও বিপণন প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়াদের আধিপত্যের কারণে প্রান্তিক খামারি ও বিক্রেতারা সরাসরি লাভবান হতে পারেন না।
চামড়া খাত বছরের পর বছর ধরে নানা অব্যবস্থাপনা, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতায় এক গভীর সংকটে পড়েছে। মাঠপর্যায়ের মৌসুমি ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা ন্যায্যমূল্য না পেয়ে পুঁজি হারিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করছেন। ট্যানারি মালিকরা জানিয়েছেন, সিইটিপির সংস্কার ও পূর্ণসক্ষমতায় পরিচালনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এলডব্লিউজি সনদ পাওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত রাসায়নিক আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা ও সহজ অর্থায়ন করতে হবে।
এদিকে চামড়াশিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পশু কোরবানি বন্ধ থাকায় সেখানকার চামড়াশিল্পে কাঁচা চামড়ার চাহিদা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন সীমান্তপথ দিয়ে কোরবানির চামড়া পাচারের ঝুঁকি রয়েছে। বিষয়টি সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছেন ট্যানারিশিল্পের নেতারা। অবশ্য কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ, কেনাবেচা, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা ঠিক রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে তিনটি কমিটি গঠন করেছে। খোলা হয়েছে মনিটরিং সেলও। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন, বিটিএ, ধারণা করছে, এ বছর দেশে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ পিস পশুর চামড়া সংগ্রহ হতে পারে। ঈদের দিন থেকে অন্তত তিন মাস সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন বিটিএ চেয়ারম্যান শাহিন আহমেদ। তিনি বললেন, পশ্চিমবঙ্গে এ বছর কোরবানি বন্ধ রাখা হচ্ছে। কিন্তু ওই অঞ্চলের চামড়াশিল্প চালু রাখতে কাঁচা চামড়ার প্রয়োজন হবে। এ কারণে সীমান্ত দিয়ে ভারতে কাঁচা চামড়া পাচারের আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র জানায়, চামড়া পাচারের সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, পাটকেলঘাটা, কালীগঞ্জ, নড়াইল ও রাজারহাট এলাকার চামড়া বেনাপোল, কলারোয়া ও সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে পাচারের আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া ঝিনাইদহ, মাগুরা, শৈলকুপা, কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর অঞ্চলের চামড়া জীবননগর সীমান্ত দিয়ে পাচার হতে পারে। নাটোর হাটের চামড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ ও রাজশাহীর গোদাগাড়ী সীমান্ত দিয়ে পাচারের ঝুঁকি রয়েছে। চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, আল্লাহর দরগা, দৌলতপুর ও আলমডাঙ্গার চামড়া পাচারের সম্ভাব্য রুট হিসেবে মেহেরপুর ও দর্শনা সীমান্ত পয়েন্টকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলে জাফলং, তামাবিল ও করিমগঞ্জ সীমান্ত পথকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন সীমান্ত পথ দিয়েও চামড়া পাচারের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। অন্যদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, দেশে বছরে প্রায় ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদিত হয়, যার ৬০ শতাংশের বেশি আসে কোরবানির মৌসুমে। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশই গরুর চামড়া।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









