পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি কাটিয়ে রাজধানী এখনো পুরোপুরি চেনা রূপে ফেরেনি। ৭ দিনের ঈদের ছুটির পর গতকাল সোমবার প্রথম কর্মদিবসে দেখা গেছে ঢাকার বাজারগুলোতে অর্ধেকের বেশি সবজির দোকান বন্ধ রয়েছে। জানা গেছে, পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে সবজি বিক্রেতা থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের ব্যবসায়ীরাও ঢাকা ছেড়েছেন। এতে সবজি ও নিত্যপণ্যের দোকানগুলোর অর্ধেকের বেশি বন্ধ রয়েছে। অবশ্য বাজারে বিক্রেতার পাশাপাশি ক্রেতার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে কম রয়েছে। তবে, এই ক্রেতা-বিক্রেতার স্বল্পতার মধ্যেও প্রায় সব ধরনের সবজি ও মাংসের বাজারে স্বস্তি ফিরেছে। বাজারে অধিকাংশ সবজি এখন ৬০-৮০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে। যা ঈদের আগে আরো চড়া ছিল। সবজির পাশাপাশি মুরগি ও ডিমের বাজারেও বড় ধরনের স্বস্তি ফিরেছে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার কাঁচাবাজার ঘুরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বেচাকেনা ও দামের এমন চিত্র দেখা গেছে। সাধারণত ঈদের পরপরই কাঁচা মরিচ, শসা, টমেটোসহ কিছু পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হলেও এবার চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। বরং বেশকিছু পণ্যের দাম ঈদের ছুটির মধ্যে আগের চেয়ে কমেছে।
কাঁচা বাজারে আসা ক্রেতারা বলছেন, বর্তমানে রাজধানীতে জনসমাগম স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম থাকায় ভোগ্যপণ্যের চাহিদাও কমে গেছে। ঈদের ছুটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ছেড়ে যাওয়ায় কাঁচাবাজার, মাছ-মাংসের দোকান এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে কোরবানির মাংস ঘরে মজুত থাকায় মুরগি ও গরুর মাংসের বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি কম দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে মাছের বাজারে সরবরাহ সীমিত থাকায় সেখানে এখনো উল্লেখযোগ্য মূল্যহ্রাস হয়নি। তবে রাজধানীতে মানুষের ফিরতি চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পেলে কিছু পণ্যের দামে আবারো পরিবর্তন আসতে পারে। দিন শেষে আমরা ক্রেতারা সবসময় ভুক্তভোগী।
তবে অর্থনীতিবিদ ও বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। ঈদ-পরবর্তী সময়ে বাজারে যে মূল্যস্বস্তি দেখা যাচ্ছে, তা শুধু মৌসুমি প্রভাব নয় বরং সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যেরও প্রতিফলন। তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ তুলনামূলক ভালো থাকায় বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়নি। তবে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে বাজার ব্যবস্থাপনায় নজরদারি জোরদার করতে হবে। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে মূল্যতথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অযৌক্তিক মুনাফা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষক যেন উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান এবং ভোক্তাও সহনীয় দামে পণ্য কিনতে পারেন, সেজন্য উৎপাদন এলাকা থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলা আরো কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা। তাদের মতে, বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় থাকলে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে আসন্ন সপ্তাহগুলোতেও নিত্যপণ্যের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ বিষয়ে ইসলামিক ইকোনমিক রিসার্চ ব্যুরোর সাধারণ সম্পাদক অর্থনীতিবিদ ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, ঈদের দীর্ঘ ছুটির সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীতে পণ্য পরিবহনে কিছুটা ধীরগতি থাকলেও বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়নি। বরং ঈদের আগে অতিরিক্ত সরবরাহ ও মজুত থাকা অনেক পণ্য এখন বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে সবজি, ডিম ও মুরগির ক্ষেত্রে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় ব্যবসায়ীরা বাড়তি দাম রাখার সুযোগ পাচ্ছেন না। পাইকারি বাজারে দর কমে যাওয়ার প্রভাব ইতোমধ্যে খুচরা বাজারেও পড়তে শুরু করেছে।
তিনি আরো বলেন, ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন- পরিবহন ব্যয়, শ্রমিক খরচ ও বাজার পরিচালনার ব্যয় বাড়লেও বর্তমানে ক্রেতা ধরে রাখার স্বার্থে তারা সীমিত মুনাফায় পণ্য বিক্রি করছেন। তবে বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি বাড়লে এবং চাহিদা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরলে পণ্যের দামে আবারো কিছুটা ওঠানামা হতে পারে। তাই নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের ওপর জোর দেন এই অর্থনীতিবিদ।
সরেজমিন মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে অন্তত ২০টি সবজির দোকান থাকলেও মাত্র ৭-৮টি দোকান খোলা রয়েছে, বাকি সবই বন্ধ। একই চিত্র দেখা গেছে, আগারগাঁও তালতলা বাজারেও। সেখানেও অর্ধেকের বেশি সবজির দোকান খোলেনি। তবে দোকান বন্ধ থাকলেও সবজির দাম এখন ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে। ঈদের আগে যেসব সবজি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, তা এখন ৬০ থেকে ৮০ টাকায় নাম এসেছে। বাজারে এখন সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে ঢেঁড়শ, যা প্রতি কেজি পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪০ টাকায়। এ ছাড়া পেঁপে, সাদা বেগুন, চিচিঙ্গা, পটোল, ঝিঙে, ধুন্দল ও উস্তা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা দরে। প্রতি কেজি করলা, কাঁকরোল, কালো গোল বেগুন ও বরবটি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা দরে। প্রতি পিস লাউ পাওয়া যাচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় এবং কাঁচা আম বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৩০ টাকা কেজি দরে।
সাধারণত ঈদের পর প্রথম ৩-৪ দিন কাঁচা মরিচ, লেবু, শসা, গাজর ও টমেটোর চাহিদা অনেক বেশি থাকে। তবে এবার এসব পণ্যের দাম বেশ স্থিতিশীল। ঈদের আগের তুলনায় প্রতিটি পণ্যের দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি টমেটো ৮০ থেকে ১০০ টাকা, শসা ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং গাজর ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে। আর লেবু আগের মতোই প্রতি হালি ১৫ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
গতকাল মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে সবজি কিনতে এসেছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী আসিফ হাসান। তিনি সকালেই গ্রামের বাড়ি বরিশাল থেকে ফিরেছেন। তিনি জানান, ঢাকায় ফিরে সবজির দাম অনেক কম দেখতে পেয়ে অবাক হয়েছি। গ্রামের বাড়িতে যেই লাউ ১০০ টাকায় কিনেছেন, তা এখানে ৭০ টাকায় কিনতে পেরেছেন। এছাড়া তিনি ৩০ টাকায় আধা কেজি কাঁচা মরিচ, ২০ টাকায় আধাকেজি ভেন্ডি ও ১৫ টাকায় এক হালি লেবু কিনতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। মোহাম্মদপুর বাজারে সবজি বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, ঈদের পরে আবহাওয়া ভালো, বৃষ্টিও নেই। তাছাড়া সবজির নতুন সরবরাহও এসেছে। এ কারণে বাজারে অনেক সবজির দাম কম রয়েছে। তাছাড়া ক্রেতার সংখ্যা কম থাকায় অল্প লাভেই তারা সবজি ছেড়ে দিচ্ছেন।
অন্যদিকে ঈদের পর সবচেয়ে বেশি ক্রেতাশূন্য অবস্থা দেখা গেছে মাছ ও মাংসের বাজারে। কোরবানি ঈদের কারণে ঘরে ঘরে মাংসের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় ব্রয়লার বা গরুর মাংসের দোকানে তেমন কোনো ভিড় নেই। বাজারে ব্রয়লার মুরগি ও সোনালি মুরগির দাম ঈদের আগের তুলনায় সামান্য কমলেও ক্রেতার দেখা মিলছে না। তাছাড়া বাজারে মাছের সরবরাহ কম থাকায় মাছের বাজার কিছুটা চড়া। ইলিশ, রুই, কাতলা কিংবা চাষের পাঙাশ-তেলাপিয়া সব ধরনের মাছই ঈদের আগের বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে। খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, গতকাল অফিস-আদালত পুরোদমে চালু হলে ও সাধারণ মানুষ গ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরতে শুরু করলে বাজার আবার স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে।
সবজির বাজারের চেয়েও বেশি স্বস্তি দেখা গেছে মুরগি ও ডিমের বাজারে। ঈদের দুদিন আগেও যেখানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে, তা এখন একলাফে কমে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় নেমে এসেছে। সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ২০ টাকা কমে এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৬০ টাকায় এবং কক মুরগি পাওয়া যাচ্ছে ৩৮০ টাকা দরে। অন্যদিকে, ডিমের দামও ঈদের পর কিছুটা কমেছে। ঈদের আগে ফার্মের মুরগির ডিম প্রতি ডজন ১৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ডজনপ্রতি ১৫ টাকা কমে মাত্র ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
টাউন হল বাজারের মুরগির বিক্রেতা আবুল কাসেম বলেন, প্রতি বছরই ঈদুল আজহার পরপর কয়েক দিন মুরগি চাহিদা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমে যায়। এবারও চাহিদা কম রয়েছে। এই সময় খামার থেকে কিছুটা কম দামে মুরগি কিনতে পারেন তারা। এজন্য খুচরা বাজারেও দাম কমেছে।
তালতলা বাজারের সবজি বিক্রেতা রফিক বলেন, ঈদের পর বাজারে একদমই কাস্টমার নেই। ঢাকায় মানুষ না ফিরলে বাজার জমবে না। দিনে যে দুই-চারজন আসছেন, তারা খুবই অল্প পরিমাণে কেনাকাটা করছেন। বেচাবিক্রি না থাকায় আমাদের শুধু বসে থাকতে হচ্ছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিং বাজার সমিতির সদস্যরা জানান , ঈদুল আজহার পর ঢাকার কাঁচাবাজারে এমন চিত্র প্রায় প্রতি বছরই দেখা গেলেও এবার দাম কমার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি স্পষ্ট। সাধারণত ঈদের আগে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে সবজি, মুরগি ও ডিমের দাম বাড়ে, কিন্তু ঈদ শেষে চাহিদা হঠাৎ কমে যাওয়ায় বাজারে এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন কৃষি অঞ্চল থেকে নতুন করে সবজির সরবরাহ বাড়ায় বাজারে পণ্যের প্রাপ্যতাও বেড়েছে। ফলে বিক্রেতারা পণ্য দ্রুত বিক্রি করতে তুলনামূলক কম লাভে বিক্রি করছেন। এতে দীর্ঘদিন পর রাজধানীর ভোক্তারা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাচ্ছেন।
এই বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী তরিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে বাজারে বিক্রির চেয়ে পণ্য সংরক্ষণ ও পরিচালন ব্যয়ই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রেতা কম থাকায় প্রতিদিনের বিক্রি আশানুরূপ হচ্ছে না। ফলে অনেক ব্যবসায়ী দ্রুত পণ্য বিক্রির জন্য তুলনামূলক কম মুনাফায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পুরোপুরি সচল হলে রাজধানীর বাজারগুলো আবার প্রাণ ফিরে পাবে। তখন বেচাকেনা বাড়ার পাশাপাশি বাজারের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থাও আরো শক্তিশালী হবে আশা করছেন তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









