বাংলাদেশে নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী শুক্রবার বাংলাদেশে পা রাখার পরপরই দুই দেশের জনসংখ্যা ও গণতন্ত্রকে ‘এক করার’ এক অভিনব ও বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন তখন, যখন শুক্রবার দিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ে চারদিনের সম্মেলনের পরও যৌথ সংবাদ সম্মেলন হয়নি। এমনকি দেওয়া হয়নি যৌথ বিবৃতিও। দুই বাহিনী যে যার মতো বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এ রকম সম্মেলনের রীতি হচ্ছে- যৌথ সংবাদ সম্মেলন। কমপক্ষে যৌথ বিবৃতি। তখন তা দেওয়া যায় না, যখন দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য থাকে। আরো সরল করে বললে, দুই পক্ষের মধ্যে যখন কোনো বিষয়েই ঐকমত্য হয় না। যা অনেকটা নজিরবিহীন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সঙ্গত কারণেই দীনেশ ত্রিবেদীর এমন বক্তব্যের হেতু খুজঁছেন সংশ্লিষ্টরা। ত্রিবেদীর এমন বক্তব্যে এখন দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। কারণ তাঁর এই বক্তব্যকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সর্বস্তরের জনগণ।
গত শুক্রবার বেলা ১২টার দিকে স্ত্রী মৃণাল ত্রিবেদীকে নিয়ে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদী। ইমিগ্রেশন ও প্রটোকলসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন নতুন হাইকমিশনার। তখনই ‘দুই দেশের মিলে যাওয়া’ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন ত্রিবেদী। এ সময় ভারত কর্তৃক অবৈধ অভিবাসী আখ্যা দিয়ে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে দেওয়া (পুশইন) সংক্রান্ত সাংবাদিকদের সরাসরি প্রশ্ন এড়িয়ে যান তিনি।
পর্যটন ভিসা চালুর বিষয়ে জানতে চাইলে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, “আমি একটাই কথা বলতে পারি; আমাদের যা পপুলেশন আছে ১৪০ কোটি, আর আমি কুড়ি কোটি অ্যাড করি, তাহলে ১৬০; ... তাহলে যা হবে, একসঙ্গে হবে। আলাদাভাবে আমি ভাবছি—আমার মনে ওইটা ঢুকছেই না।” তিনি আরো যোগ করেন, “দেখুন তো হেঁটে চলে এলাম, মনে হচ্ছে না যে আমি বাংলাদেশি না। ...সব সময় আমি বলি একই আকাশ একই বাতাস একই জলতরঙ্গ।”
কোনো এক সাংবাদিক ভারতকে ‘বৃহৎ শক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করলে তিনি তা সংশোধন করে বলেন, “নো, নো আমাদের দুজনে মিলে শক্তি; একটা শক্তি হলে হবে না- দুজনে মিলে যা শক্তি হবে, ওইটাই আসল শক্তি। আর ওই শক্তিটা পুরো পৃথিবী যেন দেখে। আমরা মিলেমিশে একটা ক্রিকেট টিম হলে কত ভালো হবে। খেলাধুলা, হেলথ তারপরে টেকনোলজি, এডুকেশন সব মিলিয়ে আমরা একটা টিম করে...।”
সীমান্তে পুশইন সংক্রান্ত জটিল প্রশ্নের জবাবে দুই দেশের ‘শক্তিশালী গণতন্ত্রের’ দোহাই দিয়ে তিনি বলেন, “ডেমোক্রেসিতে অনেক ইশুজ থাকে। আপনার একটা বাংলাদেশের স্ট্রং ডেমোক্রেসি, আমাদেরও স্ট্রং ডেমোক্রেসি; দুই ডেমোক্রেসি মিলে গেলে একটা ওয়ার্ল্ড পাওয়ার হয়ে যায়, একটা পুরো ইকোনমিক ওয়ার্ল্ড পাওয়ার হয়ে যায়।”
হাইকমিশনারের এমন বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন, দূরভিসন্ধিমূলক ও সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধকারী আখ্যা দিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
শনিবার সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তাঁর ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। তিনি লেখেন, “তিনি ‘ভারত-বাংলাদেশের এক হয়ে যাওয়া’ বলতে কী বুঝিয়েছেন, আমাদের সরকারের উচিত হবে তাঁর কাছ থেকে তা জেনে নেওয়া। ভারত যেমন একটি স্বাধীন দেশ, বাংলাদেশও তেমনি একটি স্বাধীন দেশ। তাঁর এ বক্তব্য স্পষ্ট না হলে জনমনে অবশ্যই বিভ্রান্তি তৈরি হবে।” তিনি আরো বলেন, “যদি তিনি আক্ষরিক অর্থে এ ধরনের কিছু বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে অবশ্যই তা নিন্দনীয়। বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া দরকার।”
একই দিন দুপুরে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “যারা ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় কথা বলেন, আর যারা বাইরে কথা বলেন, তাদের ভাষা এক হলেও মনোজগতে পার্থক্য রয়েছে। এজন্য সীমান্তের ওপারে কিংবা কলকাতায় গিয়ে বাঙালির সার্টিফিকেট নিতে হবে না। আমরা নৃতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশি। আমাদের ক্ষণজন্মা পুরুষ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ একটি বিরাট অর্জন।”
তথ্যমন্ত্রী যথাযথ জবাব ও আরো হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যদি ১৪০ কোটি আর ২০ কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে চান তাহলে সার্কের ২২০ কোটি মানুষকেও ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। যারা এটা চাইবে না, আমরা এটাকে সন্দেহের চোখে দেখব। আঞ্চলিকতার জন্য সার্ক এবং আন্তর্জাতিকভাবে জাতিসংঘ—এভাবেই আমরা এগোতে চাই।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বিতর্কিত এ মন্তব্যকে ঘিরে সাধারণ জনগণ ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।
ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীরা বিষয়টিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করছেন এবং তাঁর এ বক্তব্যকে ‘অদূরদর্শী’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। নেটিজেনরা দাবি করছেন, একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক হিসেবে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে এবং অবিলম্বে এ বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানাচ্ছেন তারা।
এ ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক-ডাচেসের সহকারী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের (বিডস) নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান হোসাইন আনসারী দৈনিক এদিনকে বলেন, ত্রিবেদীর বক্তব্যটি শুনতে শ্রুতিমধুর। কিন্তু এর পেছনে সুদূরপ্রসারী ভারতীয় পরিকল্পনা রয়েছে। তার এ বক্তব্যটি বাংলাদেশের মানুষের মাঝে আশা জাগাতে পারত, যদি তারা (ভারত) পুশইনের ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনতে পারত। ফ্যাসিবাদকে রুখতে তারা বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের সাথে কাজ করত।
ড. ইমরান আনসারী বলেন, ভারত যদি আওয়ামী লীগের বিপরীতে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করত তাহলে এমন বক্তব্য দেওয়ার প্রয়োজন হতো না। তাই ত্রিবেদীর এ বক্তব্য বাংলাদেশকে ভারতের সাথে মিলিয়ে যাওয়ার বার্তা বহন করে যা অগ্রহণযোগ্য। এ বিষয়ে তাকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করা উচিত।
কূটনৈতিক মহলের মতে, একজন ঝানু রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডের ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে পা রেখেই দীনেশ ত্রিবেদীর এমন 'অপরিণামদর্শী' মন্তব্য ঢাকার সঙ্গে দিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে শুরুতেই এক বড় ধরনের অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিল। সচেতন মহল মনে করছে, এ সংকটের দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান বা ভারতীয় হাইকমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না এলে জনমনে ভারতবিরোধী ক্ষোভ আরো তীব্র রূপ নিতে পারে।
ভারতের নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সাবেক প্রেস মিনিস্টার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ঢাকায় পৌঁছে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ত্রিবেদীও প্রচলিত কূটনৈতিক ভাষার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন। দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগ এবং বাংলাদেশে প্রবেশ করেই প্রদত্ত তাঁর বক্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট– ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগকে গুরুত্ব দিতে চাইছে।
তিনি বলেন, একজন পেশাদার কূটনীতিকের তুলনায় একজন রাজনীতিকের ভাষা ও উপস্থাপনা সাধারণত ভিন্ন হয়। ত্রিবেদীর বক্তব্যে সেই রাজনৈতিক পটভূমির প্রভাব স্পষ্ট। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলোর বড় অংশই রাজনৈতিক। এমন পরিস্থিতিতে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক কূটনীতি দিয়ে সম্পর্কের সব জটিলতা মোকাবিলা করা কঠিন। সম্ভবত এ কারণেই নয়াদিল্লি এবার ঢাকায় একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিককে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত থেকে অন্তত এটুকু বোঝা যায়, ভারত বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু কূটনৈতিক নয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিতেও দেখছে।
উল্লেখ্য, শুক্রবার স্ত্রী মৃণাল ত্রিবেদীকে নিয়ে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট তিনি বলেন, ‘আমার একমাত্র অগ্রাধিকার বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের সম্পর্ক। আমরা সবাই ভাইবোন। মানুষের কল্যাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইউজিসি সদস্য ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, যখন একজন রাজনীতিবিদ কথা বলেন সেটার একটা ভাষা রয়েছে। কিন্তু যখন কেউ একজন কূটনীতিক হিসেবে কথা বলেন তখন সেটার ভাষা ও মোড়ক ভিন্ন হবে- এটাই স্বাভাবিক। সে দৃষ্টিকোণ থেকে ত্রিবেদীর বক্তব্যকে প্রশ্ন করার নানা কারণ রয়েছে। এসব বিবেচনায় ত্রিবেদীর বক্তব্য কূটনীতির ভাষা নয়।
ড. মামুন বলেন, গত ১৭ বছরে আমাদের গণতন্ত্রে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে সে বিষয়টি চিন্তা করেও যদি তিনি বলে থাকেন তাহলে এটি কিন্তু ভিন্ন কিছুর আলামত হিসেবে মনে হয়। তার বক্তব্যকে আমাদের প্রত্যাখান করা উচিত এবং সেটা অবশ্যই দৃঢ়ভাবে করা উচিত।
এদিকে দীনেশ ত্রিবেদীর দেওয়া বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ কংগ্রেস। দলটির নেতারা দাবি করেছেন, হাইকমিশনারের বক্তব্যে “অখণ্ড ভারত” ধারণার প্রতিফলন রয়েছে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।
গতকাল রবিবার গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ কংগ্রেসের মহাসচিব অ্যাডভোকেট মোঃ ইয়ারুল ইসলাম বলেন, নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশে প্রবেশের পর দুই দেশের জনগণকে একসঙ্গে উল্লেখ করে যে মন্তব্য করেছেন, তা সাধারণ কূটনৈতিক সৌজন্যের সীমা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে।
বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক; তাদের অন্য কোনো দেশের জনসংখ্যার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করার কোনো সুযোগ নেই।
এমতাবস্থায় সীমান্তে অনুপ্রবেশসহ দুই দেশের চাপানউতোরের মধ্যে দীনেশ ত্রিবেদীর মন্তব্যে তোলপাড় চলছে। কারণ এমনিতেই বালাদেশ–ভারত সম্পর্ক বহুদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









