দেশের রাজনীতিতে ‘সত্য’ এখন এক রূপক ও ধোঁয়াশাপূর্ণ চরিত্র। কখনো তাকে দেখা যায় সংসদ ভবনের করিডোরে হাঁটতে, কখনো সংবাদ সম্মেলনের মাইক্রোফোনে ধরা দিতে, আবার কখনো তা হাজির হয় সরকারি গেজেটের পাতায়। কিন্তু সমস্যা বাঁধে তখনই, যখন এই সত্যকে তথ্যের কষ্টিপাথরে যাচাই করতে যাওয়া হয়, মুহূর্তেই তা কুয়াশার মতো মিলিয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে ঘটে যাওয়া তিনটি আলোচিত ঘটনা যেন একই নাটকের তিনটি ভিন্ন দৃশ্য।
চরিত্র আলাদা, প্রেক্ষাপট আলাদা, সংলাপও আলাদা; কিন্তু ঘুরেফিরে প্রশ্ন একটাই, প্রকৃত সত্য ঠিক কোনটা? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে ‘দুষ্টু লোকেদের’ বরাতে কোটি টাকার নির্বাচনি তহবিলের গল্প, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর করা আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ‘কোটি টাকার ঘুষের প্রস্তাব’-এর বিস্ফোরক দাবি, কিংবা স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর সন্তানদের নামের সঙ্গে নতুন ইউনিয়নের নামকরণের ‘অলৌকিক’ কাকতালীয় ঘটনা, সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতিতে এক অদ্ভুত ধূসর অঞ্চল তৈরি হয়েছে।
যেখানে একদিকে রয়েছে মন্ত্রীদের গুরুতর সব মৌখিক অভিযোগ বা ব্যাখ্যা, আর অন্যদিকে রয়েছে অভিযুক্তদের জোরালো অস্বীকৃতি। কিন্তু এই দ্বন্দ্বে যা অনুপস্থিত, তা হলো- অকাট্য প্রমাণ, দৃশ্যমান তদন্ত এবং জবাবদিহিতা। যখন রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হওয়ার কথা তথ্য ও আইন, তখন অলৌকিকতা আর প্রমাণের ঘাটতির এই চাদরে ঢাকা পড়ে দিনশেষে সবচেয়ে বেশি ক্ষয় হচ্ছে সাধারণ মানুষের জনবিশ্বাসের।
৭০০ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংক, নাবিল গ্রুপ ও জামায়াত
গত ৯ জুন জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বললেন, নাবিল গ্রুপকে এলসির বিপরীতে ৭০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছিল। মালামাল বিক্রি করে সেই টাকা ইসলামি ব্যাংককে ফেরত দেওয়া হয়নি। এরপর তিনি যোগ করলেন, ‘দুষ্টু লোকেরা বলে, সেই টাকা কোনো এক দলের নির্বাচনি তহবিলে গেছে।’বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে হয়তো নতুন এক চরিত্রের সংযোজন হলো— ‘দুষ্টু লোক’। অভিযোগ তার মুখে জন্ম নেয়, কিন্তু পরিচয় আর প্রমাণের কাছে পৌঁছাতে পারে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে সরাসরি অভিযোগ করলেন না। তিনি জানালেন, দুষ্টু লোকেরা বলছে। তবে সংসদে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দের রাজনৈতিক ও সামাজিক ওজন থাকে। একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও নির্বাচনি তহবিলে অর্থ যাওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেন, তখন সেটি আর চায়ের দোকানের গল্প বা নিছক রাজনৈতিক আলাপ থাকে না। তিনি আরো বলেন, নাবিল গ্রুপের ব্যাংক দায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলেন, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হচ্ছে না কেন?
এর জবাবে ১৩ জুন নাবিল গ্রুপ দেশের এক ডজনের বেশি সংবাদপত্রে প্রায় অর্ধপৃষ্ঠা জুড়ে প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। তাদের দাবি, অভিযোগগুলো অসত্য, ভিত্তিহীন ও অতিরঞ্জিত। নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, ব্যাংকিং নথি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার রেকর্ডের সঙ্গে সংসদে দেওয়া বক্তব্যের কোনো মিল নেই। এখন প্রশ্ন হলো, সত্যটা কোথায়? নাবিল গ্রুপ কি সত্যিই ৭০০ কোটি টাকা অন্য খাতে সরিয়েছে? নির্বাচনি তহবিলে অর্থ দিয়েছে? যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের দায়িত্ব। নিশ্চয়ই নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এসে সেই কাজটি করে দেবে না। অন্যদিকে বাংলাদেশে সম্ভবত সবচেয়ে দীর্ঘজীবী বাক্যগুলোর একটি হলো— ‘তদন্ত হবে’ বা ‘তদন্ত চলছে’। কিছু তদন্ত জন্ম নেয়, বড় হয়, বুড়ো হয়; কিন্তু শেষ হয় না।
ইসলামী ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় এস আলমের পরই নাবিল গ্রুপের অবস্থান। ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার, নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানসহ নানা ছলচাতুরির মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক থেকে গ্রুপটি হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছে। পত্র-পত্রিকায় এ নিয়ে অসংখ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। নাবিল গ্রুপের নানা ধরনের জালিয়াতির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সিআইডি তদন্ত করছে। নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম যেভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য উড়িয়ে দিয়ে জোরগলায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন, তাতে কে সঠিক বা কার বক্তব্য সঠিক তা নিয়ে ধুম্রজাল তৈরি হতে পারে।
আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কোটি টাকার ঘুষের অফার
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বললেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোটি কোটি টাকা নিয়ে তার পেছনে ঘুরেছেন। ১৩ জুন দেওয়া এই বক্তব্য ছিল বিস্ফোরক। জবাবে ১৫ জুন আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘আমি তার (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) পেছনে টাকা নিয়ে ঘুরিনি, আমি কেন তার পেছনে টাকা নিয়ে ঘুরব?’ এখানেও একই দৃশ্যপট। একদিকে একজন মন্ত্রীর গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষের সরাসরি অস্বীকার। ঘটনাটি ঘটছে এমন এক প্রেক্ষাপটে, যখন ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। হাসপাতাল রক্ষায় ঘুষের প্রস্তাব দেওয়া হয়ে থাকলে সেটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। প্রশ্ন হচ্ছে— মন্ত্রী কি সেই প্রস্তাবের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করবেন? কারা গিয়েছিল? কোথায় গিয়েছিল? কখন গিয়েছিল? কোনো অডিও-ভিডিও, সাক্ষী বা নথি কি আছে? নাকি এটিও আবেগতাড়িত রাজনৈতিক বক্তব্য? যদি সত্যিই কোটি কোটি টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেটি তো ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। তাহলে মামলা কোথায়? মন্ত্রী আইনের আশ্রয় নিলেন না কেন?
প্রতিমন্ত্রীর মিরাকলের রাজনীতি
বগুড়ার নতুন চারটি ইউনিয়নের মধ্যে তিনটির নাম নিয়ে যখন বিতর্ক শুরু হলো, তখন কেউ ভাবেনি বাংলাদেশ প্রশাসনিক ইতিহাসে ‘মিরাকল থিওরি’যোগ হতে যাচ্ছে। অভিযোগ উঠল, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম তার দুই ছেলে ও পারিবারিক বাড়ির নামে ইউনিয়নের নামকরণ করেছেন। মীরবাড়ী ইউনিয়ন। সীমান্ত ইউনিয়ন। দিগন্ত ইউনিয়ন। সমস্যা হলো— প্রতিমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ির নাম মীরবাড়ী। তার দুই ছেলের নাম মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নির্বাচনী এলাকাধীন নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় সীমান্ত এবং দিগন্ত নামে দুটি নতুন ইউনিয়ন পরিষদ গঠনে সমালোচনা হয়েছে সংসদে। প্রতিমন্ত্রীর দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলের নাম মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং ছোট ছেলের নাম মীর সাকলাইন আলম দিগন্ত। গত সোমবার সংসদের বৈঠকে বিরোধীদল বলে, প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের নামে নবগঠিত দুই ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ হয়েছে। তবে প্রতিমন্ত্রী তা অস্বীকার করে দাবি করেন, অলৌকিকভাবে তার ছেলেদের নামের সঙ্গে মিলে গেছে।
প্রতিমন্ত্রীর সন্তানদের নামে ইউনিয়ন পরিষদ গঠন করা হয়েছে এই প্রশ্ন সংবাদমাধ্যমে আসার পর- গত সোমবার মাগরিবের নামাজের বিরতির আগে সম্পূরক বাজেট আলোচনায় বিষয়টি সংসদে তোলেন জামায়াতের এমপি শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের এলাকায় একটি ইউনিয়নের নাম উনার মীর বংশের নামে মীরবাড়ি নামে নামকরণ করেছেন। উনার দুই সন্তান দিগন্ত ও সীমান্ত নামে দুটো ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী নাকচ করেছেন। আমরা বাহবা দিয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী যা চান সেটাই তো মন্ত্রীদের চাওয়ার কথা। বিগত ফ্যাসিস্ট সময়ে নাম সংশোধনী করতে অনেক সময় কেটে গিয়েছিল। এখন একই সংস্কৃতি আমাদের মাঝে ফিরছে। বিরতির পর প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমকে কৈফিয়ত দেওয়ার সুযোগ দিতে চিফহুইপ নূরুল ইসলাম মনি অনুরোধ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে। এ পর্যায়ে প্রতিমন্ত্রীকে ফ্লোর দেন স্পিকার। শাহে আলম দাবি করেন তার ছেলেদের নামে নয়, স্থানীয়ভাবে প্রশাসনিক যাচাইবাছাই এবং গণশুনানি করে এলাকার নামে নবগঠিত ইউনিয়ন দুটির নামকরণ করেছেন জেলা প্রশাসক।
প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, নবগঠিত মোকামতলা ইউনিয়নে সৈয়দপুর ইউনিয়ন পরিষদ আয়তনে অনেক বড়। এই ইউনিয়ন ভেঙে সীমান্ত নামে ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে। কারণ গাবতলী এবং সোনাতলা উপজেলার ইউনিয়নটি সীমান্তবর্তী। আরেকটি ইউনিয়নের নাম ছিল দেউলী। তা গাইবান্ধা জেলার সীমান্তবর্তী। দূরবর্তী হওয়ায় নাম দেওয়া হয়েছে দিগন্ত। যদিও দেউলী ইউনিয়নের নাম পরিবর্ত নয়, ইউনিয়নটি ভেঙে দিগন্ত নামে ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে। তবে সংসদে সমালোচনার কৈফিয়তে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, অলৌকিকভাবে তার সন্তানদের নামের সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের নাম মিলে গেছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের সন্তানের নাম হচ্ছে মীর সীমান্ত, মীর দিগন্ত। আমার যদি ইচ্ছা থাকত, তাহলে জেলা প্রশাসককে বলতাম ‘নাম রাখেন মীর সীমান্ত, না হলে মীর দিগন্ত’। কিন্তু নামের আগে তো মীর নেই।
আলোচিত তিনটি ঘটনা যেন একই নাটকের তিনটি ভিন্ন দৃশ্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আকস্মিক দুর্ঘটনা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা, মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর অপ্রত্যাশিত সুস্থ হয়ে ওঠা কিংবা অবিশ্বাস্য কোনো ঘটনার ব্যাখ্যায় মিরাকলের উদাহরণ দেওয়া হয়। এখন দেখা যাচ্ছে, অলৌকিকভাবে ইউনিয়নের নামও মন্ত্রীদের সন্তানের নামের সঙ্গে মিলে যেতে পারে! রাজনীতিতে কাকতালীয় ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু তিনটি কাকতালীয় ঘটনা একসঙ্গে ঘটলে সেটি আর কাকতালীয় থাকে না, সেটি মানুষের বিবেচনাবোধের পরীক্ষায় পরিণত হয়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো— প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন সময়ে নিজের বা পরিবারের সদস্যদের নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি একাধিক প্রস্তাবও ফেরত দিয়েছেন। সেখানে একজন প্রতিমন্ত্রী যদি নিজের পরিবারের নাম প্রশাসনিক ইউনিটে বসিয়ে দেন, তাহলে সেটি শুধু নীতিগত প্রশ্ন নয়, এটি রাজনৈতিক বার্তারও প্রশ্ন।
রাজনৈতিক সচেতনমহল মনে করছেন, এ তিনটি ঘটনাকে আলাদা করে দেখলে হয়তো বিচ্ছিন্ন বিতর্ক মনে হতে পারে। কিন্তু একসঙ্গে রাখলে একটি অস্বস্তিকর প্রবণতা চোখে পড়ে। যখন অভিযোগ আসে মন্ত্রীদের মুখ থেকে, কিন্তু প্রমাণ আসে না। অভিযুক্তরা অস্বীকার করে, কিন্তু সত্য উদ্ঘাটনের প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হয় না। তদন্তের ঘোষণা থাকে, কিন্তু ফলাফল অনিশ্চিত থেকে যায়। ফলে জনগণ মাঝখানে দাঁড়িয়ে যায়। কার কথা বিশ্বাস করবে মানুষ? মন্ত্রীদের? অভিযুক্তদের? নাকি ‘দুষ্টু লোকদের’? মানুষ এখন আর শুধু বক্তব্য শুনতে চায় না; তারা জানতে চায়— প্রমাণ কোথায়, তদন্ত কোথায়, জবাবদিহি কোথায়। কারণ রাষ্ট্র অলৌকিকতায় চলে না। রাষ্ট্র চলে তথ্যে। আইন-প্রমাণ আর জবাবদিহিতে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









