দীর্ঘ ১১ বছর ধরে পরিবারের হাল ধরেছেন সুমিত্রা রানী দাস। স্বামী ৫ বছর অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় ছিলেন। এরপরই পরিবারে অন্ধকার নেমে আসে। কোনো ছেলে সন্তান না থাকায় বাধ্য হয়ে স্বামীর দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে তার। মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে অসুস্থ স্বামীর ঔষধ ও পরিবারের অন্যের জোগান দিতেন। কোনো মতে সংসার চালানোর পাশাপাশি একটি মেয়ের লেখাপড়ার খরচও ছিল এই আয়ের মধ্যে। এরপরই ২০২০ সালে স্বামী সুখেন দাস মৃত্যুবরণ করেন।
অভাবের এই সংসারটিকে আরো অন্ধকারের কালো ছায়া আঁকড়ে ধরে। পরিবারের অভাব দিন দিন বাড়তেই থাকে। স্বামীর মৃত্যুর পর মনোবল হারিয়ে ফেলেন সুমিত্রা। নিজের জায়গা জমি কিছুই না থাকা পরিবারের জীবিকার তাগিদে নিজের হাতে তুলে নেন নৌকার বৈঠা। বর্ষা হলেই নৌকা চালিয়ে রঘুনাথপুর পার থেকে সুখলাইন পারে মানুষ ও কৃষিপণ্য পারাপার করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। সুমিত্রা রানীর নিজের কোনো নৌকা নেই। অন্যের নৌকা ভাড়া নিয়ে প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নৌকা চালান তিনি। ৬ বছর ধরে নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন ৫০ বছর বয়সী এই সংগ্রামী নারী।
সরজমিনে গিয়ে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের রঘুনাথপুর খেয়াঘাটে এদিন প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় সুমিত্রা রানীর।
তিনি জানান, জীবনটাই সংগ্রামের। অভাব অনটন পিছু ছাড়ছে না। ৪টি মেয়ে নিয়ে খুবই কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। বড় মেয়েটি বিয়ে হলেও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে নিজের গলায় এসে পড়েছে। স্বামী সন্তান নিয়ে মেয়েটি সুমিত্রা রানীর বাড়িতেই থাকেন। আর ২য় মেয়েটিকে কষ্ঠ করে লেখাপড়া করাচ্ছেন। এই মেয়েটি সিলেট সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে কারিগরি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। সবদিক বিবেচনা করে এই বয়সেও নৌকা চালিয়ে জীবন রক্ষা করছেন তিনি। এখন বয়সও হয়েছে। পরিশ্রম করার জন্য শরীরে মানছে না। শরীরে বিভিন্ন ধরনের রোগে বাসা বেঁধেছে। তীব্র কোমরের ব্যথা ও শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত নিরলসভাবে যাত্রী পারাপার করেন তিনি। ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করেও নৌকা চালান তিনি। কারণ, একদিন নৌকা না চললে পরিবারের চুলায় আগুন ধরবে না।
তিনি আরো জানান, ২০২১ সালে স্থানীয় কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগীতায় সরকারি সহায়তার একটি ঘর ও থাকার জন্য মাথা গোঁজার জায়গা পান। তাই তিনি সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সুমিত্রা রানী এদিন প্রতিবেদককে জানান আমি কারও করুণা চাই না, শুধু ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেয়ে সম্মানের সাথে মেয়েদের নিয়ে বেঁচে থাকার একটুখানি নিশ্চয়তা চাই। আর পাশাপাশি সরকারি সহায়তা যদি পাই তাহলে হয়তো কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা বাহাড়া গ্রামের নিখিল রায় বলেন, একজন অসহায় নারী হয়েও সুমিত্রা যেভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নানা প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে বৈঠা হাতে পরিবারকে টিকিয়ে রেখেছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়। কিন্তু শুধু মুখের প্রশংসায় এই দরিদ্র পরিবারের অভাব মিটবে না, তাদের প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা সহায়তা।
এই বিষয়ে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, “আমরা আমাদের পক্ষ থেকে সুমিত্রা রানী দাসকে যথাসাধ্য সহায়তা করে আসছি এবং ভবিষ্যতে সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা এলে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। উনার শারীরিক অবস্থা আসলেই আশঙ্কাজনক। আমরা উনার সুচিকিৎসার জন্য জরুরি আর্থিক সহায়তা এবং উনার মেয়েদের শিক্ষা সহায়তার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আমলে নিচ্ছি। খুব দ্রুতই এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
একটি স্বাবলম্বী হওয়ার স্থায়ী মাধ্যম, সুচিকিৎসার ব্যবস্থা এবং মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের দানশীল ও বিত্তবান মানুষের একটুখানি সহমর্মিতাই পারে এই সংগ্রামী মায়ের মুখে স্থায়ী স্বস্তির হাসি ফিরিয়ে দিতে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









