টাঙ্গাইলের এক নিভৃত পল্লী থেকে উঠে এসে অন্যের বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশোনা করা সেই যুবকটিই আজ বাংলাদেশ রেলওয়ের শীর্ষ পদ—মহাপরিচালক (ডিজি)। নাম তার মো. আফজাল হোসেন। তবে রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে ঠিকাদারি পাড়ায় তিনি এখন পরিচিত এক 'ম্যানেজ মাস্টার' হিসেবে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেখ পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য শেখ রেহানার 'কালেক্টর' এবং ওবায়দুল কাদেরের 'পোষ্যপুত্র' হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে রয়েছে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্প থেকে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের ভয়াবহ অভিযোগ।
সরকার পরিবর্তন হলেও অক্ষুণ্ণ রয়েছে তার দাপট। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তন কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদল—সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মোটা অঙ্কের ঘুষ ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মধ্যস্থতায় বহালতবিয়তে আছেন নিজের পদে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ফাইল থেকে শুরু করে নতুন সরকারের নীতিপ্রণেতা—সবখানেই তার অর্থের 'রহস্যের তাবিজে' যেন রাতারাতি বদলে যায় পরিস্থিতি। এই বহুল আলোচিত প্রকৌশলীর আলাদিনের চেরাগ, দেশ-বিদেশে গড়ে তোলা সম্পদের পাহাড় এবং নৈতিক স্খলনের আদ্যোপান্ত নিয়ে ‘এদিন’-এর পাঁচ পর্বের বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। আজ থাকছে প্রথম পর্ব।
মো. আফজাল হোসেন। বেড়ে ওঠা টাঙ্গাইল সদরের চৌবাড়িয়া গ্রামে। স্থানীয় এলাসিন তারক যোগেন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে এইচএসসি এবং রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) থেকে বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। ১৯৯৪ সালের ২৫ এপ্রিল সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড হয়ে যোগদান করেন বাংলাদেশ রেলওয়েতে। ১৯৬৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর নিভৃতপল্লীতে জন্ম নেয়া এবং অন্যের বাসায় লজিং থাকা আফজাল হোসেন এখন বাংলাদেশ রেলওয়ের শীর্ষ পদ মহাপরিচালক (ডিজি)। রেল ভবন থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়, পদ্মা সেতু থেকে দুদক পর্যন্ত- তিনি বহুল আলোচিত প্রকৌশলী।
পানি উন্নয়ন বোর্ডে স্বল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করেন প্রকৌশলী আফজাল। এরপর যোগদান করেন বাংলাদেশ রেলওয়েতে। দুর্নীতির হাতেখড়ি তখন থেকেই। কালো বিড়ালের বিচরণক্ষেত্র রেলওয়েতে বিস্তৃত হয় তার অপকর্মপরিধি। ধাপে ধাপে পদ বাগিয়েছেন, তবে পদ্মা সেতুর পিডি হবার আগেই তিনি নানা ইস্যুতে সমালোচিত।
শেখ হাসিনা শাসনামলে দেশের টাকায় নির্মিত পদ্মা সেতু রেল-সংযোগ প্রকল্পের পিডি ছিলেন আফজাল। তখন থেকেই এ আফজাল হোসেন শেখ পরিবারের সদস্য ‘পাওয়ারফুল ওম্যান’ শেখ রেহানার ‘কালেক্টর‘ বনে যান। আফজাল হোসেন তার ফরিদপুরের শ্বশুরকুলের আত্মীয়, কথিত শ্যালিকাসহ পছন্দের নারী কর্মকর্তাদের পদায়ন করে তারই নিয়ন্ত্রণাধীন প্রকল্পে। এরপর থেকে আসল-নকল কাগজে পদ্মা সেতুতে বরাদ্দের কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে তা দিয়েছেন রেহানার কোষাগারে। নিজের আখের গোছানোতে মনোযোগী ছিলেন তারও আগে থেকেই।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার মেন্টর শেখ রেহানা পলায়ন করলেও গরম হাওয়া লাগেনি ম্যানেজ মাস্টার আফজালের গায়ে। হাওয়া বুঝে ছাতা ঘুরিয়ে ধরেন ড. ইউনূস সরকারের দাপিয়ে বেড়ানো দুই সমন্বয়মুখী। প্রথমে আফজালের কর্মে তেলে-বেগুনে জ্বলেছিলেন তৎকালীন রেলমন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। সে পরিস্থিতি অনুকূলে নিতে আফজালকে সহযোগিতা করেছেন চার সমন্বয়কের একজন যিনি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। রহস্যের তাবিজে কিছুদিনের মধ্যেই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যান উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। প্রথমে যত গরম হয়েছিলেন, পরে তত শীতল হন উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান।
পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পের হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। যাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ, তাদেরই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে বিভিন্ন সেক্টরে। যার জ্বলন্ত উদাহরণ ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশে উপসচিব উজ্জ্বল কুমার ঘোষের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর থেকে মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
রেলের যে কয়েকজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক ছিলেন, তার মধ্যে কনিষ্ঠ ছিলেন মো. আফজাল হোসেন। তার সিনিয়র মার্কেটিং অ্যান্ড করপোরেট প্ল্যানিং বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক পার্থ সরকার, ট্রেনিং অ্যাকাডেমির প্রধান কর্মকর্তা এসএম সলিমুল্লাহ ওরফে বাহার এবং রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) আহমেদ মাহবুব চৌধুরীদের ডিঙিয়ে ডিজি করা হয়েছে তাকে। তখনই রেলওয়েসহ মন্ত্রণালয়ে চাউর হয় ‘চড়া দামে বিক্রি’ হলো ডিজি পদটি। আর তাতে খরিদদার মো. আফজাল হোসেন। মধ্যস্থতায় ছিলেন ড. ইউনূস সরকারের আমলের প্রভাবশালী দুই সমন্বয়ক ও একজন আমলা। এরপর থেকে আর কোনো সমস্যা হয়নি এ প্রকৌশলীর।
শুধু পদ্মা নয় যমুনা রেলওয়ে সেতু ডাবল লাইনের সমান্তরাল সেতু হিসেবে ১২০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচলের সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে আধুনিকায়ন। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ-চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ব্রডগেজ লাইনটি পুরোপুরি সচল করা, রেলওয়ে লাইন উন্নয়ন (পশ্চিম ও পূর্ব অঞ্চল) ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ এবং পুনর্বাসন প্রকল্প (প্রথম পর্যায়), লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ সংগ্রহ করাসহ বহু কাজ হয়েছে টেন্ডারে। প্রায় ৫৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকার কাজের বেশিরভাগই হয়েছে এবং হচ্ছে আফজালের টেবিলে ঘোরা ফাইলের মাধ্যমে। রেলের পিয়ন থেকে মন্ত্রী পর্যন্ত জানেন, ডিজির আফজালের পিসি ৫%। এ ছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রয়েছে বেনামি যৌথ ব্যবসা।
টাঙ্গাইলের নিরেট পল্লীতে অন্যের বাসায় লজিং থেকে পড়ালেখা করা আফজাল হোসেন এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। ঝামেলা এড়াতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের নাম। গ্রামের বাড়িতে দুর্নীতির নিশানা না থাকলেও রাজধানীর বনানীতে কয়েকটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। দেশে দুর্নীতির টাকা পাচার করেছেন অস্ট্রেলিয়াতে। সেখানে কেনা বাড়িসহ রয়েছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে তার সম্পদের খোঁজে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এসব বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আফজাল হোসেনের বক্তব্যের জন্য তাঁর সরকারি মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করে এবং তাঁর দপ্তরে গিয়ে পাওয়া যায়নি। তবে রেল ভবন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, তিনি সাধারণত সাংবাদিকদের সাক্ষাৎ দেন না। তাকে ফোনে পাওয়া না যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









