চলতি বছরের মে মাসে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য সফরে গিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। প্রায় দুই মাস পর শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত শুক্রবার তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার ওই লন্ডন সফরকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, সরকারি সফরের আড়ালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের লন্ডন অবস্থানকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগের একটি চেষ্টা হয়েছিল। সাম্প্রতিক কয়েকটি সংবাদমাধ্যমেও রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থানকালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। এ সময় ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ বিশেষ করে ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে সে সময় কিছু পর্যায়ে আলোচনা হয়েছিল। যদিও এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ ধরনের যোগাযোগের বিষয়ে তাদের কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। বিষয়টি নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে দেখা হবে।
একাধিক সূত্রের দাবি, শেখ হাসিনার ঘোষিত ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছিল। সূত্রগুলো যে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিকল্পনার কথা বলছে, তার কোনো অংশই স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, একটি ধারণা ছিল, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দিলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে এবং সেই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে নানা সম্ভাবনা আলোচনা হচ্ছিল। এসব দাবি সম্পর্কে সরকার, বঙ্গভবন বা সংশ্লিষ্ট কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
এদিকে শুক্রবার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রায় একই সময় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণাও দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রায় একই সময় ঘটায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর এখন নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে। তাদের মতে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ একদিকে দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছে, অন্যদিকে দেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন প্রশ্নও সামনে এনেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নির্ভর করবে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, আইনি প্রক্রিয়া, জনমত এবং সরকারের অবস্থানের ওপর। একইভাবে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিন্যাসও আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ এবং শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে বিচ্ছিন্ন দুটি ঘটনা হিসেবে নয়, বরং একই রাজনৈতিক সময়ের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ। লন্ডন সফরকে ঘিরে যে বিভিন্ন দাবি ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে এসেছে, সেগুলোর বেশির ভাগই এখনো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই বাকি রয়েছে।
মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বহাল ছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে তার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক ইস্যু নিয়ে ধারাবাহিক বিতর্ক তৈরি হয়। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই তার পদত্যাগ দাবি করে আসছিল। অবশেষে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সেই বিতর্কের একটি আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে। একই সঙ্গে সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পথও উন্মুক্ত হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির বিদায়ের সময়টি রাজনৈতিকভাবে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি কারণে। ঠিক এমন সময়েই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে দুটি ঘটনাই এখন দেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাগুলোর সময়গত মিল নিছক কাকতালীয় হলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের নির্বাহী সরকারের প্রধান না হলেও তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। সরকার গঠন, নির্বাচন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির পদ প্রতীকী ও সাংবিধানিক—উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ আওয়ামী লীগের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ, দুই বাস্তবতাই তৈরি করেছে। একদিকে, তাঁকে ঘিরে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিতর্কের অবসান হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অন্যতম সমালোচনার একটি বিষয় আপাতত শেষ হয়েছে। একই সময় শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন করে সাংগঠনিক তৎপরতা দেখা দিতে পারে। দলটি চাইলে এই পরিস্থিতিকে সংগঠন পুনর্গঠন, সমর্থকদের আবার সক্রিয় করা এবং নতুন রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
মো. সাহাবুদ্দিন ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। তার পদত্যাগের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত সর্বশেষ উচ্চপর্যায়ের সাংবিধানিক ব্যক্তিত্বের অধ্যায়েরও অবসান ঘটেছে। নতুন রাষ্ট্রপতি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সাংবিধানিক পরিস্থিতিতে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এমন বাস্তবতায় রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগে কি শেখ হাসিনা আরো রাজনৈতিকভাবে একা হয়ে পড়লেন? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদ মূলত সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক হওয়ায় কোনো ব্যক্তির পদত্যাগকে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক নেতার শক্তি বা দুর্বলতার সূচক হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। তার মতে, শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারিত হবে মূলত জনসমর্থন, সাংগঠনিক সক্ষমতা, আইনি প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর; রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ একমাত্র নির্ধারক নয়।‘
তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে ঘিরে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আরো গুরুত্ব পাবে। রাষ্ট্রপতি সরাসরি এসব প্রক্রিয়ার অংশ না হলেও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে তার পদ দেশের সামগ্রিক সাংবিধানিক পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী অবস্থান বহন করে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণ— এই তিনটি বিষয় আগামী কয়েক মাসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তাদের মতে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ কেবল একজন রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ছাড়ার ঘটনা নয়; এটি ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ধারাবাহিকতায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই পরিবর্তনের প্রভাব আওয়ামী লীগ, বর্তমান সরকার এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ সব ক্ষেত্রেই কতটা গভীর হবে, তার উত্তর মিলবে আগামী দিনের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে। এদিকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর ভারতের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের একটি অংশ ঘটনাটিকে শেখ হাসিনার ঘোষিত দেশে ফেরার পরিকল্পনার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং রাষ্ট্রপতির বিদায় প্রায় একই সময় আলোচনায় আসায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক কিছু প্রতিবেদনে মো. সাহাবুদ্দিনকে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। দেশীয় বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা কেবল ব্যক্তি বা প্রতীকী সম্পর্ক দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকারের হাতে ন্যস্ত। ফলে রাষ্ট্রপতির পদ মর্যাদাপূর্ণ এবং সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও দৈনন্দিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা দলীয় কৌশল নির্ধারণে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা সীমিত।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার আলী আক্কাস বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির পরিবর্তন প্রতীকী ও সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও কোনো রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একমাত্র নিয়ামক নয়।‘ তার মতে, আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দু রাষ্ট্রপতির পদ নয়। বরং দলটির নিবন্ধন, সাংগঠনিক পুনর্গঠন, চলমান মামলা, মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা এবং শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা, এসব বিষয়ই আগামী দিনের রাজনীতিতে বেশি প্রভাব ফেলবে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্কের অবসান আওয়ামী লীগের জন্য কিছুটা স্বস্তিও বয়ে আনতে পারে। কারণ দলটি এখন রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে বিতর্কের পরিবর্তে সাংগঠনিক পুনর্গঠন, আইনি প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো, শেখ হাসিনা কি রাজনৈতিকভাবে আরো একা হয়ে পড়লেন? একদিকে, মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ছিলেন। সেই অর্থে তার বিদায় শেখ হাসিনার জন্য একটি প্রতীকী ক্ষতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রাষ্ট্রপতির পরিবর্তন নয়; বরং দেশে ফিরে সম্ভাব্য বিচারিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং জনমতের চ্যালেঞ্জ কিভাবে মোকাবিলা করবেন, সেটিই হবে ভবিষ্যৎ রাজনীতির প্রধান নির্ধারক। একইভাবে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ করলেও সরকারের নির্বাহী কাঠামো বা নীতিনির্ধারণে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই বলে মত দিয়েছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। এদিকে বঙ্গভবনের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শুক্রবার বিকেল ৫টা ১ মিনিটে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন।
পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, তিনি দীর্ঘদিন হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা এবং বাইপাস সার্জারির পরবর্তী শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। সম্প্রতি তার অটোনমিক নিউরোপ্যাথি রোগ শনাক্ত হয়েছে, যার কারণে তিনি মাঝেমধ্যে সাময়িক অচেতন হয়ে পড়েন। এসব শারীরিক জটিলতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা তার পক্ষে আর সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এ অবস্থায় সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা থাকলেও সরকারি ব্যাখ্যায় স্বাস্থ্যগত কারণকেই পদত্যাগের মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন সূত্রের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছিল এবং শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত সাংবিধানিকভাবে একটি শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক সমাধানের পথ তৈরি করেছে। এ বিষয়ে সরকারিভাবে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এদিকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়ায়ও স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা গেছে।
জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতারা বলেছেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ আরো আগেই হওয়া উচিত ছিল। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, বিলম্বে হলেও রাষ্ট্রপতির বিদায়ের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।
অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আরো কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাবেক রাষ্ট্রপতিকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত যাতে তিনি দেশ ত্যাগ করতে না পারেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন, রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী পরিবেশ, সবকিছু মিলিয়ে আগামী কয়েক মাস দেশের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তাদের মতে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের প্রকৃত রাজনৈতিক তাৎপর্য নির্ধারিত হবে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা কতটা গড়ে ওঠে এবং শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়- এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত এই পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ধারণ করবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









