কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলে স্থাপিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) এ কারিগরি ত্রুটির প্রভাব পড়েছে সারা দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায়। টার্মিনালটির একটি ইউনিটে সমস্যা দেখা দেওয়ায় জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।
শনিবার (২৫ জুলাই) রাত ৯ টা পর্যন্ত ত্রুটি পুরোপুরি সারানো সম্ভব হয়নি। এতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আবাসিক গ্রাহক, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।
তবে দেশের জ্বালানি সংকটের এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার রান্না করতে পারছে না। কেউ বৈদ্যুতিক চুলা, কেউ এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন। কোথাও কোথাও বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বাসিন্দাদের।
সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দেখা দিয়েছে দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করছেন চালকেরা। এতে যাত্রী পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দৈনিক আয় কমে গেছে ভাড়ায় চালানো সিএনজি অটোরিকশা ও অন্যান্য সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকদের।
শিল্পকারখানাগুলোতেও কমেছে উৎপাদন। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। কোনো কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ রাখার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মহেশখালীর উপকূলে থাকা এফএসআরইউতে ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান , মহেশখালীতে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো থাকলেও এর সুফল স্থানীয় জনগণ সবসময় সমানভাবে পান না। অথচ এখানকার কোনো একটি অবকাঠামোয় সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহাবুদ্দিন খান বলেন, মহেশখালীতে বড় বড় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্প হচ্ছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের নিরাপত্তা ও বিকল্প ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী, তা নিয়ে আমাদেরও ভাবতে হয়। একটি টার্মিনালে সমস্যা হলে যদি পুরো দেশের গ্যাস সরবরাহে প্রভাব পড়ে, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা দরকার।
আরেক বাসিন্দা আব্দুল মান্নান বলেন, এ ধরনের প্রকল্পের কারণে উপকূলীয় এলাকার মানুষ নানা ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করেন। জাতীয় অর্থনীতির জন্য এসব প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ এটা নিয়ে আপত্তি নেই। তবে দুর্ঘটনা বা কারিগরি ত্রুটির ক্ষেত্রে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা কী থাকবে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
তিতাসের অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমানে তারা প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাচ্ছেন। অথচ তিতাসের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
তিনি জানান, এফএসআরইউ নষ্ট হওয়ার আগে তিতাসকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হতো। এর মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে চলে যায়। ফলে অন্যান্য খাতের জন্য থাকে প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে প্রয়োজন কমপক্ষে ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এ কারণে এফএসআরইউ সচল হলেও ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকে যেতে পারে।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে উৎপাদন পরিকল্পনা, শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ে।
শিল্প উদ্যোক্তা কবির আহমেদ বলেন, গ্যাসের চাপ কমে গেলে কারখানা চালু রেখেও স্বাভাবিক উৎপাদন করা যায় না। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ে, উৎপাদন কমে এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে সিএনজি চালকেরা বলছেন, স্টেশনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গ্যাস না পাওয়ায় তারা যাত্রী নিয়ে রাস্তায় বের হতে পারছেন না। এতে জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের আয়-রোজগারে।
গত বুধবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশনসহ অন্যান্য গ্রাহকের ওপর পড়েছে। কোনো কোনো এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি স্টেশনগুলো প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস গ্রহণ করতে পারছে না। এতে কয়েকটি স্থানে দীর্ঘ সারি ও সাময়িক জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
এফএসআরইউয়ের কারিগরি সমস্যা দ্রুত নিরসন করে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করছেন বলে জানিয়েছে সরকার। সীমিত সরবরাহের সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জরুরি ও অগ্রাধিকার খাতে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখার কথাও বলা হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছে , এফএসআরইউতে কারিগরি ত্রুটি সাময়িক সমস্যা হলেও দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাকে এটি সামনে নিয়ে এসেছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে না পারায় আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে আমদানি অবকাঠামোর কোনো একটি অংশে সমস্যা দেখা দিলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় কমপক্ষে ১৫ দিনের গ্যাস মজুতের সক্ষমতা তৈরি করা দরকার। পাশাপাশি আরেকটি এফএসআরইউ এবং স্থলভিত্তিক এলএনজি অবকাঠামো প্রয়োজন।
তার মতে, সমুদ্রে ঝড় বা বৈরী আবহাওয়ার কারণে ভাসমান টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। তাই স্থলভিত্তিক অবকাঠামোসহ বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ দ্রুত নেওয়া প্রয়োজন।
মহেশখালীর এফএসআরইউতে কারিগরি ত্রুটির কারণে তৈরি হওয়া বর্তমান সংকট তাই শুধু সাময়িক গ্যাস ঘাটতির বিষয় নয়, এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, আমদানিনির্ভরতা এবং বিকল্প সরবরাহ অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









