রাজধানী ঢাকা ও দেশের অন্য ৬৩টি জেলার জলপ্রবাহের প্রধান ধমনী ছিল যে খালগুলো, তা এখন কেবলই মানচিত্রের পাতায় সীমাবদ্ধ। গত তিন দশকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সবচেয়ে বড় বিষয় ভূমি প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর ‘আর্থিক লেনদেন ও ম্যানেজ বাণিজ্যের’কারণে বিলীন হয়ে গেছে দেশের অধিকাংশ খাল। একসময় ঢাকার বুক চিরে জালের মতো বিছিয়ে থাকা এই জলাশয়গুলো আজ প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের আবাসন প্রকল্প, বহুতল ভবন কিংবা স্থানীয় বাজার ও রাস্তায় পরিণত হয়েছে। উ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার বুকে একসময় বয়ে চলা খালে প্রবাহিত হতো স্বচ্ছ পানি। আর নদীর সঙ্গে সংযুক্ত সেই খালগুলো ছিল ঢাকার প্রাণ। তবে দখল আর দূষণে অস্তিত্ব হারিয়েছে বেশিরভাগই। বাকিগুলো এখন মশার উপদ্রব আর পরিবেশ বিপর্যয়ের কেন্দ্র। এসব খাল বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে একসময়ের প্রবহমান জলপথগুলো আজ বিলীনপ্রায়। কল্যাণপুর ও ধোলাইখালের মতো অসংখ্য খাল কংক্রিটের ভারে চেপে সরু হয়ে এখন ড্রেনে রূপ নিয়েছে। খাল ভরাট করে তৈরি হয়েছে ভবন, রাস্তা, ব্রিজ ও ড্রেন আর এর ফল হলো ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ বিপর্যয়।
বর্তমানে ঢাকার খালের সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। জেলা প্রশাসন বলছে, ৪৭টি খাল আছে। কিন্তু রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা ৫৬, যার সবই মৃতপ্রায়। আর যা বেঁচে আছে তার পাশেই বসবাস করছেন হাজারো মানুষ। জলাবদ্ধতা দূরীকরণে খালগুলোর সাহায্য করার কথা থাকলেও নিয়মিত দূষণে ভরাট হয়েছে চারপাশ। বর্ষা এলেই দূষিত পানি উপচে ঢুকে পড়ে বাসাবাড়িতে। ময়লার কারণে তৈরি হয় মশা-মাছির আস্তানা। সব মিলেয়ে দীর্ঘদিনের দুর্দশা কাটছে না খালপারের বাসিন্দাদের। তারা বলছেন, বর্ষা হলেই রাস্তা ডুবে যায়, ঘরে পানি ঢোকে। তখন চলাফেরা বা বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে ২০২০ সালে ওয়াসার কাছ থেকে খাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয় সিটি করপোরেশন। তৎকালীন দুই সিটির মেয়রও নিয়েছিলেন মহাপরিকল্পনা। নিয়মিতই আয়োজন করা হতো খাল পরিষ্কার কর্মসূচির। তবে প্রচুর অর্থ ব্যয় হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় খালগুলো ফিরে পায়নি প্রাণ।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহম্মদ খান বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও ভূমি সংকটের কারণে খাল দখল ও ভরাটের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে বদলে যাওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে খাল নিয়ে নতুন আশার আলো দেখছেন নগরবাসী। এবার কোনো প্রকল্প নয়, খাল নিয়ে এসেছে ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’নামে নতুন কর্মসূচি। গত ২ ফেব্রুয়ারি মিরপুরের বাউনিয়া খাল সংস্কারের মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচির সূচনা হয়। ঢাকার ১৯টি খাল একসঙ্গে যুক্ত হয়ে নগরীর জলাবদ্ধতা ও পরিবেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদী বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
ঢাকাকেন্দ্রিক পরিসংখ্যান: খালের সংখ্যা নিয়ে গোলকধাঁধা, নদী ও নগর বিশেষজ্ঞদের গবেষণা এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে ঢাকার খালের সংখ্যার এক ভয়ানক চিত্র ফুটে উঠেছে। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) অনুযায়ী, বৃহত্তর ঢাকায় একসময় ২১৯টি খালের অস্তিত্ব বা ম্যাপ ছিল। তবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে ঢাকায় এখনো সচল বা ‘জীবন্ত’খালের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র ৬৫টি। এছাড়া ঢাকা জেলা প্রশাসনের তালিকায় খালের সংখ্যা ৫৮টি, যার মধ্যে অন্তত ৩৭টি খালই সরাসরি তীব্র দখলের কবলে রয়েছে। আর ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের তালিকা অনুযায়ী, শহরের ৪২টি সুনির্দিষ্ট স্থানে খালের প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ বা ‘মৃতপ্রায়’অবস্থায় পৌঁছেছে।
কাদের প্রশ্রয়ে দখল
ইউনিয়ন ও উপজেলা ভূমি অফিস: মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তারা সিএস ম্যাপ আড়াল করে আরএস বা বিএস খতিয়ানে খালের জমিকে ‘নাল’ বা চাষযোগ্য জমি দেখিয়ে ভুয়া প্রতিবেদন তৈরি করে। অনেক সময় এসি ল্যান্ড অফিস থেকে ভুয়া নামজারি বা এক বছরের জন্য ডিসিআর বা লিজ দেওয়া হয়। রেকর্ড রুম থেকে টাকার বিনিময়ে খালের মূল সিএস ম্যাপ বা নকশা গায়েব করে ফেলা হয় বা কেমিক্যাল দিয়ে খালের দাগ মুছে ফেলা হয়।
এছাড়া ইমারত পরিদর্শকরা সরেজমিনে না গিয়ে বা খালের অস্তিত্ব গোপন করে বহুতল ভবনের নকশার অনুমোদন দিয়ে দেন। তাছাড়া স্থানীয় কাউন্সিলররা সরাসরি খাল ভরাট করে বাজার তোলে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ওয়াসা: সীমানা খুঁটি বা পিলার খালের ভেতরে স্থাপন করা হয়, যাতে প্রভাবশালীদের অবৈধ স্থাপনা খালের বাইরে দেখানো যায়। আর এই সুযোগে আবাসন ব্যবসায়ীরা রাজউক ও ভূমি অফিসকে ‘ম্যানেজ’ করে তৈরি করা ভুয়া বৈধ কাগজপত্র বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে শত কোটি টাকা লোন তুলে নেয়। একবার ব্যাংক লোন ও রাজউকের সিল পড়ে গেলে খালটি আইনি মারপ্যাঁচে চিরতরে ব্যক্তিমালিকানাধীন হয়ে যায়।
ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান: খাল দখলের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা কেবল সাময়িক ভোগান্তি বাড়ায় না, এটি দেশের অর্থনীতির ওপর এক বিরাট নীরব আঘাত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি বছর এর কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। এছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে গত এক দশকে মেগা প্রকল্প, ড্রেন নির্মাণ ও খাল খননে ১৫,০০০ কোটি টাকারও বেশি খরচ করেছে ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন এবং সিডিএ। কিন্তু উৎস (খাল) দখলমুক্ত না করায় এই বিপুল পরিমাণ সরকারি তহবিল অপচয় হয়েছে। আর এতে বার্ষিক ৫,০০০ থেকে ৭,০০০ কোটি টাকা সরকারি জমি ম্যাপ থেকে ‘উধাও’ করে দেওয়ায় সরকার স্থায়ীভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এর বাইরে ঢাকার গুলশান, বাড্ডা বা মিরপুর এলাকার খালের জমি নিয়ম মেনে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে দীর্ঘমেয়াদি লিজ দিলে এককালীন কয়েক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসত। এছাড়া খালের পানি প্রবাহ ঠিক রেখে যদি হাতিরঝিলের মতো ওয়াটার ট্যাক্সি বা পর্যটন কেন্দ্র করা যেত, তবে সরকার প্রতি বছর বিশাল রাজস্ব পেত। ঢাকার বাইরে স্থানীয় প্রভাবশালীরা আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে ফ্রিতে মাছের ঘের তৈরি করায় সরকার জলমহাল ইজারার রাজস্ব হারাচ্ছে।
আইনি মারপ্যাঁচ: উচ্ছেদ অভিযানে ‘আইনি মারপ্যাঁচ’ও শীর্ষ কর্পোরেট গ্রুপজাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের তালিকায় দেশের শীর্ষস্থানীয় অন্তত ৪০টি বড় গ্রুপ কোম্পানির নাম নদী ও খাল দখলের সাথে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত এসেছে। এর মধ্যে আবাসন খাতের অবদানই প্রায় ৪৫ ভাগ থেকে ৫০ ভাগ। তদন্ত ও মামলার তালিকায় দেশের নামী-দামী বেশ কিছু আবাসন কোম্পানি।
উচ্ছেদ আটকে দেওয়া : প্রশাসন যখনই কোনো বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে যায়, কোম্পানিগুলো উচ্চ আদালত থেকে লিজের ভুয়া কাগজ বা আরএস রেকর্ডের দোহাই দিয়ে ‘স্থগিতাদেশ’নিয়ে আসে। ফলে বছরের পর বছর উচ্ছেদ অভিযান থমকে থাকে।
ঢাকার প্রধান প্রধান দখলকৃত খাল ও বর্তমান চিত্র
পরীবাগ খাল : মগবাজার থেকে শাহবাগ হয়ে প্রবাহিত হওয়া এই ঐতিহাসিক খালটি এখন শতভাগ বিলুপ্ত। এর ওপর এখন পাকা রাস্তা ও বড় বড় ভবন। এরপর রূপনগর খাল (মিরপুর) খোদ তদারকি সংস্থাই খালের জায়গা দখল করে নতুন সড়ক নির্মাণ করেছে! আবাসন প্রকল্পের কারণে এটি এখন সরু নর্দমা। এরপর প্যারিস রোড খাল (মিরপুর-১০) অবৈধ দখলদারদের কারণে এতটাই সংকুচিত হয়ে গেছে যে, এটি এখন একটি ছোট ড্রেনের রূপ নিয়েছে। ময়লায় পানি প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ।
জিয়া সরণী ও কুতুবখালী, ঢাকা দক্ষিণ সিটির এই খাল দুটি উদ্ধারে ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো সুফল মেলেনি।
বাউনিয়া বাঁধ খাল : কালশী স্টিল ব্রিজের দুই পাশই দখল করে নিয়েছে আর্টিক্যাল স্ট্রাকচার নামে একটি আবাসন কোম্পানি। সর্বোচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা স্বত্ত্বেও কোনোভাবেই তাদের গ্রাস থেকে রক্ষা পায়নি খালটি। এছাড়া কাঁটাসুর খাল (মোহাম্মদপুর) কাদেরাবাদ হাউজিং ও ঢাকা রিয়েল এস্টেট এলাকার পুরোনো কালভার্টের নিচে খাল ভরাট করে স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
ঢাকার বাইরের চিত্র : রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়ে শোরগোল হলেও ঢাকার বাইরে দেশের ৬৩টি জেলায় খাল দখলের চিত্র আরো করুণ। গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি সেচ এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী হাজার হাজার খাল এখন স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের একাংশের যোগসাজশে স্রেফ উধাও হয়ে গেছে।
অবৈধ দখলদার : জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তালিকায় দেশে নদী ও খাল দখলদারের সংখ্যা ৬৩ হাজার ছাড়িয়েছে, যার সিংহভাগই ঢাকার বাইরে। ৬০ শতাংশ খাল ভরাট হওয়ায় দেশের উত্তরাঞ্চল (রাজশাহী, নাটোর) এবং পশ্চিমাঞ্চলে (নড়াইল, রাজবাড়ী) সেচের জন্য এখন ৭৫ শতাংশ নির্ভর করতে হচ্ছে শ্যালো টিউবওয়েলের ওপর। ফলে প্রতিবছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম (চাক্তাই ও হিজড়া খাল) : চট্টগ্রামের ‘দুঃখ’নামে পরিচিত চাক্তাই খালসহ শহরের অন্তত ডজনখানেক খাল দখল করে বহুতল ভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বানানো হয়েছে।
বরিশাল (জেল খাল ও সাগরদী খাল): একসময়ের ‘খালের ভেনিস’বরিশালের ৩০টির বেশি খালের মধ্যে এখন মাত্র কয়েকটি কোনোমতে টিকে আছে। ডিসি অফিসের মাধ্যমে সিএস ম্যাপ ওলটপালট করে খালের জমি ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড করানো হয়েছে।
খুলনা (ময়ূর নদ ও সংযুক্ত খালসমূহ): খুলনার ২২টি খালের প্রায় সবকটিই প্রভাবশালী এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কবলে। খালের সীমানার ভেতর আরএস খতিয়ান তৈরি করে পাকা বাড়ি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, তহশিলদার, সার্ভেয়ার, এসি ল্যান্ড অফিসের একাংশ এবং রাজউক/পৌরসভার অসাধু প্রকৌশলীদের সম্মিলিত সিন্ডিকেট ছাড়া একটি খালও ব্যক্তিমালিকানায় যাওয়া সম্ভব নয়।
ইউনিয়ন ও উপজেলা ভূমি অফিস: মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তারা সিএস ম্যাপ আড়াল করে আরএস বা বিএস খতিয়ানে খালের জমিকে ‘নাল’ বা চাষযোগ্য জমি দেখিয়ে ভুয়া প্রতিবেদন তৈরি করে। অনেক সময় এসি ল্যান্ড অফিস থেকে ভুয়া নামজারি বা এক বছরের জন্য ডিসিআর বা লিজ দেওয়া হয়। রেকর্ড রুম থেকে টাকার বিনিময়ে খালের মূল সিএস ম্যাপ বা নকশা গায়েব করে ফেলা হয় বা কেমিক্যাল দিয়ে খালের দাগ মুছে ফেলা হয়।
এছাড়া ইমারত পরিদর্শকরা সরেজমিনে না গিয়ে বা খালের অস্তিত্ব গোপন করে বহুতল ভবনের নকশার অনুমোদন দিয়ে দেন। তাছাড়া স্থানীয় কাউন্সিলররা সরাসরি খাল ভরাট করে বাজার তোলে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









