রাজধানীর বাজারে লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের চাপে পিষ্ট হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা। সাধ্যের বাইরে চলে গেছে দৈনন্দিন খাদ্যের চাহিদা মেটানো। কেজিতে ২০০ টাকার নিচে মিলছে না পাঙাশ, তেলাপিয়া কিংবা ব্রয়লার মুরগি। প্রতি ডজন ডিম কিনতে গুণতে হচ্ছে প্রায় ১৬০ টাকা, আর গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৮০০ টাকার কাছাকাছি। তবে, বিদেশ থেকে কাঁচামরিচ আমদানি হওয়ায় সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে কাঁচামরিচের দাম কেজিতে ১৫০ টাকা কমেছে। ২৪০ থেকে ২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে কাঁচামরিচ। একইসঙ্গে দু-একটি সবজি ছাড়া ৮০ থেকে ১০০ টাকার নিচে মিলছে না অধিকাংশ সবজি।
বাজারের এই লাগাতার ঊর্ধ্বগতিতে দৈনন্দিন কাটছাঁট করেও সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। চরম এই অস্বস্তি থেকে স্বস্তি পেতে বাজার তদারকি ও কার্যকর পদক্ষেপে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত সপ্তাহের তুলনায় ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম বেড়েছে। তবে স্থিতিশীল রয়েছে শুধুমাত্র গরুর মাংসের দাম। মাছের দামও ২০ থেকে ৩০ টাকা প্রতি কেজিতে বেড়েছে। প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায়, আর ডিম ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা ডজন। ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে সোনালি, হাইব্রিড ও লেয়ার মুরগির দামে পরিবর্তন নেই। সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা, সোনালি হাইব্রিড ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা, লাল লেয়ার ৩৫০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৭৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা এবং ১ কেজি ওজনের ইলিশ ৩ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পুকুরে চাষ করা মাছ পাঙাশ, তেলাপিয়া, রুই, কাতলা, মৃগেল, পোয়ায় কেজি প্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। প্রতি কেজি জীবিত পাঙাশ ২৩০ টাকা, তেলাপিয়া ২৬০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। মানভেদে চিংড়ির কেজি ৮০০ থেকে ৯০০ টাক, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, বড় আকারের রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা ও ট্যাংরা ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে চাষের শিং মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে। মাঝারি আকারের রুই কেনা যাচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা দরে। এ ছাড়া, রূপচাঁদা, শোল ও নদীর বেলে মাছ কিনতে গেলে হাজারের বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে।
মোহাম্মদপুর টাউনহল বাজারের মুরগি বিক্রেতা রাব্বি মিয়া বলেন, ‘বাজারে মুরগির চাহিদা অনুসারে সরবরাহ নেই। গত সপ্তাহের তুলনায় ১০ থেকে ২০ টাকা কেজিতে বেড়েছে। সোনালি মুরগির দাম স্থিতিশীল রয়েছে। বাজারে সরবরাহ ভালো থাকায় দামে তেমন ওঠানামা নেই। প্রতি কেজি ২০০ টাকায় ব্রয়লার এবং ৩৩০ টাকায় সোনালি মুরগি বিক্রি করছি।’ বাজারটির মাছ বিক্রেতা ইমদাদ হোসেন বলেন, ‘মাছের দাম আগের মতোই। কিছু মাছের দাম সব সময় বেশি থাকে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছ বিক্রি হচ্ছে। সেগুলোর দাম সব সময় বেশি। তবে পুকুরে চাষের মাছের দামও দিন দিন বাড়ছে। আমাদের বেশি দামে কিনতে হয়, এ জন্য বিক্রিও বেশি দামে করতে হয়। মাছের দাম বাড়ার কারণে আমাদের পুঁজিও বেশি লাগছে।’
এদিকে গত সপ্তাহের তুলনায় ডিমের দাম ডজনে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। ফার্মের মুরগির লাল ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ টাকা থেকে ১৬০ টাকায়। হাঁসের ডিম এক ডজন ২০০ টাকা, দেশি মুরগির ডিমের হালি ১০০ টাকা এবং সোনালি কক মুরগির ডিমের হালি ৭০ টাকা দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। প্রতি কেজি গরুর মাংস কেজি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খাসির মাংস কিনতে গেলে কেজিতে খরচ করতে হবে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা।
কেনাকাটা করতে আসা রাকিব হোসেন বলেন, ‘ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়লে তার প্রভাব নিম্ন আয়ের মানুষের উপরে সরাসরি পড়ে। আমরা তো দেশি মুরগি বা পাকিস্তানি সোনালি মুরগি কিনে খেতে পারবো না। ব্রয়লার, পাঙাশ ও তেলাপিয়া আমাদের ভরসা। সেখানে দাম বাড়লে পকেটে টান পড়ে।’
শেওড়াপাড়া ও তালতলা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মানভেদে ২৫০ গ্রাম কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়, যা কেজিতে ২৪০ থেকে ২৮০ টাকা। গত সপ্তাহেও কাঁচামরিচ ৪০০ থেকে ৪৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল। অন্যান্য সবজিও ৮০ থেকে ১০০ টাকার নিচে কিনতে পারছেন না ক্রেতারা। এসব বাজারে বেগুন প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১৮০ টাকা, টমেটো ১৪০ থেকে ২০০ টাকা এবং করলা ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পটল, ঢেঁড়শ, কাকরোল ও ঝিঙা মানভেদে কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পেঁপে ৪০ টাকা এবং আলু ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে পাঁচ টাকা কমে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া, কচুর লতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কচুরমুখি ৮০ টাকা, শসা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বটবটি ১০০ টাকা, গাজর ১৪০ টাকা ও মিষ্টি কুমড়া ৬০ টাকা কেজি হাঁকাচ্ছেন বিক্রেতারা। অন্যদিকে, এক হালি লেবু ১৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি ধনেপাতা ৩০০ টাকা এবং হাইব্রিড ধনেপাতা ২৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা কলা হালি ৪০ টাকা, চালকুমড়া ৬০ থেকে ৮০ টাকা পিস এবং ক্যাপসিকাম ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। লালশাক আঁটি ২০ টাকা, লাউশাক আঁটি ৫০ টাকা, কলমিশাক দুই আঁটি ২০ টাকা, পুঁইশাক ৪০ টাকা এবং ডাঁটাশাক দুই আঁটি ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
তালতলা বাজারের সবজি বিক্রেতা ইউনুস মিয়া বলেন, বৃষ্টির কারণে ফসলের ক্ষতি হওয়ায় কাঁচামরিচসহ সব সবজির দাম বেড়েছে। তবে কাঁচামরিচ আমদানি হওয়ায় দাম কমতে শুরু করেছে। আগামী সপ্তাহে দাম আরও কমে আসবে।
বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী কবির হোসেন বলেন, বাজারে এসে হিসাব মেলানো যাচ্ছে না। ৮০ থেকে ১০০ টাকার নিচে সবজি নেই। কোনো পণ্যের দাম বাড়লে আর কমছে না। আরেকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা মাহবুব আলম বলেন, ‘আগে সপ্তাহে দুই-তিন ডজন ডিম কিনতাম। এখন এক ডজন কিনতেও ভাবতে হয়। বাজারে সবকিছুর দাম বেড়েছে। তাই সংসারের বাজেট ঠিক রাখতে ডিম কেনাও কমিয়ে দিয়েছি।’ গৃহিণী নাদিয়া স্বপ্না বলেন, ‘মাছ-মাংসের দাম বেশি, তাই ডিম দিয়ে অনেক সময় রান্না করা হতো। কিন্তু এখন ডিমের দামও এত বেড়েছে যে সেটাও নিয়মিত করা যাচ্ছে না। বাচ্চাদের কথা ভেবেই কষ্ট করে কিনতে হচ্ছে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









