বৈদেশিক বাণিজ্যে বিশাল ঘাটতি নিয়ে শেষ হয়েছে ২০২৫-২৬ অর্থবছর; আগের অর্থবছরের চেয়ে যা বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। অঙ্কের হিসাবে এর পরিমাণ ২ হাজার ৭২৮ কোটি (২৭.২৮ বিলিয়ন) ডলার, যা দেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি। ‘ট্রাম্প শুল্ক’সহ নানা প্রতিবন্ধকতায় রপ্তানি আয় কমার বিপরীতে বছরের শেষদিকে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ঘাটতির পরিমাণ এতটা বেড়েছে।
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ইতিহাসে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি ৩৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। এর আগের ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৭ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। আগের দুই অর্থবছরের নিম্নমুখী বাণিজ্য ঘাটতির বিপরীতে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বিপুল পরিমাণে বেড়েছে।
অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ৭১৬ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে; যা গত বছরের জুনের চেয়ে ৭৪ দশমিক ২৩ শতাংশ বেশি। শেষ মাসে বিপুল এ আমদানি ব্যয়ের বিপরীতে রপ্তানি আয় এসেছে ৪২০ কোটি ২৭ লাখ ডলার। এতে বছর শেষে ঘাটতি আরো বেড়ে যায়। কোভিড মহামারীর পরে ডলার সংকটের কারণে আমদানি ব্যয় বাড়তে থাকলে সাশ্রয়ের পথে হাঁটে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার। এতে আমদানি ব্যয় বেশ কমে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি অনেকটা কমে শেষ হয়েছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছর; ঘাটতি দাঁড়িয়েছিল ২০.৪৫ বিলিয়ন ডলার।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও একই পথ অনুসরণ করে। এতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বাণিজ্য ঘাটতিতে নিম্মমুখী প্রবণতাই দেখা যায়। ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২২.৪৩ বিলিয়ন ডলার। রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক গত অর্থবছরের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট-বিওপি) হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতি আরও বেড়ে হয়েছে ২৭.২৮ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭১.১৪ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন পণ্য আমদানি করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৬৪.৩৬ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে এ সময়ে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে ৪৩.৮৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছেন রপ্তানিকারকরা, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে দশমিক ২ শতাংশ কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ৪৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার।
লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি ১.৬ বিলিয়ন ডলার: বাণিজ্য ঘাটতির পাশাপাশি বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ঘাটতি বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এ সূচকে ১৫৯ কোটি ৪০ লাখ (১.৬০ বিলিয়ন) ডলারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যা ছিল মাত্র ১৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ঘাটতি ছিল ৪৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। অথচ প্রথম দুই মাসে অর্থাৎ জুলাই-আগস্ট সময়ে এই সূচকে ৪৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে উদ্বৃত্ত ছিল ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত ৮ বিলিয়ন ডলার: ব্যালান্স অব পেমেন্টে ঘাটতি থাকলেও আর্থিক হিসাবে (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের বড় উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। ৩ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত নিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হয়েছিল। ঘাটতি দিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছর শুরু হলেও প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ১.৬৬ বিলিয়ন ডলার। ডিসেম্বর শেষে অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথমার্ধে এই উদ্বৃত্ত বেড়ে ২ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। নয় মাস শেষে (জুলাই-মার্চ) উদ্বৃত্ত ছিল ৩ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার।
সামগ্রিক লেনদেনে উদ্বৃত্ত ৬.৬০ বিলিয়ন ডলার-
সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে (ওভারঅল ব্যালান্স) ৩.৩৯ বিলিয়ন ডলারের বড় উদ্বৃত্ত নিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হয়েছিল। আর ৪.৩০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল ঘাটতি নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছর।
এফডিআই কমেছে ১৫ শতাংশ: গত অর্থবছরে ১.৪৬ বিলিয়ন ডলারের নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) পেয়েছে বাংলাদেশ, যা আগের বছরের চেয়ে ১৫ শতাংশ কম। ২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









