অনাদি কাল থেকে বছরে ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে বিশেষ করে জলবায়ু পরির্বতনের কারণে এখন আর দেশের মানুষ বছরে ছয় ঋতুর অস্তিত্ব অনুভব করে না। তারপরও নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষ বর্ষা, বন্যা ও নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার সঙ্গে বহুদিন ধরেই পরিচিত।
প্রতিবছর বর্ষা আসে, নদী ফুলে-ফেঁপে ওঠে, কোথাও কোথাও বন্যা হয়, আবার কোথাও কোথাও নদীর ভাঙ্গনে নদী উপকূলের মানুষ ভিটে-মাটি হারিয়ে আশ্রয়হীন হয়ে অন্যত্র আশ্রয় গ্রহণ করে- এ যেন আমাদের জীবনের এবং ভূগোলেরই অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের অভিজ্ঞতা বলছে, বর্ষার সেই চির চেনা চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এবার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে কয়েক দিনের টানা অতিভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যা যেমন নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে, তেমনি একই সময়ে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উজানের পানিতে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এবং স্বল্প ব্যবধানে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো দুই বৃহৎ নগরীর ভয়াবহ জলাবদ্ধতা আমাদের সামনে এক নতুন বাস্তবতা, নতুন চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে। এটি কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার এবং দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি জুলাই মাসে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ১৯৫৩ সালের পর সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণে এটি দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আট দিনের বৃষ্টিপাত। তবে উদ্বেগের বিষয় শুধু বৃষ্টির পরিমাণ নয়; বরং খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে একযোগে অতিভারী বর্ষণের ঘটনা। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় মাত্র এক সপ্তাহে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা অতীতের অনেক রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে। ফলে পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, কৃষিজমি ও বসতবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি সব মিলিয়ে মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণ বেড়েছে।
একই সময়ে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় আমরা এখনও প্রকৃতির পরিবর্তিত আচরণকে গুরুত্ব দিতে পারিনি। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই প্রধান সড়ক ডুবে যায়, যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কার্যত অচল হয়ে যায়। এটি শুধু অতিবৃষ্টির ফল নয়; বরং অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল হয়ে যাওয়া খাল, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার সম্মিলিত ফল।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, বাংলাদেশের বন্যার চরিত্র বদলে যাচ্ছে। একসময় প্রধানত নদীর পানি বৃদ্ধি এবং উজানের ঢলই ছিল উদ্বেগের বিষয়। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা এবং নগর বন্যা। অর্থাৎ একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। ফলে প্রচলিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কাঠামো বা সাজানো কর্মপরিকল্পনা দিয়ে নতুন বাস্তবতা, নিত্য নতুন জলবায়ু পরির্বতনজনিত সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব। কাজেই এখন সময়ের দাবি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় জলবায়ু পরির্বতনজনিত বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা জরুরি। শুধু তাই নয় সরকারের সামগ্রীক উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলবায়ু পরির্বতনের বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে প্রণয়ন করতে হবে উন্নয়নের রোডম্যাপ।
জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও এখন আর কেবল গবেষণার বিষয় নয়; বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হয়ে হঠাৎ কয়েক দিনের মধ্যে অতিভারী বর্ষণ, মৌসুমি বায়ুর আগমনে বিলম্ব, নিম্নচাপের গতিপথের পরিবর্তন এবং সমুদ্র থেকে অতিরিক্ত আর্দ্রতা প্রবেশ এসব ঘটনাই এখন ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। ফলে মৌসুমজুড়ে মোট বৃষ্টিপাত খুব বেশি না বাড়লেও স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির ঘটনা ও তার তীব্রতা বাড়ছে। এই পরিবর্তন কৃষি, নগর জীবন, অবকাঠামো এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
এ পর্যায়ে প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করতে পেরেছি? বাস্তবতা বলছে, উত্তরটি সন্তোষজনক নয়। প্রতিবছর বন্যা, জলাবদ্ধতা কিংবা পাহাড়ধসের পর একই ধরনের আলোচনা হয়, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রকাশিত হয়, বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী মৌসুমে আবারও একই চিত্র ফিরে আসে। এতে বোঝা যায়, দুর্যোগ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বা প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার নিরিখে কাজ হচ্ছে না।
তাই এখন সময় এসেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাবার। শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া যথেষ্ট নয়; সেই পূর্বাভাসের ভিত্তিতে স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। নগরাঞ্চলের জন্য আলাদা বন্যা ও জলাবদ্ধতার পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকার জন্য ঝুঁকিভিত্তিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করতে হবে।
একই সঙ্গে নদী, খাল ও জলাভূমি পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নগর উন্নয়নের নামে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দিয়ে, কিংবা বাড়ি, স্থাপনা, রাস্তাঘাট নির্মাণের প্রয়োজনে শহরের পুকুর, মুক্তজলাশয়, জলাধার ভরাট করে কোনো শহরকে নিরাপদ রাখা সম্ভব নয়। আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিয়মিত খাল খনন, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ ছাড়া জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে না। একইভাবে পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি স্থাপন বন্ধ না হলে ভূমিধসের ঝুঁকিও কমবে না।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। তাই পরিবর্তিত বর্ষার বাস্তবতাকে সামনে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি জাতীয় প্রয়োজন। অবকাঠামো নির্মাণ, নগর পরিকল্পনা, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির প্রতিটি পর্যায়ে জলবায়ু অভিযোজনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। গবেষণা, প্রযুক্তি এবং স্থানীয় অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিমালা গড়ে তোলাও জরুরি।
তাই প্রত্যাশা থাকবে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে নয় বরং প্রকৃতির পরিবর্তিত আচরণ বুঝে তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই টেকসই উন্নয়নের পথ। এবারের অস্বাভাবিক বর্ষা আমাদের সেই সতর্কবার্তাই দিয়েছে। এখন যদি আমরা শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হই, তবে আগামী দিনের দুর্যোগ আরো ভয়াবহ হয়ে ফিরে আসবে। তাই সময় থাকতে প্রস্তুতি নেওয়া, সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
লেখক: সম্পাদক, ক্লাইমেট জার্নাল২৪.কম এবং সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









