যে রাজনীতিতে যুক্তির চেয়ে গালাগালির শব্দ বেশি জোরালো, সেখানে গণতন্ত্রের কণ্ঠ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসে। যে রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার চেয়ে অপমান করাই সাফল্যের মাপকাঠি, সেখানে রাজনীতি মানুষের আস্থা হারায়। আর যে রাজনৈতিক ভাষা মানবিকতা, শালীনতা ও বিবেককে আহত করে, সে রাজনীতি জাতিকে উন্নত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে পারে না।
তাই, প্রশ্নটি শুধু কে ক্ষমতায় আছে বা ভবিষ্যতে কে ক্ষমতায় যাবে- তা নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চাই? রাজনীতি মানুষের জন্য। রাষ্ট্র পরিচালনা, জনকল্যাণ, ন্যায়বিচার, নাগরিক অধিকার ও উন্নয়নের পথ নির্ধারণই এর মূল উদ্দেশ্য। গণতন্ত্রে মতপার্থক্য থাকবে, সরকারের সমালোচনা হবে, বিরোধী দল বিকল্প নীতি ও কর্মসূচি দেবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মতপার্থক্য যখন যুক্তির বদলে গালাগালি, সমালোচনার বদলে ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং প্রতিযোগিতার বদলে বিদ্বেষে পরিণত হয়, তখন রাজনীতি তার নৈতিক শক্তি হারায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষায় সমৃদ্ধ। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা চব্বিশের গণআন্দোলন- প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে মানুষের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে ছিল অধিকার, মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র। মানুষ কেবল ক্ষমতার পালাবদল চায়নি; চেয়েছে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক মানবিক রাষ্ট্র।
তাহলে সেই রাজনীতির ভাষা কেন ক্রমেই অসহিষ্ণু হবে? প্রতিপক্ষকে গালাগালি করা সহজ; যুক্তি দিয়ে তার বক্তব্য খণ্ডন করা কঠিন। ব্যক্তিগত আক্রমণ করা সহজ; নিজের নীতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা কঠিন। অপমান করা সহজ; মানুষের আস্থা অর্জন করা কঠিন। তাই বক্তব্যে যুক্তির ঘাটতি দেখা দিলে অনেক সময় আক্রমণাত্মক ভাষা সেই শূন্যতা ঢাকার হাতিয়ার হয়। কিন্তু শব্দের তীব্রতা কখনো যুক্তির শক্তির বিকল্প নয়।
কোনো সিদ্ধান্ত ভুল হলে তার সমালোচনা হবে। কোনো নীতি জনস্বার্থবিরোধী হলে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তা প্রমাণ করতে হবে। কোনো সরকারের ব্যর্থতা থাকলে বিরোধী দলকে বলতে হবে- তারা কী বিকল্প দেবে। এটাই গণতান্ত্রিক রাজনীতি। কিন্তু নীতির সমালোচনা করতে গিয়ে ব্যক্তিকে অপমান করা, পরিবার বা ব্যক্তিগত জীবনকে টেনে আনা কিংবা অশালীন ভাষায় প্রতিপক্ষকে হেয় করা সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ নয়।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বিপজ্জনক ধারণা জায়গা করে নিয়েছে। সেটা হলো যে নেতা প্রতিপক্ষকে যত বেশি আক্রমণ করতে পারেন, তিনি তত বেশি শক্তিশালী। এই ধারণা বদলাতে হবে। প্রকৃত রাজনৈতিক শক্তি কণ্ঠের উচ্চতায় নয়, বক্তব্যের গভীরতায়; প্রতিপক্ষকে কতটা আঘাত করা যায়, তাতে নয়, জনগণের সমস্যার কতটা কার্যকর সমাধান দেওয়া যায়, তাতে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভাষা সমাজেও প্রভাব ফেলে। নেতারা যে ভাষায় কথা বলেন, কর্মীরা তা অনুসরণ করেন; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই ভাষাকে আরো দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। ফলে রাজনৈতিক অশালীনতা একসময় সামাজিক অশালীনতার অংশ হয়ে উঠতে পারে। তাতে সামাজিক বিসৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে। তারা যদি দেখে- ভিন্নমত মানেই শত্রুতা, বিরোধিতা মানেই অপমান এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মানেই ঘৃণার মানুষ- তাহলে গণতন্ত্রের সহনশীলতা ও পরমতসহিষ্ণুতার শিক্ষা তারা কোথা থেকে পাবে? গণতন্ত্রের মৌলিক শিক্ষা হলো: আমি আপনার সঙ্গে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু আপনার ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারকে সম্মান করি।
অথচ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বড় দুর্বলতা হলো, প্রতিপক্ষকে প্রায়ই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অস্তিত্বের শত্রু হিসেবে দেখা। এটি শুধু অসুস্থ প্রবণতা নয়; গণতন্ত্রের জন্যও বিপজ্জনক। আজ যে দল সরকারে, আগামী দিনে তারা বিরোধী দলে যেতে পারে; আজ যে দল বিরোধী দলে, ভবিষ্যতে তারাই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে। ক্ষমতার এই পরিবর্তনশীলতাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তাই প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সবার জন্য অনিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে।
রাজনীতিতে তীব্র প্রতিযোগিতা অবশ্যই থাকবে। তবে প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত নীতি ও কর্মসূচি নিয়ে- কে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, কে অর্থনীতি শক্তিশালী করতে পারে, কে দুর্নীতি কমাতে পারে, কে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি করতে পারে, কে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আরো কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে পারে। প্রতিযোগিতা যদি হয় জনগণের জীবনমান উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়ে, সেটি জাতির জন্য আশীর্বাদ। কিন্তু প্রতিযোগিতা যদি নেমে আসে কে কাকে বেশি অপমান করতে পারে, তাহলে জনগণের প্রকৃত সমস্যাগুলো রাজনীতির আড়ালে পড়ে যায়।
টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু রাস্তা, সেতু বা বড় অবকাঠামো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আইনের শাসন, সুশাসন, দক্ষ প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং নাগরিকের আস্থা। জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে ন্যূনতম ঐকমত্য ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে এগোতে পারে না। গালাগালির রাজনীতি সেই ঐকমত্যের পরিবেশই নষ্ট করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়িয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে মিথ্যা তথ্য, কুৎসা, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিদ্বেষ ছড়ানোর পথও খুলেছে। আইন দিয়ে এর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব; কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আইন করে হয় না। প্রয়োজন নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ববোধ, সুস্থ্য ধারার গণতিান্ত্রিক নীতিবোধ।
দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে- নীতির কঠোর সমালোচনা করা যাবে, কারো ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা যাবে না; রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া যাবে, মিথ্যা তথ্য ও বিদ্বেষ ছড়ানো যাবে না। এমন দলীয় সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অশালীন বক্তব্য জনপ্রিয়তার সিঁড়ি নয়, রাজনৈতিক অযোগ্যতার লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
একইভাবে সংসদ ও গণমাধ্যমকে যুক্তিনির্ভর বিতর্কের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে শক্তিশালী করতে হবে। সরকার ও বিরোধী দল তীব্র বিতর্ক করবে- এটাই গণতন্ত্র। কিন্তু সেই বিতর্কের ভিত্তি হতে হবে তথ্য, যুক্তি ও জনস্বার্থ। জনগণ শুধু উত্তেজক বক্তব্য শুনতে চায় না; তারা জানতে চায়- দেশের সমস্যার সমাধান কী? রাজনৈতিক নেতৃত্বের আরেকটি বড় গুণ হওয়া উচিত ভুল স্বীকার করার সাহস। ভুল স্বীকার দুর্বলতা নয়; এটি পরিণত নেতৃত্বের পরিচয়। একইভাবে বিরোধী দলের কাজ শুধু সরকারের সমালোচনা নয়; ভালো উদ্যোগকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে কার্যকর বিকল্প উপস্থাপন করা। প্রতিপক্ষের ভালো কাজ স্বীকার করা পরাজয় নয়; রাজনৈতিক উদারতার পরিচয়।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন জনগণের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। এই প্রত্যাশা শুধু সরকার পরিবর্তনের নয়; রাজনৈতিক আচরণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিবর্তনেরও। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে তাই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে- পুরনো বিভাজন ও প্রতিহিংসার রাজনীতিকে দীর্ঘায়িত করা, অথবা একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করা।
প্রশ্ন হলো, তারা কোন পথ বেছে নেবেন?
জাতীয় রাজনীতিবিদদের নিজেদের কাছেই প্রশ্নটি রাখা উচিত- আমরা কি শুধু পরবর্তী নির্বাচনে জিততে চাই, নাকি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি রেখে যেতে চাই?
যদি দ্বিতীয় লক্ষ্যটি সত্যিই আমাদের অঙ্গীকার হয়, তাহলে পরিবর্তন শুরু করতে হবে রাজনৈতিক ভাষা থেকেই। ইতিহাস কোনো নেতাকে স্মরণ করে না তিনি প্রতিপক্ষকে কতটা গালি দিতে পেরেছিলেন বলে। ইতিহাস নেতৃত্বের মূল্যায়ন করে তার চিন্তা, নীতি, সাহস, মানবিকতা, দূরদৃষ্টি ও রাষ্ট্রের প্রতি অবদানের ভিত্তিতে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাই এখন প্রয়োজন একটি নৈতিক পুনর্বিবেচনা। রাজনীতি কেবল ক্ষমতা অর্জনের কৌশল নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার দায়িত্ব। একজন রাজনীতিকের প্রতিটি শব্দ একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক মননকে প্রভাবিত করতে পারে। রাজনৈতিক ভাষায় দায়িত্বশীলতা তাই নিছক সৌজন্যের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রগঠনের শর্ত।
আমরা এমন রাজনীতি চাই, যেখানে কঠিন সমালোচনা থাকবে, কিন্তু অশালীনতা থাকবে না; তীব্র প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না; মতের সংঘাত থাকবে, কিন্তু মানবিকতার পতন হবে না। আমরা এমন নেতৃত্ব চাই, যারা জনগণকে উত্তেজিত করার চেয়ে সচেতন করবেন, বিভক্ত করার চেয়ে ঐক্যবদ্ধ করবেন এবং প্রতিপক্ষকে অপমান করার চেয়ে নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে আস্থা অর্জন করবেন, বিরোধী ও ক্ষমতাসীন নেতৃত্ব পরস্পরকে শ্রদ্ধার চোখে দেখবেন, শালীনভাবে গণতান্ত্রিক রাজনীতির কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। গণতন্ত্র শুধু ব্যালটের বিষয় নয়; এটি আচরণেরও বিষয়। নির্বাচন গণতন্ত্রের কাঠামো তৈরি করে, কিন্তু সহনশীলতা, শালীনতা, মানবিকতা, যুক্তিবোধ ও জবাবদিহিতা তাকে প্রাণ দেয়।
গালাগালির রাজনীতি মুহূর্তের উত্তেজনা ও হাততালি আনতে পারে; কিন্তু জাতি গঠন করতে পারে না। বিদ্বেষ রাজনৈতিক সমাবেশ উত্তপ্ত করতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না। ব্যক্তিগত আক্রমণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাময়িক জনপ্রিয়তা দিতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি জনআস্থা অর্জন করতে পারে না।
রাজনীতির শেষ কথা ক্ষমতা নয়- মানুষ।
আর মানুষের জন্য রাজনীতি করতে হলে গালাগালির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে ফিরতে হবে যুক্তি, বিবেক, শালীনতা, সহনশীলতা ও মানবিকতার রাজনীতিতে। এই পথই পারে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং বাংলাদেশকে শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়- নৈতিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিকভাবেও একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে।
লেখক: অধ্যাপক, কবি ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









