দেশে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের মধ্যেই কৃষিমুখী অর্থনীতিতে নেমে এসেছে নতুন বিপর্যয়। একদিকে জ্বালানি সংকটে যেখানে সেচ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় কৃষকের ঘুম হারাম, সেখানে আরেক দিকে কৃষি উপকরণের অন্যতম প্রধান উপাদান সারে দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। কেননা, দীর্ঘদিন ধরেই সার বিক্রিতে সিন্ডিকেট বানিয়ে নৈরাজ্য চলছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ডিলাররা সার বরাদ্দের আগেই বরাদ্দপত্র বিক্রি করে দেন কালোবাজারিদের কাছে। কেউ আবার এক জেলার সার আরেক জেলায়, এক উপজেলার সার আরেক উপজেলায় চালান করে দিচ্ছেন। বিপাকে পড়েছেন দেশের লাখো কৃষক।
তাদের অভিযোগ, পুরোটাই চলছে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন লাখো কৃষক। পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে মনিটরিং ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের অভিযোগ, তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত কৃষি কর্মকর্তা, ডিলার ও অবৈধ সার বিক্রেতাদের সিন্ডিকেট সার বিতরণ, বিক্রি ও ইচ্ছামতো দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে সারের ৫০ কেজির বস্তা কিনতে স্থানভেদে কৃষককে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে হাজার টাকা। অথচ মাসে মাসে জেলা-উপজেলার সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির বৈঠকে দেখানো হচ্ছে সারের কোনো সংকট নেই, দামও বাড়েনি। কিন্তু মাঠের চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন।
ভুক্তভোগী কৃষকরা বলছেন, সিন্ডিকেট খুবই শক্তিশালী। ভেতরে ভেতরে চলে টাকার খেলা। অসাধু ডিলারদের সঙ্গে কৃষি কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি লাখো কৃষক। সিন্ডিকেট ভাঙতে এগিয়ে আসেননি জেলা মনিটরিং কমিটির কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী কৃষক জানিয়েছেন, সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রক হচ্ছেন তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা। অসাধু ডিলারদের সঙ্গে তাদের গাঁটছড়া খুবই শক্তিশালী। আর মাঠ পর্যায়ের শত শত অবৈধ খুচরা সার বিক্রেতাও এই সিন্ডিকেটে জড়িত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনিতেই জ্বালানি সংকটের কারণে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ওপর যদি সময়মতো সার না পাওয়া যায়, তবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। বিশেষ করে ধান এবং শাকসবজির ফলন ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এমনিতেই কৃষিকে কোণঠাসা করে ফেলেছে, তার ওপর সারের এই সিন্ডিকেটে কৃষকের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে। সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে আগামী মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে মত তাদের।
তবে দেশে সারের কোনো সংকট নেই বলে দাবি করেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এটিকে ষড়যন্ত্র মনে হয়। সার নেই অভিযোগ আসছে, ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রশাসন যাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে বিতরণ করার পরও অতিরিক্ত থাকছে। তখন আর ক্রেতা নেই। কোনো কোনো জেলায় আগের বছরের তুলনায় আমরা বেশি বরাদ্দ দিয়েছি। এর পরও অভিযোগ আসছে সার নেই। প্রশাসন কাজ করছে। যারা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’ সার সংকটের অভিযোগটি সীমান্ত জেলাগুলোয় বেশি পাওয়া যাচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী আরো বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমরা বেশি ভর্তুকি দেই। সেজন্য তাদের দেশের তুলনায় আমাদের এখানে দাম কম। তবে আমাদের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই যে সার পাচার হচ্ছে। বিজিবিকে সীমান্তে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আমন মৌসুমে সারের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহে ঘাটতি কৃষির জন্য উদ্বেগের বিষয়। সময়মতো সার না পেলে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। বেশি দামে কিনলে কৃষকের ব্যয় বাড়বে। যেটি কৃষক ও দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বিঘ্ন সৃষ্টি করবে।
এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গার অভিযোগ অনুযায়ী সারের সরবরাহ পর্যাপ্ত নেই। কৃষকরা চাহিদামতো সার সংগ্রহ করতে পারছেন না। আমনের মৌসুমে সারের সরবরাহ ঠিক না থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং সেটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বিঘ্ন সৃষ্টি করবে। এতে খাদ্যে আমদানিনির্ভরতা আরো বাড়বে।’
আমনের পর সামনে শীতকালীন সবজির মৌসুম আসছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সে সময় দেশে প্রচুর সবজি চাষ হয়। সারের এ সংকট থাকলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এতে সবজির দামও বেড়ে যাবে। এমনিতেই খাদ্য মূল্যস্ফীতি উঁচুতে। ফলে অন্যান্য খাদ্যের সঙ্গে সবজির দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্দশা আরো বেড়ে যাবে। সে জন্য এখনই পরবর্তী মৌসুমের জন্যও পরিকল্পনা করতে হবে। পাশাপাশি সংকট কমাতে সারের দেশীয় উৎপাদন আরো ত্বরান্বিত করতে হবে।’
সূত্রমতে, অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি মৌসুম এখন। বর্ষার পানি ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় এ সময় ধান রোপণ ও পরিচর্যার কাজ চলে। ধানের কুশি বৃদ্ধি, গাছের স্বাভাবিক বিকাশ এবং ফলন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পর্যায়ে সুষম মাত্রায় ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপিসহ প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করতে হয়। কৃষকরা বলছেন, সময় পার হয়ে গেলে পরে সার পেলেও তার সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায় না। ফলে সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু উৎপাদন খরচই বাড়বে না, ফলনেও পড়তে পারে নেতিবাচক প্রভাব।
রাজশাহীর মোহনপুর, তানোর ও গোদাগাড়ীর বরেন্দ্র অঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় দেখা যায়, মাঠজুড়ে চলছে আমন আবাদের ধুম। মাঠে মাঠে জমি তৈরির কাজ করছেন কৃষক। কোথাও কোথাও আগাম জাতের আমন রোপণে ব্যস্ত তারা। আগস্টের শেষ নাগাদ চলবে এ কর্মযজ্ঞ। কৃষকরা আমনের ভালো ফলন পেতে বিভিন্ন সারের খোঁজে নানা প্রান্তে ছুটছেন। সামর্থ্যবান কৃষকরা বেশি টাকা দিয়ে অবৈধ দোকান থেকে সার নিতে পারলেও মাঝারি ও প্রান্তিক কৃষক এক-দুই বস্তা সারও কিনতে পারছেন না। রাজশাহীর তানোরের রিশিকুল ইউনিয়নের ছোট পলাশী গ্রামের কৃষক সাজেদুর রহমান বলেন, ভর্তুকি বা সরকার নির্ধারিত দামে কোথাও সার পাচ্ছেন না। দোকানে গেলে ডিলার বলেন সার নেই। বাধ্য হয়ে তারা বেশি দামের খুচরা দোকানে ভিড় করছেন।
রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটার কৃষক নিজাম উদ্দিন। আমন ধান রোপণের পর জমিতে প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার আর পরিচর্যা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা তার। কিন্তু সে কাজ রেখে এখন তাকে ছুটতে হচ্ছে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে, সারের খোঁজে। কৃষি কার্ড নিয়েও অনুমোদিত ডিলারের দোকানে গিয়ে পাচ্ছেন না সার। অথচ একই সার মিলছে বাজারের খুচরা দোকানে, তবে সরকারি দামের চেয়ে বেশিতে।
দুলাল হোসেন নামের আরেক কৃষক বলেন, ‘কৃষি কার্ড থাকার পরও দুবার ডিলারের কাছে গিয়ে সার পাইনি। সরকারি দামে সার নেই। কিন্তু বেশি দিলে ঠিকই খুচরা দোকানে পাওয়া যাচ্ছে। মূলত ডিলাররা দোকানে সার রাখছেন না। গোপনে অন্যত্র লুকিয়ে রেখে বেশি দামে বিক্রি করছেন।’
শুধু নিজাম উদ্দিনরা নন; রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, রংপুর, লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকের অভিযোগ এখন একই রকম। আমন ধান রোপণ ও পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসে প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা। কোথাও অনুমোদিত ডিলারের দোকানে ভর্তুকির সার মিলছে না, আবার কোথাও খুচরা দোকানে পাওয়া গেলেও তা কিনতে হচ্ছে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি দিয়ে। বিশেষ করে টিএসপি ও ডিএপি সারের ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি বেশি প্রকট বলে অভিযোগ কৃষকদের।
সরকার নির্ধারিত দামে কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়া সার বিক্রির কথা প্রতি কেজি ২২ টাকা দরে। ৫০ কেজির এক বস্তার দাম ১ হাজার ১০০ টাকা। টিএসপির কেজি ২৭ টাকা, বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকা। ডিএপির কেজি ২১ টাকা, অর্থাৎ ৫০ কেজির বস্তা ১ হাজার ৫০ টাকা। আর এমওপি সারের কেজি ২০ টাকা, বস্তা ১ হাজার টাকা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষকের অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদিত ডিলারের দোকানে সরকারি দামে সার না পেয়ে খুচরা বাজার থেকে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, টিএসপির ৫০ কেজির বস্তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। অর্থাৎ সরকারি দামের তুলনায় একেকটি বস্তায় বাড়তি দিতে হচ্ছে ৩৫০-৪৫০ টাকা। ডিএপির ক্ষেত্রেও ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রতি বস্তায় কৃষকের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে ৫৫০-৬৫০ টাকা।
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ডিলাররা বলছেন সার নেই, কিন্তু ৫০০-৬০০ টাকা বেশি দিলে ঠিকই সার দিচ্ছে।’
গোদাগাড়ী উপজেলার বসন্তপুর গ্রামের কৃষক ওয়ালিউল্লহর অভিজ্ঞতাও একই। কয়েকবার ডিলারের কাছে গেছেন সার কিনতে, কিন্তু পাননি। নওহাটা বাজারে বিএডিসি অনুমোদিত ডিলার মেসার্স হক অ্যান্ড সন্স এন্টারপ্রাইজে গিয়ে ভর্তুকি মূল্যের কোনো সার পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আবদুল হক বলেন, জুলাইয়ে মাত্র ২২ বস্তা টিএসপি, ৭০ বস্তা এমওপি ও ১১০ বস্তা ডিএপি পেয়েছি। অথচ এ অঞ্চলে ৪২টি মৌজার কয়েক হাজার কৃষক রয়েছেন। বরাদ্দ পাওয়া সার দুই-তিন দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কর্মকর্তারা বলছেন, ডিলারদের বরাদ্দের পরিমাণ নির্ধারণ করে কৃষি মন্ত্রণালয়। অনুমোদিত বরাদ্দের বাইরে গিয়ে সার সরবরাহের সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে বিএডিসির রাজশাহীর সহকারী পরিচালক (সার) নাসির উদ্দিন বলেন, ডিলারদের বরাদ্দ কম পাওয়ার অভিযোগ থাকলেও আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত পরিমাণ অনুযায়ীই সরবরাহ করি। মন্ত্রণালয় যতটুকু বরাদ্দ দেয়, ততটুকুই দিতে পারি।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, সারের সংকট নিয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
একই কথা বলেছেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কুষ্টিয়াতেও সরকার নির্ধারিত দামে সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। ডিলারদের কাছ থেকে সার না পেয়ে তারা সাব-ডিলার ও খুচরা দোকান থেকে বাড়তি দামে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। কোথাও সার পাওয়া গেলেও ১০-২০ কেজির বেশি মিলছে না। এতে যাদের বেশি সার প্রয়োজন তারা বিপদে পড়ছেন। আবার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রতি কেজিতে ৫-১৩ টাকা পর্যন্ত বেশি খরচ করতে হচ্ছে।
কুমারখালীর পান্টি ইউনিয়নের বড় ভালুকা গ্রামের কৃষক কামরুজ্জামান জানান, তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। ইউনিয়নের ডিলারের দোকানে গিয়ে নির্ধারিত দামে প্রয়োজনীয় সার পাননি। পরে সাব-ডিলারের কাছ থেকে প্রতি কেজি ইউরিয়া ৩২ টাকা, ডিএপি ৩৭ ও টিএসপি ৩৮ টাকা দরে কিনেছেন। একই এলাকার কৃষক জয়নাল আবেদীন অভিযোগ, ডিলারের কাছ থেকে একসঙ্গে বস্তা ধরে সার দেয়া হয় না। ১৫-২০ কেজি দেওয়া হচ্ছে। ফলে তিনি জমিতে ঠিকমতো সার দিতে পারছেন না।
জানতে চাইলে কুমারখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন বলেন, অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। কৃষকদের অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকটি ডিলার পয়েন্টে কৃষি কর্মকর্তারা অবস্থান করে সার বিতরণ করবেন। কৃত্রিম সংকট ও বেশি দাম নেওয়ার মৌখিক অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতারও।
সারের সংকট ও বাড়তি দামের অভিযোগে সম্প্রতি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান কৃষকরা। প্রায় ২ ঘণ্টা পর উপজেলা প্রশাসনের আশ্বাসে তারা অবরোধ তুলে নেন। কৃষকদের অভিযোগ, টিএসপি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০, ইউরিয়া সারের বস্তা কিনতে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে তাদের।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের এরশাদের মোড় এলাকার কৃষক আবু তালেব তার ১০০ শতক জমিতে ধান আবাদ করেছেন। তিনি জানান, ধান আবাদের ১৫-২০ দিনের মধ্যে সার দেওয়ার প্রয়োজন হয়। সময়মতো তা দিতে না পারলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। ডিলারের কাছে পটাশ ও ইউরিয়া না পেয়ে তাই বাধ্য হয়ে খোলাবাজার থেকে বেশি দামে সার কিনেছেন।
বিএডিসি বীজ ডিলার অ্যাসোসিয়েশন রংপুর জেলার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রকৃত কৃষকদের সার না পাওয়ার কথা নয়। পটাশ ও টিএসপির সরবরাহ যথেষ্ট রয়েছে। তবে ডিএপির সরবরাহ কম, এ মাসে তা ঠিক হয়ে যাবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলেও সারের সংকটের অভিযোগ রয়েছে। গত সপ্তাহে সার সংগ্রহ করতে ভোর থেকেই ডিলারদের দোকানের সামনে কৃষকদের দীর্ঘ লাইন ছিল। একপর্যায়ে সার নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। কৃষকদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরুতেই চাহিদা অনুযায়ী তারা সার পাননি। এজন্য সার বিতরণের দিন ভোর থেকে লাইনে দাঁড়ান তারা।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার বনগ্রাম এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, তিনি আট বিঘা জমিতে রোপা আমন ধান লাগিয়েছেন। ধানখেতে ছিটানোর জন্য তার ১০০ কেজি টিএসপি সারের প্রয়োজন। কিন্তু ছয়টি সার বিক্রয়ের দোকানঘুরে মাত্র ৪৫ কেজি টিএসপি সার সংগ্রহ করতে পেরেছন তিনি। তার মধ্যে ১৫ কেজি সার কিনেছেন সরকারের নির্ধারিত ২৭ টাকা কেজি দরে। বাকি ৩০ কেজি কিনতে প্রতি কেজিতে তাকে ৩-৪ টাকা বাড়তি খরচ করতে হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ধান গাছে শিকড় শক্ত ও গাছ দ্রুত বেড়ে ওঠার জন্য টিএসপি সারের প্রয়োজন। কিন্তু তিনি চাহিদামতো সার সংগ্রহ করতে না পারায় চরম হতাশ হয়ে পড়েছেন। তবে ইউরিয়া ও ডিএপি সারের সরবরাহ চাহিদামতো রয়েছে। চাহিদামতো টিএসপি সার ধানখেতে ছিটাতে না পারলে আমনের আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাবে না। টিএসপি সারের এতটাই সংকট দেখা দিয়েছে যে বাড়তি টাকা দিয়েও এ সার সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।
রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলা লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। গ্রামের কৃষকরা এখন আমন ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত। এর মধ্যে অনেক কৃষক দুই সপ্তাহ আগেই চারা রোপণ শেষ করেছেন। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চর শৈলমারী এলাকার কৃষক বাবলু মিয়া জানান, তিনি এ বছর ১২ বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন, কিন্তু চাহিদার ২০ শতাংশও টিএসপি সারের সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। ইউরিয়া ও ডিএপি সার সরবরাহ থাকলেও তাদের প্রতি কেজি সার কিনতে ২ থেকে ৩ টাকা বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আমার ১৭০ কেজি টিএসপি সারের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু সংগ্রহ করেছি মাত্র ৫০ কেজি। দোকানে গেলে ডিলাররা বলছেন, টিএসপি সারের সরবরাহ নেই। বাড়তি দাম দিতে চেয়েও এই সার সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। সময়মতো টিএসপি সার ধানখেতে ছিটানো না গেলে ধানগাছের শিকড় শক্ত হবে না এবং দ্রুত গাছ বেড়ে উঠতে পারবে না।
গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর তিস্তা চরের কৃষক মোন্নাফ মিয়া বলেন, টিএসপি সার সংগ্রহ করতে তিনি ৩ দিন সার বিক্রেতাদের দোকানে ধরনা দিয়েছেন, কিন্তু চাহিদামতো সার না পেয়ে চরম হতাশ তিনি। এই কৃষক বলেন, ‘১০ বিঘা জমিতে আমন ধানের চাষ করেছি। আপাতত ১৫০ কেজি টিএসপি সারের চাহিদা থাকলেও মাত্র ৫০ কেজি সংগ্রহ করতে পেরেছি, তাও নির্ধারিত মূল্য থেকে বাড়তি টাকা খরচ করে।’ তিনি বলেন, ‘আগের বছরগুলোতে টিএসপি সার চাহিদামতো সরবরাহ পেতাম, কিন্তু এ বছর তা পাচ্ছি না। সার বিক্রেতাদের বাড়তি টাকা দিয়েও সার পাওয়া যাচ্ছে না।’
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বজরা এলাকার সার ডিলার জুলহাস হোসেন জানান, কৃষকদের মাঝে বর্তমানে টিএসপি সারের ব্যাপক চাহিদা, কিন্তু তাদের চাহিদা অনুযায়ী এই সার দেওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমার দোকানে প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ১০ হাজার কেজি টিএসপি সারের চাহিদা। তবে আমি সরকারিভাবে বরাদ্দ পেয়েছি মাত্র ৫০০ কেজি। সরকার সারের বরাদ্দ না দিলে আমরা কিভাবে কৃষকের চাহিদা পূরণ করব?’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সারের চাহিদা গিয়ে দাঁড়াবে ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টনে। এর মধ্যে ইউরিয়া ২৬ লাখ ২২ হাজার, টিএসপি ৯ লাখ ১ হাজার ৫০০, ডিএপি ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০, এমওপি ৯ লাখ ৭০ হাজার টন। এছাড়া এনপিকেএস (নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ ও সালফারের সুষম সার), জিপসাম, জিংক সালফেট, ম্যাগনেসিয়াম সালফেট, বোরন ও অ্যামোনিয়াম সালফেটের চাহিদা ৯ লাখ ২১ হাজার ৩০০ টন ধরা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট সারের মজুদ ছিল ১৬ লাখ টনের কিছু বেশি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চলতি মৌসুমে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৫৭ লাখ ১০ হাজার ৭৬২ হেক্টর। বিপরীতে আমনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ ৫৭৬ টন। এ সময় চাহিদামতো সার না পেলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









