দীর্ঘ ৩৫ বছর পর দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এ নির্বাচনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচনে ভোটাররা গোপন ব্যালটে নয়, ভোট দেবেন প্রকাশ্যে ‘ওপেন’ব্যালটে। কে কাকে ভোট দিচ্ছেন তা উপস্থিত সবার কাছে দৃশ্যমান থাকবে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্য ভোট চাইলেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল বিকালে জাতীয় সংসদে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় সংসদ সদস্যদের কাছে ভোট চান তিনি। অপরদিকে নতুন রাষ্ট্রপতি আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় শপথ নেবেন। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এ তথ্য জানিয়েছেন। বঙ্গভবনের দরবার হলে এ শপথ অনুষ্ঠান হবে।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১১-দলীয় ঐক্য জোটের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ। ফলে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে ভোটাভোটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সর্বশেষ ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদ সভা কক্ষে রাষ্ট্রপতি পদে ভোটগ্রহণ হয়েছিল। ওই সময়ে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রার্থী ছিলেন বদরুল হায়দার চৌধুরী। ১১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বদরুল হায়দার চৌধুরীকে ৯২ ভোটে পরাজিত করে ১১তম রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। তিনি পেয়েছিলেন ১৭২ ভোট।
নির্বাচন আয়োজনের পুরো আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি নিয়ে গতকাল বুধবার গণমাধ্যমে ব্রিফ করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ‘নির্বাচনী কর্তা’ এ এম এম নাসির উদ্দীন। সাধারণত নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জ্যেষ্ঠ সচিব ব্রিফ করে থাকেন। তবে আইনের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ‘নির্বাচনী কর্তা’হিসেবে দায়িত্ব সিইসির ওপর ন্যস্ত থাকায়, এই বিশেষ ও ঐতিহাসিক সময়ে তিনি নিজেই সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন। নির্বাচন কমিশন, জাতীয় সংসদ সচিবালয় এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানান সিইসি।
নির্বাচনের প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে সিইসি বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর ওই দিনই ক্যাবিনেট ডিভিশন থেকে এ বিষয়ে গ্যাজেট প্রকাশ করা হয়। এরপর সংবিধান ও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের পর সংসদীয় পদ্ধতিতে এই প্রথম একাধিক প্রার্থীর মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মাঝে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রত্যক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতায় কিছুটা ঘাটতি থাকলেও তা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় সব মহড়া ও প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা হয়েছে। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন ও বিধিমালার আলোকে নির্বাচন কমিশন এই পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
জাতীয় সংসদ বর্তমানে নিয়মিত অধিবেশনে না থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী সিইসি নিজেই সংসদ সদস্যদের বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন। গত ১১ আগস্ট ন্যূনতম সাত দিন সময় রেখে এই সংক্রান্ত গ্যাজেট প্রকাশ করা হয়। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরাই এই নির্বাচনের ভোটার। নির্বাচন কমিশন আগেই ভোটার তালিকা ও তফসিল প্রকাশ করেছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী গত ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র দাখিলের দিনে মোট তিনটি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষে দুটি মনোনয়ন জমা দেওয়া হয় ড. অলি আহমদের নামে এবং বর্তমান সরকারি দল বিএনপির পক্ষে একটি মনোনয়ন জমা দেওয়া হয় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে। পরবর্তীকালে ১৬ আগস্ট জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সহায়তায় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়।
সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়ার দিনের মূল স্বাক্ষর রেজিস্টারের সঙ্গে প্রস্তাবক ও সমর্থকদের স্বাক্ষর মিলিয়ে দেখে তিনটি মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী একই প্রার্থীর দুটি বৈধ মনোনয়নপত্রের মধ্যে একটি বাড়তি হিসেবে গণ্য হওয়ায় চূড়ান্তভাবে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিনে কোনো প্রার্থীই নাম প্রত্যাহার করেননি।
ভোটার তালিকার ক্রমিকে কিছুটা বৈচিত্র্যের ব্যাখ্যা দিয়ে সিইসি জানান, সংসদীয় সীমানার সিরিয়াল অনুযায়ী পঞ্চগড়-১ থেকে শুরু হয়ে বান্দরবানে গিয়ে ৩০০ আসন শেষ হলেও এই নির্বাচনে মূলত সংসদের ‘বিভক্তি নম্বর’ অনুযায়ী ভোটিং কার্যক্রম পরিচালিত হবে। চট্টগ্রাম-৪ আসনের উপনির্বাচন বা শূন্যতার কারণে ভোটার তালিকায় বিভক্তি নম্বরে কিছুটা ডিসকন্টিনিউইটি রয়েছে। তবে তা নিয়মানুগভাবেই সমাধান করা হয়েছে এবং মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৯ জন। ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সংসদ সদস্যরা এই নির্বাচনে ভোটার হিসেবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
নির্বাচন পরিচালনার জন্য স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করা আইনগত বাধ্যবাধকতা এবং সে অনুযায়ী কমিশন পরামর্শক্রমেই সব সূচি নির্ধারণ করেছে বলে জানান সিইসি। ভোটগ্রহণ শেষে বিকেল ৫টার পরপরই তাৎক্ষণিকভাবে ভোট গণনা শুরু হবে এবং ফলাফলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন সিইসি নিজে। পুরো গণনার প্রক্রিয়া থাকবে শতভাগ স্বচ্ছ। নির্বাচন চলাকালীন ও ভোট গণনার সময় সংসদ সদস্যরা কক্ষে উপস্থিত থাকতে পারবেন। ভোটার ও প্রার্থীদের নাম ব্যালট পত্রে স্পষ্ট উল্লেখ থাকায় কে কাকে ভোট দিচ্ছেন তা উপস্থিত সবার কাছে উন্মুক্ত থাকবে।
ভিআইপি ভোটারদের ভোটদান এবং ফলাফল গণনার পর্বটি বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি স্পষ্ট করেন, সংসদ ভবনের ভেতরের পরিবেশ ও বিধিমালা বজায় রাখার দায়িত্ব স্পিকারের, যা তাদের নিজস্ব আইনের অধীন পরিচালিত হয়। ভোটের দিন হাউজের ভেতরে কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না।
এ ছাড়া এই নির্বাচনকে ঘিরে অতিরিক্ত বা কোটি কোটি টাকা খরচের খবর গুজব ছাড়া কিছু নয় বলে তিনি জানান। সংসদের বৈঠক ডাকার মতো নিয়মিত বিষয় এবং কিছু ব্যালট ও স্টেশনারি ছাড়া কমিশনের আলাদা কোনো বড় ধরনের আর্থিক ব্যয় বা অতিরিক্ত বাজেট তৈরি হয়নি। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশ ও আন্তর্জাতিক মহল এই নির্বাচনের দিকে বিশেষ নজর রাখছে উল্লেখ করে সিইসি নাসির উদ্দীন আশা প্রকাশ করেন, সবার আন্তরিক সহযোগিতায় নির্বাচন কমিশন একটি অত্যন্ত সুন্দর, স্বচ্ছ ও ঐতিহাসিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে সক্ষম হবে।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রকাশ্যে ভোট দেওয়ার আইন চ্যালেঞ্জ এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সর্বশেষ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের ভোটার করার নির্দেশনা চেয়ে করা রিট খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গতকাল বুধবার হাইকোর্টের বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতে রিট আবেদনটি দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাইফুল আলম ফুয়াদ। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৫ আসন থেকে প্রার্থী ছিলেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। এর আগে মঙ্গলবার হাইকোর্টের বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিত চেয়ে আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দের করা রিট খারিজ করে আদেশ দেন। রিট খারিজের পর বুধবার আপিল বিভাগে আবেদন করেছেন আইনজীবী। গত ১৩ আগস্ট রিটটি করেন আইনজীবী মো. ইউনুছ আলী আকন্দ।
রিটের পক্ষে তিনি নিজেই শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মামুন চৌধুরী এবং আখতার হোসেন মো. আব্দুল ওয়াহাব। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ওই দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। তবে এ কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অযোগ্য হবেন না। রিটকারী আইনজীবী বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন না। এতে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ব্যাহত হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









