ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ২টা। স্ক্রিনের আলোয় চোখ রেখে চাতকের মতো চেয়ে আছেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক তরুণ। হঠাৎ করেই তাঁর ফেসবুক মেসেঞ্জার কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ থেকে পরিচিত বন্ধুদের ইনবক্সে একের পর এক বার্তা যেতে শুরু করল ‘দোস্ত, খুব জরুরি দরকার। এক হাজার টাকা দিয়ে একটু হেল্প কর। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ব্যাক দিচ্ছি।’গভীর রাতের এমন বার্তা দেখে বন্ধুরা ভাবলেন, নিশ্চয়ই কোনো বড় বিপদ। কেউ হাসপাতালে, কিংবা কোনো জরুরি সংকটে। মুহূর্তেই বিকাশ বা নগদে চলে এলো টাকা। কিন্তু সকাল গড়িয়ে রাত হলেও সেই টাকা আর ফেরত আসে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, কোনো মানবিক বিপর্যয় নয়; বরং টাকাগুলো সরাসরি চলে গেছে আন্তর্জাতিক এক অনলাইন জুয়ার সাইটের ডিজিটাল ওয়ালেটে।…এভাবেই অনলাইন জুয়ার সাইটগুলো হাতিয়ে নিচ্ছে কাড়ি কাড়ি টাকা। দেড় শ বছরের পুরনো আইন দিয়ে জুয়া প্রতিরোধ করছিল বাংলাদেশ। যার কারণে জুয়া বিশেষ করে অনলাইন জুয়া কমার বদলে বিস্তৃত হচ্ছিল। আশার কথা, গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে সেই দেড় শ বছরের পুরনো আইন বাতিল করে নতুন যুগোপযোগী জুয়া প্রতিরোধ আইন পাস হয়েছে। এ পর্যায়ে ভার্চুয়াল বা অনলাইন জুয়ার বিস্তৃতি নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে দৈনিক এদিন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে,অনলাইন জুয়া তরুণ প্রজন্মকে ভয়াবহ অন্ধকার ও ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে একে কেবলই একটি অ্যাপ বা গেম মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে এক পরিকল্পিত আর্থিক ও মানসিক ফাঁদ। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে যেকোনো সময় এই সাইটগুলোতে ঢোকা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘সহজে ঘরে বসে আয়ের’ প্রলোভন দেখিয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। প্রথমে ছোট ছোট জয়ের লোভ দেখিয়ে ব্যবহারকারীকে নেশাগ্রস্ত করা হয়। জমানো টাকা শেষ করে তরুণরা ঋণগ্রস্ত হচ্ছে, এমনকি জমি বা পারিবারিক সম্পদ বিক্রি করছে।
সারাক্ষণ টাকা হারানোর টেনশন থেকে চরম হতাশা, বিষণ্ণতা এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা ও মাদক ব্যবসার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তরুণরা। মিথ্যা বলা এবং গোপনীয়তার কারণে পরিবারের সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
এদিন অনুসন্ধান টিম ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির প্রতিবেদন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখতে পেয়েছে, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে হুন্ডি, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং ই-ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশের বাইরে (যেমন: রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া) পাচার হয়ে যাচ্ছে। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত মানুষের সংখ্যা বর্তমানে ৫০ লাখ ছাড়িয়েছে, যা আগামী বছরগুলোতে আরও জ্যামিতিক হারে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অপরাধ বিজ্ঞানী ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন জুয়া কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি তরুণদের নৈতিক অবক্ষয় ঘটিয়ে দেশের মানবসম্পদকে ধ্বংস করছে। জুয়াড়িরা ঋণের টাকা শোধ করতে গিয়ে এক পর্যায়ে হ্যাকিং, চুরি বা মাদক ব্যবসার মতো অপরাধ চক্রে জড়িয়ে পড়ে।
ঢাকার পরিস্থিতি
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার (অনলাইন গ্যাম্বলিং) প্রবণতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়, আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সহজলভ্য ইন্টারনেট, স্মার্টফোন এবং মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, রগদ, রকেট ইত্যাদি) সেবার অপব্যবহারের কারণে তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষ এতে জড়িয়ে পড়ছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা—বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী, যুবক এবং নিম্ন-আয়ের পেশাজীবীদের মধ্যে অনলাইন জুয়ার বিস্তার সবচেয়ে বেশি। ঢাকার মিরপুরে বসবাসকারী আসিফ রহমান (ছদ্মনাম) নামের এক সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ভাষায়, ‘শুরুটা হয়েছিল বন্ধুদের দেখাদেখি ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেটের একটা ম্যাচ দিয়ে।
প্রথমে কিছু টাকা জেতার পর লোভ বেড়ে যায়। এরপর ল্যাপটপ, ফোন বিক্রি করে এবং বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নিয়ে প্রায় ৫ লাখ টাকা হারি। দেনার দায়ে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে, এখন পাওনাদারদের ভয়ে ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় লুকিয়ে থাকি।’
খিলগাঁওয়ের গৃহিণী রেহানা বেগম (ছদ্মনাম) তার স্বামীর জুয়ায় আসক্তির ব্যাপারে বলেন, ‘আমার স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। গত এক বছর ধরে তিনি রাতে ঘুমাতে পারতেন না, সারাক্ষণ মোবাইলে কী যেন দেখতেন। পরে জানতে পারি, বেতনের সব টাকা তিনি অনলাইন ক্যাসিনোতে হারিয়েছেন। এমনকি আমার বিয়ের গহনাগুলোও তিনি বন্ধক রেখেছেন। এখন আমাদের সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে।’
চট্টগ্রাম পরিস্থিতি
রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামেও আশঙ্কাজনকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইন জুয়ার (অনলাইন গ্যাম্বলিং) ভয়াবহতা । বন্দরনগরীর অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে প্রান্তিক উপজেলাগুলোতেও তরুণ ও যুবসমাজ এই মরণনেশায় আক্রান্ত হচ্ছে। এদিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নগরীর বহদ্দারহাট, ষোলশহর, জিইসি মোড় এবং বিশেষ করে কর্ণফুলী ও লোহাগাড়ার মতো বিভিন্ন উপজেলার চা দোকান ও আড্ডার স্থানগুলো জুয়াড়িদের প্রধান আস্তানায় পরিণত হয়েছে।
স্মার্টফোনে বিভিন্ন অ্যাপ ডাউনলোড করে ক্যাসিনো কিংবা লাইভ স্পোর্টস বেটিংয়ে মেতে উঠছে তরুণরা। জুয়ার টাকা জোগাড় করা এবং নিজেদের মধ্যে লেনদেনের বিরোধকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে মারামারি এবং খুনাখুনির মতো ঘটনাও ঘটছে। লোহাগাড়ায় জুয়ার টাকাকে কেন্দ্র করে বন্ধু খুনের ঘটনা এর একটি বড় উদাহরণ। ভিকটিমের মা রেজিয়া বেগমের ভাষায়, ‘আমার ছেলেটা রাজমিস্ত্রির কাজ করত। বন্ধুদের সাথে মোবাইলে কীসব জুয়া খেলত। সেই জুয়ার টাকা আর ওর দামি মোবাইলটার লোভেই ওর নিজের বন্ধুরাই ওকে রাতে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে খুন করে ফেলল।
অনলাইন জুয়া আমার কোল খালি করে দিয়েছে, আমি এই জুয়াড়িদের বিচার চাই।’ চকবাজারে বসবাস করা তানভীর (ছদ্মনাম) নামের এক স্নাতক শিক্ষার্থী বললেন, ‘প্রথমে আইপিএল ম্যাচগুলোতে অল্প টাকা বাজি ধরতাম। একসময় লাভ হওয়ায় নেশা চেপে বসে। ধীরে ধীরে বাবার ব্যবসার ক্যাশ থেকে টাকা সরানো শুরু করি। শেষ পর্যন্ত ল্যাপটপ এবং মোটরসাইকেল বিক্রি করে প্রায় ৭ লাখ টাকা হেরেছি। এখন চট্টগ্রামে পাওনাদার আর গুন্ডাদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। পড়াশোনা তো শেষ হয়েছেই, পরিবারও এখন আমার মুখ দেখতে চায় না।’
সিলেট পরিস্থিতি
প্রবাসী অধ্যুষিত এবং পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত সিলেটে সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জুয়ার (অনলাইন বেটিং বা ভার্চ্যুয়াল ক্যাসিনো) বিস্তার এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সিলেটের সীমান্ত এলাকা, চা-বাগান অঞ্চল এবং শহরের অভিজাত এলাকার তরুণদের একাংশ এই মরণনেশার জালে আটকা পড়েছে। সিলেটে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের একটা অংশ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের টাকা এই জুয়ার পেছনে খরচ হচ্ছে বলে এদিন অনুসন্ধানে জানা গেছে।
দেখা গেছে, নগরীর জিন্দাবাজার, উপশহর, আম্বরখানা এবং জেলার বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, কানাইঘাট ও গোয়াইনঘাটের মতো প্রবাসী-অধ্যুষিত উপজেলাগুলোতে অনলাইন জুয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। সিলেটের স্থানীয় কিছু ডিলার বা ‘এজেন্ট’ অবৈধভাবে হুন্ডি এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের (বিকাশ, নগদ, রকেট) মাধ্যমে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চ্যুয়াল পয়েন্ট কিনে জুয়াড়িদের অ্যাকাউন্ট রিচার্জ করে দেয়। এতে করে প্রতিদিন সিলেট থেকে লাখ লাখ টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। অন্যদিকে জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে সিলেটে পারিবারিক কলহ, ডিভোর্স এবং চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এমনকি জুয়ার দেনা শোধ করতে না পেরে তরুণদের আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।
বিয়ানীবাজারের এক প্রবাসী পরিবারের সন্তান ফাহিম আহমদের (ছদ্মনাম) ভাষায়, ‘আমার বাবা যুক্তরাজ্যে (ইউকে) থাকেন। তিনি প্রতি মাসে যে টাকা পাঠাতেন, তার একটা বড় অংশ আমি বন্ধুদের সাথে অনলাইন স্লট গেম আর ক্রিকেট ম্যাচে বাজি ধরে ওড়াতাম। শুরুতে জিতলেও পরে টানা হারতে থাকি। বাবার পাঠানো টাকা শেষ করে মায়ের জমানো স্বর্ণালঙ্কারও লুকিয়ে বিক্রি করেছি। সব মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ টাকা শেষ।
এখন বাবা দেশে আসার কথা বলছেন, আমি লজ্জায় ও ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে সিলেটে এক বন্ধুর মেসে উঠছি। জীবনটা শেষ হয়ে গেল।’ এদিকে দক্ষিণ সুরমার এক ভিকটিমের স্ত্রী সালমা বেগম (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আমার স্বামী পেশায় একজন সিএনজি চালক। গত কয়েক মাস ধরে দেখতাম সারারাত মোবাইল নিয়ে বসে থাকেন। কোনো আয়-রোজগার তো দিতেনই না, উল্টো সিএনজি বিক্রির টাকা আর আমার জমানো সব টাকা ডিপিডিসি (অনলাইন জুয়ার সাইট) নামের একটা অ্যাপে শেষ করেছেন। পাওনাদারদের অত্যাচারে এখন আমরা ঘরছাড়া। এই জুয়া আমাদের পুরো পরিবারটাকে পথে বসিয়ে দিয়েছে।’
রংপুর পরিস্থিতি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রংপুর মহানগরীসহ পুরো বিভাগে অনলাইন জুয়া ও বেটিং অ্যাপের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের (বিকাশ, রকেট, নগদ) সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে ১এক্সবেটসহ বিভিন্ন জুয়ার সাইট ও অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে কিছু অসাধু যুবক 'মাস্টার এজেন্ট' হিসেবে কাজ করে সাধারণ মানুষকে এই ফাঁদে ফেলছে। সম্প্রতি রংপুরের তারাগঞ্জে অনলাইন জুয়ার টাকার ভাগাভাগি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে এক যুবককে নৃশংসভাবে খুন করে মাটির নিচে পুঁতে রাখার ঘটনাও ঘটেছে।
সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় অনুসন্ধানে জুয়ার শিকার ভিকটিম ও তাদের পরিবারের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা সামনে এসেছে। রংপুরের মানিক নামের এক যুবকের অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো আসক্তির কারণে তার পুরো পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। প্রথম দিকে সাধারণ গেম মনে করে খেললেও পরে জেতার লোভে পড়ে ঋণের জালে জড়াতে হয়। অনেক ভিকটিম জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে জমি ও ঘরের টিন বিক্রি করে দিচ্ছেন। অনেকে পৈতৃক সম্পত্তি বন্ধক রেখে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে জুয়ার অ্যাপে ঢালছেন। জুয়ায় হেরে টাকা জোগাড় করতে না পেরে ভিকটিমরা চুরি, ছিনতাই এবং পারিবারিক সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছেন। মা-বাবার জমানো টাকা বা ঘরের জিনিসপত্র চুরি করার মতো ঘটনা নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহী পরিস্থিতি
রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো শিক্ষানগরী রাজশাহীতেও অনলাইন জুয়ার (অনলাইন বেটিং বা ক্যাসিনো) বিস্তার ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গুগল ট্রেন্ডস-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অনলাইন ক্যাসিনো ও জুয়ার সাইটগুলো খোঁজার ক্ষেত্রে রংপুর বিভাগের পরেই রাজশাহী বিভাগের অবস্থান দ্বিতীয়। রাজশাহী শহর ছাড়াও চারঘাট, গোদাগাড়ী, তানোর ও বাগমারার মতো উপজেলাগুলোতেও এই মরণনেশা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। রাজশাহীতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, বেকার যুবক থেকে শুরু করে দিনমজুর ও কৃষকরাও এই মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজশাহী শহরের এয়ারপোর্ট এলাকা, কাটাখালী, তানোর ও গোদাগাড়ীর (যেমন: হাটপাড়া, মহিশালবাড়ি) কিছু প্রভাবশালী চক্র স্থানীয় যুবকদের 'এজেন্ট' বানিয়ে গোপনে জুয়ার অ্যাকাউন্টে টাকা (ডিপোজিট/পয়েন্ট) লোড করছে। ক্রেডিট কার্ডের পাশাপাশি বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা ঢালা হচ্ছে। জীবন (ছদ্মনাম) নামে চারঘাটের এক যুবক তার তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘ভেবেছিলাম অনলাইনে জুয়া খেলে কপাল বুঝি খুলে গেছে। প্রথমদিকে দিনে ১ হাজার টাকা আয় করতে শুরু করায় লোভ বেড়ে যায়।
একজন বেকারের জন্য যা ছিল বিশাল ব্যাপার। এরপর বেশি লাভের আশায় আত্মীয়-স্বজন আর বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে বেটিং সাইটে লাগাতে থাকি। একপর্যায়ে প্রায় ৩ লাখ টাকা হারিয়ে বসি। এখন ঋণের টাকা শোধ করার জন্য পরিবার আর বন্ধুদের ক্রমাগত চাপের মুখে প্রচণ্ড মানসিক কষ্টে আছি।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোদাগাড়ীর একজন বর্গাচাষী বলেন, ‘ছেলের পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নিজের সামান্য জমিটুকু বর্গা দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ছেলে ভালোভাবে পড়াশোনা শেষ করে হাল ধরবে। কিন্তু সে মোবাইলের জুয়ায় আসক্ত হয়ে সেই বর্গা দেওয়া জমির সব টাকা শেষ করে দিয়েছে। দেনার দায়ে এখন সে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আমরা এখন পুরোপুরি নিঃস্ব।’
বরিশাল পরিস্থিতি
আমাদের বরিশাল প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বরিশাল বিভাগে নীরব মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে এ অনলাইন জুয়া বা ‘বেটিং’। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, উদীয়মান তরুণ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে দিনমজুর, সবাই এখন এ অদৃশ্য ফঁদে বন্দি। একসময় যা নির্দিষ্ট অন্ধকার ঘরে বা আড্ডায় সীমাবদ্ধ ছিল, প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে সেই জুয়ার আসর এখন ঢুকে পড়েছে প্রতিটি ঘরের শোবার ঘরে, মানুষের হাতের মুঠোয়। মূলত ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন লাইভ খেলাকে কেন্দ্র করে বাজি ধরা হচ্ছে। এর বাইরেও রয়েছে অনলাইন ক্যাসিনো, লুডু বেটিং ও ভার্চ্যুয়াল গেমিংয়ের ফাঁদ।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে বন্ধুরা মিলে আড্ডা দেওয়ার ছলে কিংবা সহপাঠীর প্ররোচনায় একজন তরুণ প্রথম এই জগতে পা বাড়ায়। শুরুতে অল্প কিছু টাকা জিতে যাওয়ার পর এক ধরণের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। মনে হয়, এটাই বুঝি সহজে বড়লোক হওয়ার সংক্ষিপ্ত পথ। কিন্তু এই ক্ষণস্থায়ী জয়ই মূলত তাদের স্থায়ী অন্ধকারের দিকে টেনে নেয়। একপর্যায়ে বড় অঙ্কের টাকা হারাবার পর, সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার অন্ধ মোহ তৈরি হয়। আর তাতেই বাড়ে ঋণের বোঝা। সরকারি বিএম কলেজের শিক্ষার্থী মো. আবুল কালাম আজাদ (ছদ্মনাম) বলেন, ‘শুরুতে কয়েকবার জিতে মনে হয়েছিল ভাগ্য আমার পক্ষে। এরপর হারতে হারতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খোয়াই। ধার-দেনা করতে করতে বন্ধুদের মুখ দেখানোর পথ বন্ধ। পড়াশোনা তো নষ্ট হয়েছেই, এখন নিজের ওপর ঘেন্না হয়।’
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফ হেসেন (ছদ্মনাম) বলেন, ‘প্রতিবার হারার পর মনে হতো পরের বার জিতব। এই ‘পরের বার’ এর আশায় পরিবার থেকে নানা বাহানায় টাকা এনে জুয়ায় ঢেলেছি।’ সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের শিক্ষার্থী ইব্রাহিম মোল্লা (ছদ্মনাম) প্রথমে বন্ধুকে টাকা ধার দিয়ে ডাবল প্রফিট পেয়ে কৌতূহলী হন, পরে নিজেই নামেন জুয়ায়। বর্তমানে তাঁর অবস্থা এতটাই করুণ যে, জুয়া খেলার টাকা না পেলে ঘরে ভাঙচুর ও অস্বাভাবিক আচরণ করেন তিনি। এই মরণনেশা কেবল উচ্চবিত্ত বা শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, হকার, সেলুনকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, এমনকি রিকশাচালক ও দিনমজুরদের একটা বড় অংশ এখন সারাদিনের উপার্জনের টাকা তুলে দিচ্ছেন অনলাইন জুয়ার সাইটে।
খুলনা পরিস্থিতি
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খুলনা অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় (যেমন- খুলনা সদর, যশোর, কুষ্টিয়া, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা) চক্রগুলো অত্যন্ত সক্রিয়। সাধারণত বিভিন্ন বেটিং সাইট এবং অ্যাপের (দায়িত্বশীলতার প্রশ্নে নাম দেওয়া হলো না) মাধ্যমে এই জুয়া পরিচালিত হয়। স্থানীয় পর্যায়ে কিছু ‘এজেন্ট’ বা ‘হ্যান্ডলার’ জুয়াড়িদের টাকা ক্রিপ্টোকারেন্সি বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের (বিকাশ, রকেট, নগদ) মাধ্যমে ডলারে রূপান্তর করে জুয়ার সাইটে জমা দেয়। এ
ই অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে খুলনা বিভাগের বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। শুরুতে সামান্য কিছু টাকা জেতার লোভ দেখিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করা হয়। পরবর্তীতে আসক্ত হয়ে অনেকেই জমানো টাকা, পড়াশোনার খরচ, এমনকি মা-বাবার জমানো অর্থ জুয়ায় ঢেলে দেয়। অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে শেষ সম্বল জমি বা গবাদিপশু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। জুয়ায় সবকিছু হারিয়ে খুলনা অঞ্চলের বেশ কয়েকজন তরুণের আত্মহত্যার ঘটনাও গণমাধ্যমে এসেছে। পারিবারিক অশান্তি, ডিভোর্স এবং সামাজিক মর্যাদা হানির ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে।
ময়মনসিংহ পরিস্থিতি
খুলনা বিভাগের মতো ময়মনসিংহ বিভাগেও (বিশেষ করে ময়মনসিংহ সদর, নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুর অঞ্চলে) সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জুয়া ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্মার্টফোন ও সস্তা ইন্টারনেটের সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত এই অবৈধ ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ময়মনসিংহ অঞ্চলে মূলত রাশিয়া, মালয়েশিয়া বা সাইপ্রাসভিত্তিক বিভিন্ন বেটিং ওয়েবসাইট ও অ্যাপ ব্যবহার করে জুয়া খেলা হয়। স্থানীয় কিছু অসাধু তরুণ ও ব্যবসায়ী এসব সাইটের 'মূল এজেন্ট' বা 'সাব-এজেন্ট' হিসেবে কাজ করে।
তারা জুয়াড়িদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, নগদ, রকেট) বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার সাইটের অ্যাকাউন্টে ব্যালেন্স বা কয়েন লোড করে দেয়। বিনিময়ে এই এজেন্টরা মোটা অঙ্কের কমিশন পায়। অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে ময়মনসিংহ বিভাগের শত শত পরিবার আজ নিঃস্ব ও ধ্বংসের মুখে। নেত্রকোনা ও জামালপুরের বেশ কিছু ঘটনায় দেখা গেছে, জুয়ায় হেরে টাকা শোধ করতে গিয়ে তরুণরা মা-বাবার জমানো টাকা চুরি করেছে, মায়ের স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রেখেছে এবং শেষ সম্বল চাষের জমি বা বসতভিটা বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে।
যে কারণে ছিনতাই
আমাদের কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লা নগরীতে একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে ছিনতাইয়ের দৃশ্য। কোথাও পথচারীর পথরোধ করে ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে মোবাইল ও টাকা, আবার কোথাও অটোরিকশার যাত্রীদের টার্গেট করছে সংঘবদ্ধ চক্র। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ছিনতাইকারীদের হামলায় নিহত হন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী। ওই ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। স্বজনদের অভিযোগ, নিরাপত্তাহীনতার কারণে আজও তারা বিপর্যস্ত। তবে এবার তদন্তে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য। পুলিশের তথ্যমতে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেফতার হওয়া একাধিক ছিনতাইকারী অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত।
সহজে টাকা আয়ের আশায় অনলাইন ক্যাসিনোতে প্রবেশ করা অনেক তরুণ অল্প সময়ের মধ্যেই হারিয়ে ফেলছে সঞ্চয়। এরপর শুরু হয় ঋণ আর দেনার বোঝা। সেই অর্থ জোগাড় করতেই কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাই, চুরি কিংবা অন্যান্য অপরাধে। সদ্য জেল থেকে জামিনে মুক্ত পাওয়া কয়েকজন ছিনতাইকারীর যোগাযোগ করে জানা যায়, অনলাইন জুয়ার টাকা হারানোর পর তারা অপরাধের পথ বেছে নেয়। তারা এক সময় বিভিন্ন পেশায় কর্মরত ছিলেন।
মা বাবা পরিবার নিয়ে ভালই চলতেন। হঠাৎ মোবাইলে ভেসে আসা এইসব ভিজুয়াল ক্যাসিনোর অ্যাপে জড়িয়ে পড়েন। প্রথম দিকে জুয়া থেকে টাকা আসলেও ধীরে ধীরে সবকিছু শেষ হয়ে যায়। তারপর শুরু হয় দেনা। বিভিন্ন এনজিও থেকে, স্বজনদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে অনলাইন জুয়া খেলে সর্বস্ব হারিয়ে ফেলে। তারপর জুয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় মাদক। অনেক ক্ষেত্রে জুয়ায় হারার হতাশা থেকে মাদকে আসক্ত হচ্ছে তরুণরা। আবার মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে জড়িয়ে পড়ছে চুরি ডাকাতি ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে।
(আগামী পর্বে থাকছে: জুয়া ভূয়ার অনলাইন ব্যাবসা)


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









