অর্থনীতি পরিচালিত হয় বেসরকারি খাতের মাধ্যমে মন্তব্য করে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘সরকারের কাজ তাদের সহযোগিতা করা। আমাদের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে সবচেয়ে ভালো ব্যবসা নীতি, বিনিয়োগ নীতি ও লজিস্টিক সাপোর্ট থাকতে হবে। সরকারের ২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য আছে- জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি হয়তো কিছুটা উচ্চাভিলাষী। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আমাদের উচ্চাভিলাষী হতেই হবে।’
চট্টগ্রামের লালদিয়ার চরে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘চট্টগ্রামবাসীর হৃদয় হল বন্দর। এখানে সকল অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্দর ঘিরেই হয়। আমাদের আছে নির্বাচিত সরকার। চট্টগ্রামকে লজিস্টিক্যাল হাবে পরিণত করা আমাদের লক্ষ্য; শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, এই অঞ্চলের জন্য। তাই চট্টগ্রাম বন্দরের সম্ভাবনাকে পুরোদমে কাজে লাগাতে হবে।’
গতকাল রবিবার বিদেশি বিনিয়োগে হতে যাওয়া চট্টগ্রাম বন্দরের প্রথম টার্মিনালটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, ‘আজ নতুন অধ্যায়। আমরা বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও টার্মিনাল হ্যান্ডলিংয়ের নতুন যুগে প্রবেশ করতে চলেছি। পিপিপিতে এটি অনেক বড় বিনিয়োগ।’ প্রতি বছর আট লাখ টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের আশাবাদ ব্যক্ত করে নৌপরিবহনমন্ত্রী জানান, নতুন টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শেষ হলে সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের (জাহাজের পানিতে থাকা অংশের গভীরতা) এবং ছয় হাজার টিইইউএস (কুড়ি ফুট দৈঘ্যের কনটেইনারকে একক ধরে) ধারণক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে পারবে সেখানে। এর সঙ্গে আরো অনেক আধুনিক সুবিধা থাকবে।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আশা করি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই টার্মিনালের কাজ শেষ হবে। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি। বিশ্বের জন্য আমরা দ্বার উন্মুক্ত করতে চাই। শুধু লজিস্টিক হাব হিসেবে নয়, সব রকম বিনিয়োগের জন্য।’ তিনি জানান, ‘এটির সঙ্গে আরো কয়টি পোর্ট করতে যাচ্ছি। চট্টগ্রামে আরো কয়টি ইকোনমিক জোন হবে। চট্টগ্রামের মানুষের যে প্রত্যাশা, বাংলাদেশের মানুষের যে প্রত্যাশা চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হবে। বাণিজ্যিক রাজধানী কেউ করে না, বাণিজ্যিক রাজধানী হয়। এসব কাজের মাধ্যমে যখন অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়বে, সেটিই হবে বাণিজ্যিক রাজধানী।’
নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা প্রতিষ্ঠার সূচনা আজ হতে চলেছে। লালদিয়া টার্মিনালের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই বার্তা দিচ্ছে যে, বাংলাদেশ বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত।’ তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিক করার এ অগ্রযাত্রা শুরু হচ্ছে। আরো অনেকের আগ্রহ আছে। দেশের স্বার্থ প্রাধান্য দিয়ে আলোচনা চলছে। লালদিয়া আধুনিক টার্মিনাল কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, সেটির পথও আমাদের দেখাবে। এটি বাস্তবায়নে যত সহযোগিতা প্রয়োজন তা আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে করা হবে।’
কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে লালদিয়ার চরে টার্মিনাল নির্মাণে অর্ন্তবর্তী সরকারের সময় গত বছরের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে ডেনমার্কের মেয়ার্স্ক গ্রুপের কোম্পানি এপিএম টার্মিনালস। চুক্তির শর্ত অনুসারে ২২ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এপিএম টার্মিনালসকে প্রকল্পের জন্য জমি হস্তান্তর করে। নির্মাণ সময় তিন বছর ধরে হওয়া কনসেশন চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটি টার্মিনাল চালু হওয়ার পর তা ৩০ বছর পরিচালনা করবে। আর চুক্তির শর্ত পূরণ ও পালন করলে এই মেয়াদ আরো ১৫ বছর বাড়বে। সব মিলে টার্মিনালটি তাদের হাতে থাকতে পারে ৪৮ বছর।
বাংলাদেশে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার অনুষ্ঠানে বলেন, ‘ডেনমার্ক বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদার। বাংলাদেশের অগ্রগতিতে একসঙ্গে কাজ করতে আমরা সব সময় আগ্রহী। এপিএম টার্মিনালসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রমেশ ডেভিড বলেন, ‘এটি অনেক প্রথমের একটি প্রকল্প। প্রথম পিপিপি, প্রথম সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এবং প্রথম গ্রিনফিল্ড টার্মিনাল। এখানে আমরা নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করব।’
চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, ‘দেশের আমদানি-রফতানির ৯৫ শতাংশ হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। বিশ্বজুড়ে বন্দর ব্যবস্থাপনা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ না করলে আমরা পিছিয়ে যাব। বন্দর ব্যবহারকারীদের সময়োপযোগী সেবা দিতে আমাদের আধুনিক ও গ্রিন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হচ্ছে। এপিএম টার্মিনালস আন্তর্জাতিক মানের বন্দর ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত অভিজ্ঞ। তিন বছরের মধ্যে লালদিয়াতে এর প্রতিফলন দেখা যাবে। এটিই ২৪/৭ সচল প্রথম টার্মিনাল হতে চলেছে। আমাদের বর্তমান সক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ কনটেইনার ধারণ ক্ষমতার জাহাজ ভিড়বে লালদিয়া টার্মিনালে।’
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া, এপিএম টার্মিনালসের গ্লোবাল হেড অব অপারেশনস জ্যাক ক্রেগ।
চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান টার্মিনালগুলো থেকে নয় কিলোমিটার ভাটিতে (মোহনার কাছে) কর্ণফুলীর নদীর গুপ্তবাঁকের আগেই লালদিয়ার চরের অবস্থান। চরের পর গুপ্তবাঁক পেরিয়ে আছে চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি)। টার্মিনালটি পরিচালনা করছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি)। এরপর আরো উজানে চট্টগ্রাম বন্দরের তিনটি টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)।
সাগর মোহনা থেকে কর্ণফুলী নদীতে প্রবেশের পর নদীর বাক পেরিয়ে এসব টার্মিনালে জাহাজ ভেড়াতে হয়। সবগুলো টার্মিনালের মধ্যে মোহনার সবচেয়ে কাছে অবস্থান নির্মাণাধীন লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের। নদীতে কোনো বাঁক পেরনো ছাড়াই সবচেয়ে কম সময়ে, দ্রুত গতিতে এবং বড় আকারের জাহাজ ভিড়তে পারবে এখানে।
লালদিয়া টার্মিনালের মূল টার্মিনাল অংশ হবে ৩২ একর জুড়ে। এরপর ৭ দশমিক ১৫ একারের কন্টেইনার ইয়ার্ড এবং ১০ একরের ট্রাক পার্কিং ও প্রি গেট সুবিধা মিলিয়ে পুরো টার্মিনালটি হবে ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমিতে। এর আগে বন্দরের যতগুলো টার্মিনাল হয়েছে, সবই নিজেরা নির্মাণের পর বন্দর নিজে অথবা দেশি-বিদেশি অপারেটরদের পরিচালনাভার দেওয়া হয়।
লালদিয়া টার্মিনালকে বলা হচ্ছে বন্দরের প্রথম ‘গ্রিনফিল্ড টার্মিনাল’, যেন খালি জমি থেকে টার্মিনাল পর্যন্ত রূপান্তরে সব অবকাঠামো নির্মাণকাজ করবে বিদেশি বিনিয়োগকারী। এই টার্মিনালের ৬১৬ মিটার দীর্ঘ জেটিতে বছরে আট লাখ টিইইউএস কনটেইইনার হ্যান্ডলিং হবে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) বিনিয়োগ, যাতে মোট ৫৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ হবে বলে জানায় সংস্থাটি।
পিপিপি মডেলে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ডেনমার্ক সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২০০১ সালের জুনে। পরে মায়ের্স্ক গ্রুপের কোম্পানি এপিএম টার্মিনালস লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণে ২০২৩ সালের ২১ মে তাদের প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবটি পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দেয় ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর। পরের বছরের ৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ-ডেনমার্কের পিপিপি জয়েন্ট প্লাটফর্ম সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হলে ডেনমার্ক সরকারের পক্ষে এপিএম টার্মিনাল প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য গ্রহণ করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই লালদিয়ার চরে বসতি স্থাপনকারীদের উচ্ছেদও করা হয়। এরপর অর্ন্তবর্তী সরকার প্রকল্পটি এগিয়ে নেয়। তাদের মেয়াদের শেষদিকে চুক্তি সই হয়। এখন মাঠে গড়াচ্ছে সম্পূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগে দেশের প্রথম গ্রিনফিল্ড টার্মিনালের কাজ। বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীরা এই টার্মিনাল নির্মাণকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। এতে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে এবং দ্রুত ও কম খরচে পণ্য খালাস এবং বড় আকারের কন্টেইনার জাহাজ চলাচলের পথ সুগম হবে বলে মনে করছেন তারা।
অন্যদিকে বন্দর রক্ষার দাবিতে আন্দোলনকারীরা মনে করেন, বন্দরে একের পর এক টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে বন্দর ব্যবস্থাপনায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতির পাশাপাশি দেশের কৌশলগত সক্ষমতাও হ্রাস পাবে জানিয়ে জনস্বার্থে এ ধরনের চুক্তি পুনর্বিবেচনার দাবিও তুলেছেন তারা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









