## র্যাবের সঙ্গে এসআরবির ‘কোনো সংস্পর্শ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল ২০২৬ সংসদে পাস হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। এদিকে র্যাবের সঙ্গে এসআরবির কোনো সংস্পর্শ নেই বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করেন তিনি। পরে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের (বীরবিক্রম) সভাপতিত্বে বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই বিলটি পাস হয়।
স্পিকার বলেন, আমরা স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল ২০২৬ পাসের স্তরে রয়েছি। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি কর্তৃক সুপারিশকৃত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল-২০২৬ অবিলম্বে বিবেচনার জন্য গ্রহণের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট চান স্পিকার। এ সময় কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। পরে বিলের দফায় সংশোধনী নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
র্যাব বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি নামে পুলিশের অধীন নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিল বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। র্যাবের জনবল, সম্পদ, নথিপত্র, স্থাপনা, তহবিল ও দায়দায়িত্ব নতুন ইউনিটে হস্তান্তরের বিধান থাকায় বিরোধী দলের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, কার্যত একই বাহিনীকে নতুন নামে রাখা হচ্ছে। তাদের কেউ কেউ একে ‘নতুন বোতলে পুরনো মদ’ বলেও বর্ণনা করেন। বিলটি আরো যাচাই-বাছাই এবং অংশীজনদের মতামত নেওয়ার দাবি জানান তারা।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে দীর্ঘ আলোচনা ও দফাওয়ারি বিবেচনার পর ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর আগে বিলটি জনমত যাচাইয়ে পাঠানো এবং বাছাই কমিটিতে পাঠানোর বিরোধী দলের প্রস্তাব নাকচ হয়। এছাড়া বিলের প্রস্তাবনা ও ২৪ ধারায় স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালের আনা দুটি সংশোধনীও কণ্ঠভোটে নাকচ করে সংসদ।
এসআরবি বিলে যা আছে: বিলে বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর আওতায় ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন‘ নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে। সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ, শৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্ধারিত সংখ্যক কর্মকর্তা, আর্মড পারসোনেল ও কর্মচারী পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগ দিয়ে ইউনিটটি গঠন করা হবে। ইউনিটের কর্মকর্তা, আর্মড পারসোনেল ও কর্মচারীদের পদবিন্যাস, নিয়োগ পদ্ধতি ও চাকরির শর্ত বিধি দিয়ে নির্ধারণ করা হবে। এসআরবির আলাদা পতাকা, প্রতীক ও নির্দিষ্ট পোশাক থাকবে। পুলিশে কর্মরত অন্তত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এসআরবির মহাপরিচালক হবেন। বিলে র্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, বিদ্যমান সুবিধা, তহবিল, নগদ ও ব্যাংকে রাখা অর্থ, দায়, চুক্তি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, রেজিস্টার, রেকর্ডপত্র ও দলিল এসআরবির কাছে হস্তান্তরের বিধান রয়েছে।
নতুন আইনের বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান বিধিমালার অধীনে র্যাবের বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা ও আদালতের চলমান কার্যধারাও বহাল থাকবে। এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধানও রয়েছে। নাগরিকদের অভিযোগ এবং ইউনিটের সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। ইউনিটের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক এই কমিটির সভাপতি হবেন।
চার কার্যদিবসে পাসের জন্য আনা গ্রহণযোগ্য নয়: চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, র্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম ও খুনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এমন একটি বাহিনীর জায়গায় নতুন ইউনিট গঠনের আইন চার কার্যদিবসের মধ্যে পাসের জন্য আনার বিরোধিতা করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘র্যাবের প্রতি আমাদের আতঙ্ক আছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে এবং গোটা বাংলাদেশের গুম ও খুনের একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এ ধরনের একটা বিল কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে মাত্র চার কার্যদিবসের মধ্যে পাস করার জন্য এখানে নিয়ে আসা, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
ভুক্তভোগী, ফৌজদারি আইনজীবী, মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং অন্য অংশীজনদের সঙ্গে আরো আলোচনার দাবি জানান নুরুল ইসলাম। এসআরবির অভিযোগ প্রতিকার কমিটির স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার প্রস্তাব ছিল, বিচার বিভাগের একজন সাবেক বিচারপতির নেতৃত্বে স্বাধীন একটি কমিটি করা। এসআরবি কোনো ব্যক্তিকে কোথায় আটক রাখবে, সে বিষয়েও আরো স্পষ্ট বিধান চান তিনি। এসআরবির সব স্থাপনা ও কার্যালয়ের তালিকা গেজেটে প্রকাশ করারও প্রস্তাব দেন নুরুল ইসলাম।
শুধু সাইনবোর্ডটাই চেঞ্জ হচ্ছ : এসআরবি বিলের ২৭ ধারার প্রসঙ্গ তোলেন পাবনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান। র্যাবের জনবল, কার্যালয়, ক্ষমতা, নথিপত্র, সম্পদ, চুক্তি ও দায়দায়িত্ব নতুন বাহিনীতে চলে যাবে। অর্থাৎ শুধু সাইনবোর্ডটাই চেঞ্জ হচ্ছে; নতুন বোতলে পুরনো মদ। র্যাবের নাম ছাড়া আর কোনো কিছুই পরিবর্তন হচ্ছে না; সব ঠিক থাকছে।
এভাবে নথি স্থানান্তর হলে গুমসহ র্যাবের বিরুদ্ধে অতীতের অপরাধের মামলা ও তদন্ত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
র্যাবের সঙ্গে এসআরবির ‘কোনো সংস্পর্শ নেই
এদিকে এদিকে র্যাবের সঙ্গে এসআরবির কোনো সংস্পর্শ নেই বলে মন্তব্য করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করেনন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিরোধী দলের আপত্তির জবাবে তিনি বলেন, র্যাব বিলুপ্ত করা সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। বিলটি পাসে যত বিলম্ব হবে, র্যাবের অস্তিত্ব ততদিন থাকবে বলেও যুক্তি দেন। বিলটি নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি, বিরোধী দলের এমন বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেন। বিলটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে বিভিন্ন মতামত এসেছে। সংসদে উত্থাপনের পর স্থায়ী কমিটিতেও এটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিরোধী দলের নোট অব ডিসেন্টের বিষয়গুলো নিয়েও সংসদে বিস্তারিত জবাব দেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই কমিটি কোনো ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত করবে না। ইউনিটের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে বাইরের কারও অভিযোগ অথবা সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য এ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বাহিনীর কোনো সদস্য ফৌজদারি অপরাধ করলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে কোথায় রাখা হবে, জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিলেই তাকে ‘অনতিবিলম্বে’ নিকটবর্তী থানায় সোপর্দ করার কথা রয়েছে।
এত অস্ত্রশস্ত্র, এত সম্পদ কোথায় যাবে: র্যাবের সম্পদ এসআরবিতে হস্তান্তরের বিধান নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তিরও জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, র্যাবের অস্ত্র, সরঞ্জাম, গোয়েন্দা সরঞ্জামসহ বিপুল রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করে দেওয়া যায় না। এত অস্ত্রশস্ত্র, এত ইকুইপমেন্ট, এত ইন্টেলিজেন্স ইকুইপমেন্ট, এত সম্পদ, এগুলো কোথায় যাবে? কোথাও না কোথাও তো যাবে। রাষ্ট্রের সম্পদ। এসব সম্পদ হয় এপিবিএন, নয়তো নতুন সংস্থায় দিতে হবে বলে জানান তিনি।
নতুন ইউনিটের জন্য একই ধরনের সরঞ্জাম আবার কেনা হলে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হবে বলেও যুক্তি দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। নতুন সংস্থা যখন আমরা রেইজ করব, এখানে তো আবার প্রকিউরমেন্ট করার দরকার নাই। রাষ্ট্রীয় সম্পদ আমাদের রক্ষা করতে হবে।’
এসআরবিকে র্যাবের নতুন রূপ বলার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ‘র্যাব বিলুপ্ত করেছি, আজকে আইন যদি পাস হয়। তারপর একটা নতুন ব্যাটালিয়ন রেইজ করছি। সেই ব্যাটালিয়নের নাম হবে এসআরবি। র্যাবের সঙ্গে এটার কোনো সংস্পর্শ নাই।’
র্যাবের ভিত্তির অংশ বাদ দিতেই এপিবিএন আইন: এসআরবি বিল পাসের পর ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬’ বিবেচনায় নেয় সংসদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৯ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্সের একটি ধারা সংশোধন করেই পরে র্যাব গঠন করা হয়। এসআরবি আইন করার পরও পুরনো আইনে র্যাবের সেই আইনি ভিত্তি থেকে গেলে বাহিনীটির অস্তিত্ব আইনে থেকে যাবে। সে কারণেই পুরনো অর্ডিন্যান্স রহিত করে নতুন এপিবিএন আইন করা হচ্ছে বলে ব্যাখ্যা দেন তিনি।
এপিবিএনও পেল তদন্তের ক্ষমতা: জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হওয়ার পর এপিবিএন বিলটি বিবেচনার জন্য গ্রহণ করে সংসদ। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে কণ্ঠভোটে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়। নতুন আইনে পুলিশ বাহিনীর অধীনে এপিবিএন গঠন ও পরিচালনার বিধান রয়েছে। স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, পার্বত্য ব্যাটালিয়ন, বিমানবন্দর ব্যাটালিয়ন এবং সরকার নির্ধারিত অন্য ব্যাটালিয়ন এই ইউনিটের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এপিবিএনকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
ফৌজদারি কার্যবিধি ও অন্য প্রচলিত আইন মেনে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতাও থাকবে বাহিনীটির। যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া এপিবিএনের কোনো সদস্য সংবাদপত্র বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কোনো তথ্য বা দলিল প্রকাশ করতে পারবেন না। তথ্য বা দলিল প্রকাশে সহযোগিতা করাও যাবে না।
এর আগে বিলটি নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ তার বক্তব্যে বলেন, সমাজের চাহিদা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ইউনিট কিংবা বাহিনীতে পরিবর্তন আনতে হয়। সেজন্য আমরা এটা করছি। একটি সংস্থা গঠনের সঙ্গে আরেকটি বিলুপ্তির সম্পর্ক নেই। নতুন বাহিনীটা আমরা এ কারণে করছি যে, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধীন র্যাব গঠন করা হয়েছিল। সেই আইনটি পূর্ণাঙ্গ ছিল না। একটা সেকশনের অধীনে ইউনিটটি কাজ করছিল। সেজন্য আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন থেকে আমরা এটা বের করে নিয়ে এসে বিলুপ্ত করতে চাই। একইসঙ্গে এই আইনে ইংরেজিতে কিছু অস্পষ্টতা ছিল, সেই আইনটাও আমরা অনুবাদ করে নতুন আইন হিসেবে নিয়ে আসছি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









