প্রচার শব্দটি জনজীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। প্রচারের নেতিবাচক শব্দটিই হলো অপপ্রচার। রাজনীতির অঙ্গনে প্রচার আর অপপ্রচার নিয়ে রয়েছে নানা রকমের ব্যাখ্যা। নিজের বা দলের পরিপন্থি সত্য বিষয়টিও গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে তাকে বলা হয় অপপ্রচার। দেশের রাজনীতির অঙ্গনে অন্ধভক্তদের কারণে সত্যও অপপ্রচারের পরিণত হয়। আবার বিপক্ষরা অপপ্রচারটাও ধরে নেয় সত্য হিসাবে।
দেশের রাজনীতি এখন দলান্ধ সমর্থক বেষ্টিত। তাই কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা সংবাদ বা তথ্য তা বোঝা এখন কষ্টকর। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য নির্ভর সংবাদগুলোর বিষয়ে দলকানা এ রকম মন্তব্য করে। তবে প্রচার কাকে বলে জানা দরকার। প্রচার বলতে বোঝায়, কোনো নতুন সংবাদ, ধর্মীয় মতবাদ, রাজনৈতিক আদর্শ বা পণ্যের বিজ্ঞাপনকে বহু মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজকে বোঝায়। আর এই প্রচারে নির্ভুল তথ্য ও সত্যতা থাকতে হবে।
অপরদিকে 'অপপ্রচার' শব্দের অর্থ হলো অসত্য, বানোয়াট বা ভিত্তিহীন তথ্য ও গুজব উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করা। ইংরেজি পরিভাষায় একে প্রপাগান্ডা বা ডিসইনফরমেশন বলা হয়। রাজনীতিতে প্রচার হলো কোনো দল বা নেতার আদর্শ, নীতি ও কাজের সঠিক তথ্য জনগণের কাছে তুলে ধরা, আর অপপ্রচার হলো প্রতিপক্ষকে হেয় করতে বা নিজেদের স্বার্থ হাসিলে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো। যিনি প্রচার কাজটি করে থাকেন, সাধারণত তিনি সত্য ও বাস্তব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তা প্রচার করেন। তাই ধরে নেওয়া হয়, তিনি যা প্রচার করছেন তা সত্য। এই কাজটি করা হয় জনসাধারণের সমর্থন অর্জনের জন্য, এটি একটি বৈধ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যম। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহার ও লক্ষ্য জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছায়। অপরদিকে এটি পক্ষপাতদুষ্ট এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য বিকৃত করে বা গুজব ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয় অপপ্রচারের মাধ্যমে।
অপপ্রচারের মূল উদ্যেশ হলো, প্রতিপক্ষের চরিত্র হনন করা বা সামাজিক অসন্তোষ তৈরি করা। প্রচার চলে সত্য ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে, যার উদ্দেশ্য জনসাধারণকে সচেতন করা। অপপ্রচার চলে মিথ্যা ও গোপনীয় এজেন্ডার ভিত্তিতে, যার উদ্দেশ্য মানুষকে ধোঁকা দেওয়া। গণমাধ্যমে ও ফেইসবুকে প্রচারিত দুইটি ঘটনা উদাহরণ হিসাবে দিচ্ছি, এর কোনটা প্রচার আর কোনটা অপপ্রচার তা নির্নয় করাটা কঠিন। কারণ, দুটি উদাহরণ দুটি রাজনৈতিক দলের নেতার ঘটনা নিয়ে । তাই তাদের দলভুক্ত সমর্থকরা বিষয়টি দুটিকে নানা ধরনের সূচকে তুল্য করে নিজেদের নেতাকে নির্দোষ প্রমাণ করবেন। নিজ নিজ দলভক্তরা প্রচারিত ঘটনাকে অপপ্রচার বলে অভিহিত করবেন ।
(বিবিসিবংলাসহ গণমাধ্যমে সংবাদের) প্রথম ঘটনাটি হলো, হেফাজতে ইসলামের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের রয়েল রিসোর্টে জান্নাত আরা ঝর্ণা নামের এক নারীসহ অবরুদ্ধ হয়েছিলেন। মামুনুল হক শুরু থেকেই ওই নারীকে তার শরিয়তসম্মত দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি করেছিলেন। তবে, পরবর্তীকালে সেই নারী তার বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন। মামুনুল হককে কয়েক ঘণ্টা সেখানে অবরুদ্ধ করে রাখার পরে হেফাজতে ইসলামের সমর্থক এবং মাদ্রাসার ছাত্ররা পাল্টা হামলা চালিয়ে তাকে নিয়ে যায় বলে জানিয়েছিলেন সোনারগাঁও থানার তৎকালীন একজন পুলিশ কর্মকর্তা।
স্থানীয় লোকজন তখন অভিযোগ করেছিলেন, মামুনুল হক একজন নারীকে নিয়ে রিসোর্টে ঘুরতে গিয়েছেন। অন্যদিকে মামুনুল হক বলেন, তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সেখানে ঘুরতে গিয়েছেন। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কক্ষের ভেতরে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি মামুনুল হককে নানা প্রশ্ন করছে। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেন, ‘এই মহিলা কী হয় আপনার?’ জবাবে মামুনুল হক বলেন, ‘আমার সেকেন্ড ওয়াইফ। আমি তাকে শরিয়তসম্মতভাবে বিয়ে করছি।’
তখন আরেক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কবে বিয়ে করছেন?’ জবাবে মামুনুল হক বলেন, ‘দুই বছর।’ মামুনুল হক বলেন, তিনি বেড়াতে রিসোর্টে গিয়েছেন। যাই হোক, একটা পর্যায়ে এসে, আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২৪ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে নারায়ণগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালত এই ধর্ষণ মামলা থেকে মামুনুল হককে বেকসুর খালাস প্রদান করেন । অপর ঘটনাটি হলো, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখের দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় নেত্রী জলি তালুকদার ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দলীয় এক সহকর্মীর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনশনে বসেছিলেন। সেই সময় জলি তালুকদার সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক ও গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি রাত থেকে ঢাকার নয়াপল্টনে মুক্তি ভবনে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনশন শুরু করেন।
জলির অভিযোগ, ২০২০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাম গণতান্ত্রিক জোটের এক সমাবেশে যোগ দিতে সিপিবির মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি দলের ঢাকা কমিটির সদস্য, ঢাকা দক্ষিণের সমন্বয়ক জাহিদ হোসেন খানের নিপীড়নের শিকার হন। সাত মাস পর সিপিবির ঢাকা কমিটির সভায় নেওয়া এক সিদ্ধান্তের পর ওই ঘটনার বিচারের দাবিতে অনশনে বসেন তিনি। বিচার চেয়ে সিপিবির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে লেখা চিঠিতে তিনি দাবি করেন, তাকে হেনস্তার বিষয়টি আমলে না নিয়ে ওই ঘটনায় যারা প্রতিবাদ করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা সিপিবি কমিটি।
চিঠিতে জলি বলেন, পার্টি মিছিলে জাহিদ হোসেন খান আমার সঙ্গে ন্যক্কারজনক যে নিপীড়নের ঘটনা ঘটিয়েছেন, সে বিষয়ে স্পষ্টভাবে আমি আমার বক্তব্য সেই মিছিলে উপস্থিত কমরেড আব্দুল্লাহ কাফি রতনকে জানাই। জলি তালুকদার বলেন, আমি চাই না এ বিষয়ে গণমাধ্যমে কিছু প্রকাশ হোক। এটা আমাদের দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ফেইসবুকে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়া প্রসেঙ্গ তিনি বলেন, আমি অনেককেই নিষেধ করেছি ফেইসবুকে এ বিষয়ে কিছু না জানাতে। কয়েকজনকে ফেইসবুক পোস্ট সরিয়ে দিতেও বলেছি। অভিযুক্ত জাহিদ হোসেন খান বলেন, আমার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। ঘটনা যেখানে ঘটেছে, সেখানে সিসিটিভি ফুটেজ আছে। সেই ফুটেজ দেখলেই বোঝা যাবে। ঘটনার দিন আমাদের কর্মীরা অনেকেই ছবি তুলেছেন মিছিলের।
দুটি ঘটনাই বেশ আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছে। গণমাধ্যম প্রকাশ করেছে তথ্যনির্ভর সংবাদ। সুতরাং এই বিষয় দুটি কি প্রচার না অপপ্রচার। দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলেই খোঁজ নিলে এমন সব ঘটনা পাওয়া যাবে। এখানে এই দুইটি দলের ঘটনাকে উদাহরণ হিসাবে আনা হয়েছে এই কারণে, এই দল দুটি নিজেদেরকে খুবই পরিশোধিত ও বিশুদ্ধ দাবি করে।
তাছাড়া অনেক রাজনৈতিক দল আছে যারা সত্য কোনো কিছু প্রচার হলে তাকে অপপ্রচার বলে চালিয়ে দেন। আবার যারা যখন ক্ষমতায় থাকেন। তখন তারা গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে সত্য বিষয়টি আর কেউ জানে না। যদি কোনো কারণে সত্য বিষয়টি প্রচারিত হয়ে যায় তখন তারা বলেন এটা অপপ্রচার। আবার এটাও দেখা যায়, প্রচারিত সংবাদ সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে- ভাবমূর্তি বিনষ্টের জন্য এরকম সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে। তাই কোনটা প্রচার আর কোনটা অপপ্রচার তা বোঝাই মুশকিল।
লেখক : কলামিস্ট।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









