বাংলাদেশ ও হংকংয়ের মধ্যে বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সুরক্ষা চুক্তি (আইপিপিএ) নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরকে সাফল্যের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটিকে সম্ভাবনার শুরু হিসেবেই দেখতে হবে। কারণ, বিদেশি বিনিয়োগ আসে কাগজে স্বাক্ষরের কারণে নয়; আসে বিনিয়োগকারীর আস্থা, নীতির স্থিরতা, অবকাঠামোর সক্ষমতা এবং ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ দেখে। হংকং বাংলাদেশের সপ্তম বৃহত্তম বিনিয়োগ উৎস।
গত পাঁচ বছরে সেখান থেকে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের এফডিআই এসেছে। শুধু ২০২৫ সালেই এসেছে ১২২ মিলিয়ন ডলার। এই পরিসংখ্যান দেখায়, বাংলাদেশের প্রতি হংকংয়ের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আছে। নতুন আইপিপিএ সেই আগ্রহকে আরো বাড়াতে পারে। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- বাংলাদেশ কি সেই বিনিয়োগ গ্রহণের জন্য প্রস্তুত?
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক। অথচ এই খাত এখন এমন এক বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্যে রয়েছে, যেখানে শুধু সস্তা শ্রম দিয়ে টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, অটোমেশন, পরিবেশবান্ধব কারখানা, কৃত্রিম তন্তু, উচ্চমূল্যের পোশাক, দ্রুত সরবরাহ এবং ব্র্যান্ডভিত্তিক বাজারে প্রবেশ- এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ছাড়া বাংলাদেশের পোশাক খাতের পরবর্তী ধাপে ওঠা কঠিন। এখানেই হংকংয়ের বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা।
হংকং শুধু পুঁজি নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে শক্তিশালী সংযোগ, ব্যবসায়িক দক্ষতা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের অভিজ্ঞতাও দিতে পারে। ফলে নতুন চুক্তিকে বাংলাদেশের পোশাক ও বস্ত্র খাতের প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো দরকার। কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগকারীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে একই সঙ্গে যদি বিদ্যুৎ-গ্যাসের অনিশ্চয়তা, জমি পাওয়া নিয়ে জটিলতা, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, করব্যবস্থার অনিশ্চয়তা, কাস্টমসের জটিলতা এবং নীতির ঘন ঘন পরিবর্তনের মুখোমুখি করা হয়, তাহলে কোনো চুক্তিই প্রত্যাশিত ফল দেবে না।
বিনিয়োগ সুরক্ষার চুক্তি যতই ভালো হোক, বিনিয়োগের পরিবেশ অনিরাপদ বা ব্যয়বহুল হলে বিনিয়োগকারী বিকল্প গন্তব্য বেছে নেবেন। বাংলাদেশের বিনিয়োগনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখানেই- আমরা প্রায়ই চুক্তি, সমঝোতা ও সম্মেলনকে অর্জন হিসেবে তুলে ধরি; কিন্তু বিনিয়োগকারীর জন্য বাস্তবে কতটা সহজ পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি, সেই প্রশ্নটি আড়ালে থেকে যায়।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের নামে দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতার বাইরে ঠেলে দেওয়া যাবে না। বরং বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে স্থানীয় শিল্পের সংযোগ তৈরি করতে হবে। বিদেশি কোম্পানি স্থানীয় কাঁচামাল, সেবা ও দক্ষ জনবল ব্যবহার করলে বিনিয়োগের বহুমুখী সুফল দেশের অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে। প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তরের শর্তও নীতিতে যথাযথ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর ক্ষেত্রেও এ চুক্তি ভূমিকা রাখতে পারে- তবে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে না।
বিনিয়োগ যদি মূলত আমদানিনির্ভর উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে। বরং রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। হংকংয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশি পণ্যকে নতুন বাজারে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নিতে হবে। এ জন্য সরকারের কাজ শুধু বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন কিংবা বিদেশি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করা নয়। প্রকৃত কাজ হলো বিনিয়োগকারীর জন্য এক দরজার কার্যকর সেবা নিশ্চিত করা, অনুমোদনের সময় কমানো, কর ও শুল্কনীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়ানো, চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দেওয়া এবং বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ-হংকং আইপিপিএকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সাফল্যের খাতায় তুলে রাখলে চলবে না। এটিকে একটি কর্মপরিকল্পনায় রূপ দিতে হবে। হংকংয়ের বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ আহ্বান, দ্রুত অনুমোদন, নির্দিষ্ট প্রকল্পভিত্তিক সহায়তা এবং বিনিয়োগ-পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ-হংকং বিনিয়োগ চুক্তি- ভালো খবর। কিন্তু আসল খবর হবে তখনই, যখন চুক্তির সুফলে নতুন বিনিয়োগ আসবে, নতুন কারখানা হবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, প্রযুক্তি আসবে এবং বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়বে। বাংলাদেশের সামনে সুযোগটি বড়। এখন প্রয়োজন শুধু সুযোগের কথা বলা নয়- সুযোগটি কাজে লাগানোর মতো রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা দেখানো। আইপিপিএ যেন আরেকটি স্বাক্ষরিত দলিল হয়ে ফাইলবন্দি না হয়; বরং তা হয়ে উঠুক বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি, উৎপাদনশীল ও রপ্তানিমুখী বিনিয়োগ আনার কার্যকর হাতিয়ার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









