"গ্যাসের দেখা নেই, তাই ভরসা করা হয়েছিল বিদ্যুতের ওপর। কিন্তু এখন বিদ্যুৎও হাওয়া!" রান্নাবান্না থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজকর্ম—সবখানেই এখন হাহাকার। গ্যাসের তীব্র সংকটে বিকল্প হিসেবে যারা বৈদ্যুতিক ইন্ডাকশন বা রাইস কুকারের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছিলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে তারাও পড়েছেন চরম বিপাকে। ভোগান্তিতে পড়া সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রকাশ করে শিরিন নামের একজন ভুক্তভোগী বলেন, "গ্যাসের দুঃখে বাধ্য হয়ে বিদ্যুতে গেলাম, এখন বিদ্যুৎও নেই। যাবো কোথায়?"
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দিন ধরেই গ্যাসের চাপ কম। অনেক জায়গায় সারাদিনও মিলছে না গ্যাস। এর ওপর দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিং আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। বাসা-বাড়িতে সকালের নাশতা বানানো কিংবা দুপুরের রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও রোগীদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন গৃহিণীরা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই সমন্বয়হীনতায় ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে। তাদের মতে, কোনো একটি সেবার ঘাটতি তৈরি হলে বিকল্প সেবার সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ—দুটি সেবারই এমন বেহাল দশা জনজীবনকে পুরোপুরি স্থবির করে তুলেছে। দ্রুত এই সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দুর্ভোগ আরো চরমে পৌঁছাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটে রান্নাঘরে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি। দিনের পর দিন চুলায় আগুন না জ্বলায় বিকল্প হিসাবে বৈদ্যুতিক চুলার দিকে ঝুঁকছে হাজারো পরিবার। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে ইলেকট্রিক ও ইনডাকশন চুলার বিক্রি বেড়েছে কয়েক গুণ। বিক্রেতারা বলছেন, গ্যাসের অনিশ্চয়তার কথা বিবেচনা করে অনেকেই স্থায়ী বিকল্প হিসাবে আগেভাগেই বৈদ্যুতিক চুলা কিনে রাখছেন।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, সম্প্রতি বৈদ্যুতিক ও ইনডাকশন চুলার বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাসের চাপ কম থাকে বা একেবারেই গ্যাস পাওয়া যায় না, সেসব এলাকার ক্রেতাদের উপস্থিতিই বেশি। অনেকেই গ্যাসের চুলার পাশাপাশি একটি বৈদ্যুতিক চুলা কিনছেন, যাতে গ্যাস না থাকলেও রান্নার কাজ ব্যাহত না হয়।
সকাল ৭টা বাজলেই রাজধানীর মিরপুর এলাকায় একটি বাসায় দিনের রান্না শুরু করেন গৃহকর্মী ফাতেমা। কিন্তু গ্যাসের চুলা জ্বালানোর চেষ্টা করেও কোনো কোনো দিন সম্ভব হয় না। দিনের বেশিরভাগ সময় পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে চুলা জ্বালানো কঠিন, কখনো আবার গ্যাস থাকেই না। ফলে রান্না চালিয়ে নিতে তাই বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের দিকে ঝুঁকেছেন ওই বাসার কর্তা।
গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় ৭ হাজার ৫০০ টাকা খরচ করে একটি ইনফ্রারেড কুকার কিনেছেন পরিবারটি। সঙ্গে কিনেছেন রাইস কুকারও। অথচ গ্যাস সংকটের আগে এসব যন্ত্র তাদের রান্নাঘরে খুব একটা প্রয়োজনই হতো না। রাজধানীর শেখেরটেক এলাকায় ভাড়া থাকেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী বিশ্বজিৎ বিশ্বাস। তাঁর বাসায় লাইনের গ্যাস ব্যবহার হয়। বিশ্বজিৎ বিশ্বাস বলেন, বাসার লাইনে কোনো গ্যাস নেই। এ কারণে তিন দিন ধরে রান্না বন্ধ।
গ্যাসের চাপ কবে ঠিক হবে নিশ্চয়তা নেই। তাই নিরুপায় হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছি। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নবীনগর এলাকার বাসিন্দা ইরফান ও লায়লা দম্পতির বাসায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহার করেন। গত মঙ্গলবার দুপুরে তাঁর বাসায় সিলিন্ডারে থাকা গ্যাস শেষ হয়ে যায়। এরপর দুই দিন মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডির কয়েকটি এলাকায় এলপিজির সিলিন্ডার খুঁজেও কিনতে পারেননি। পরে বৃহস্পতিবার সকালে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের একটি দোকান থেকে বৈদ্যুতিক চুলা কেনেন তিনি। লায়লা বলেন, দুই দিন ধরে বাসায় কোনো রান্নাবান্না নেই। বাইরে থেকে খাবার এনে খাচ্ছি। এ জন্য বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনে এনেছি।
আমার বাসায় দুই মাসে তিনটা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এর সিলিন্ডার ক্রয় করতে হয়। হিসেব করে দেখলাম গ্যাস সিলিন্ডারের পাশাপাশি ইনফ্রারেড বা বৈদ্যুতিক চুলা রাখলে গ্যাসের খরচটা একটু কমবে। কারণ এধরনের চুলায় বিদ্যুৎ বিল গ্যাস খরচের তুলনায় কম আসবে ভেবেই বৈদ্যুতিক চুলা ক্রয়ের কথা ভেবেছি । কিন্তু তাতেও মিলছে না রান্নারঘরের স্বস্থি। রাইস কুকারে ভাত রান্না করতে গেলেই বিদ্যুৎ বিভ্রাট । কখনো কখনো এমন হচ্ছে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় রান্না করা ভাত এত নরম হচ্ছে যে সেই ভাত আর খাওয়া যাচ্ছে না।
শুধু মিরপুর, আদাবর ও মোহাম্মদপুরের ওই বাসাগুলো নয়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অনেক পরিবারকেই এখন একই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দিনের বেলা দীর্ঘ সময় গ্যাসের চাপ কম থাকায় পাইপলাইনের গ্যাসে অভ্যস্ত পরিবারগুলোকে রান্নার বিকল্প ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। আর তাতে বাড়ছে বাড়তি খরচও।তাছাড়া এদিকে বিদ্যুতের বিল বেশি দিয়েও মিলছে না রান্নার জন্য বিদ্যুৎ। বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করতে গেলেই লোডশেডিংয়ের বিপর্যয়।
গত ২২ জুলাই দেশের ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) থেকে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের পর এই সংকট শুরু হয়। এতে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) এলএনজি সরবরাহ কমে যায়, যা মোট সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ। এর প্রভাব পড়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায়। দিনের বেলায় বহু বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কমে যায়। এই সংকটে বৈদ্যুতিক রান্নার সরঞ্জামের বাজারে তৈরি হয়েছে বাড়তি চাহিদা।
অবশ্য পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপরেশন) প্রকৌশলী মোঃ শোয়েব বলেছেন, আগামী সপ্তাহ থেকে গ্যাস সরবরাহ পুর্বের অবস্থায় ফেরানোর চেষ্টা চলছে। ২১ জুলাই সংকটের আগে দৈনিক ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হলেও এখন ২ হাজার ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সহসা ২১ জুলাইয়ের আগের পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করার কোন পথই খোলা নেই। আমদানি পূর্বের অবস্থানে ফিরলেও দেশীয় উৎপাদন পূর্বের অবস্থায় ফেরার কোন সুযোগ নেই। ২১ জুলাই দেশীয় উৎসের গ্যাস সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৬৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট, যা এখন ১ হাজার ৬২০ মিলিয়নে নেমে এসেছে। মজুদ কমে যাওয়ায় প্রতিদিনেই কমছে উৎপাদন।
রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় লাইনের গ্যাসেও চাপ কম। অনেক এলাকায় দিনে লাইনে কোনো গ্যাসই থাকছে না। এমন বাস্তবতায় হঠাৎ বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলার বেচাকেনা। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, দেশে বৈদ্যুতিক কুকারের বার্ষিক বাজার ২০০ কোটি টাকারও কম। তবে সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটে বিশেষ করে ইনফ্রারেড ও রাইস কুকারের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বৈদ্যুতিক কুকারের বাজারে রয়েছে কয়েকটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে আরএফএল, ওয়ালটন ও কিয়াম দেশে বৈদ্যুতিক কুকার তৈরি করে। এ ছাড়া অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান আমদানি করা কুকার বাজারজাত করে। দেশের বাজারে ওয়ালটন, ভিশন, ভিগো, কিয়াম, গাজী, মিয়াকো ও ফিলিপসের বৈদ্যুতিক কুকার পাওয়া যায়। নোভা ও প্রেস্টিজও এ বাজারে আছে। সাধারণত ইনফ্রারেড কুকারের দাম ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে। তবে উন্নত বা প্রিমিয়াম মডেলের দাম আরও বেশি।
রাজধানীর ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, রিংরোড, শ্যামলী, শেওড়াপাড়ার বেশ কয়েকটি দোকানে ঘুরে দেখেন এই প্রতিবেদক। এর মধ্যে কিছু দোকান ও বিক্রয়কেন্দ্রে (শোরুম) মজুত বৈদ্যুতিক চুলা বিক্রি শেষ হয়ে গেছে। তারা কোম্পানির কাছে নতুন করে চাহিদা দিয়েছে। আর বাকি দোকান ও বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বৈদ্যুতিক চুলা বিক্রি হয়েছে।
বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে দিনে যেখানে ৪ থেকে ৫টি বৈদ্যুতিক চুলা বিক্রি হতো, এখন সেখানে ১৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি চাহিদা ১ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকার ইলেকট্রিক ও ইনডাকশন চুলার। তবে উন্নত মানের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা মূল্যের চুলাও বিক্রি হচ্ছে। অনেক ক্রেতা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা বিবেচনা করে তুলনামূলক ভালো মানের পণ্যই বেছে নিচ্ছেন।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের সংকট যতদিন থাকবে ততদিন বৈদ্যুতিক ও ইনডাকশন চুলার চাহিদা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রান্নার কাজে বিকল্প প্রযুক্তির ব্যবহারও ধীরে ধীরে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেক কোম্পানি বাজারে ইলেকট্রিক চুলা আনছে। বিক্রিও ভালো হচ্ছে।
রাজধানীর নবাবপুর এলাকার একটি শোরুমে ইনডাকশন চুলা কিনতে আসা আঁখি আক্তার বলেন, আমি নাজিরাবাজার এলাকায় থাকি। কয়েক বছর ধরেই আমাদের এলাকায় গ্যাসের তীব্র সমস্যা। রান্না করতে প্রায়ই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তাই পরিবারের প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী ইনডাকশন চুলা কিনতে এসেছি। একটি পছন্দও হয়েছে। কিনে বাড়ি ফিরব।
রামপুরার একটি শোরুমে ইলেকট্রিক চুলা কিনতে আসা আমিনুল ইসলাম বলেন, গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার চেয়ে প্রয়োজনের সময় বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করা অনেক বেশি সুবিধাজনক। বিদ্যুতের বিল কিছুটা বাড়লেও পরিবারের স্বাভাবিক রান্নাবান্না চালিয়ে নিতে এটি কার্যকর সমাধান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যেসব কোম্পানি হোম অ্যাপ্ল্যায়েন্স পণ্য তৈরি করে, তাদের প্রায় সবারই বৈদ্যুতিক চুলা রয়েছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ওয়ালটন, ভিশন, ভিগো, কিয়াম, গাজী, মিয়াকো, ফিলিপস প্রভৃতি ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলা বেশি বিক্রি হয়। এর বাইরে নোভা, প্রেস্টিজসহ বেশ কিছু অপরিচিত ও নন-ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলাও বাজারে পাওয়া যায়। নন-ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলা রাজধানীর গুলিস্তানে স্টেডিয়াম মার্কেট, মিরপুর ১ সহ কয়েকটি এলাকায় বেশি পাওয়া যায়।
বিক্রেতারা জানিয়েছেন, ইন্ডাকশন চুলার চেয়ে ইনফ্রারেড চুলার দাম কিছুটা বেশি। তবে দুটোই মোটামুটি সাড়ে তিন হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা দামে কেনা যায়। অবশ্য এর চেয়ে বেশি দামের বৈদ্যুতিক চুলা রয়েছে। নন-ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলার দামও কাছাকাছি বা এর চেয়ে ৩০০-৪০০ টাকা কম। তবে এখন চাহিদা বেশি থাকায় পরিচিত ব্র্যান্ডের চুলার কাছাকাছি দামেই নন-ব্র্যান্ডের চুলা বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কোনো কোনো বিক্রেতা সুযোগ বুঝে ২০০-৪০০ টাকা বাড়তি দাম চাইছেন।
বিক্রেতারা জানিয়েছেন, বাজারে ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড—এই দুই ধরনের বৈদ্যুতিক চুলা রয়েছে। এর মধ্যে ইনফ্রারেড চুলার চাহিদা বেশি। মোহাম্মদপুরের এইচআর ইলেকট্রনিকসের স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান বলেন, গ্যাস না থাকায় অনেকে বাধ্য হয়ে এই চুলা কিনছেন। আবার অনেকে বিকল্প চুলা হিসেবে এটি ব্যবহার করেন।
তারা আরও বলেন, অনেকে ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড চুলার পার্থক্য স্পষ্টভাবে জানেন না। ইন্ডাকশন চুলা সরাসরি তাপ তৈরি করে না; এটি তড়িৎ চুম্বকীয় আবেশ নীতিতে কাজ করে। চুলার ভেতরের তামার কয়েল বিদ্যুৎ প্রবাহে পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি করে। এতে পাত্রের তলদেশে ঘূর্ণি তড়িৎ প্রবাহ তৈরি হয়। ফলে তাপ সরাসরি পাত্রেই তৈরি হয় এবং চুলার কাচের উপরিভাগ তুলনামূলকভাবে গরম হয় না। অন্যদিকে ইনফ্রারেড চুলায় হ্যালোজেন বা ইনফ্রারেড হিটারের মতো শক্তিশালী হিটিং উপকরণ সরাসরি তাপ উৎপন্ন করে। এই উপকরণ গরম হয়ে ইনফ্রারেড বিকিরণ ছড়ায়, যা সূর্যের আলোর মতো পাত্রকে গরম করে। এটি মূলত পুরোনো ইলেকট্রিক কয়েল চুলার আধুনিক রূপ, যেখানে তাপ সরাসরি স্থানান্তরিত হয়। ফলে চুলা চালু হলে উপরিভাগের কাচের প্লেট লাল হয়ে যায় এবং সেখান থেকেই তাপ বিকিরণ ঘটে।
দুই চুলার মধ্যে ইনফ্রারেড চুলার চাহিদা বেশি। কারণ, এই চুলায় যেকোনো ধরনের পাত্রে রান্না করা যায়। বিপরীতে ইন্ডাকশন চুলায় রান্না করতে হলে শুধু নির্দিষ্ট আকারের ফেরোম্যাগনেটিক পাত্র, যেমন লোহার তৈরি পাত্র, কাস্ট আয়রন বা বিশেষ ধরনের স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা যায়। অ্যালুমিনিয়াম, তামা, কাচ বা সিরামিকের পাত্র এতে কাজ করবে না। ইন্ডাকশন চুলা প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত তাপীয় দক্ষতা প্রদান করে, যা গ্যাস চুলার চেয়ে বেশি। এর ফলে খুব দ্রুত পানি ফোটানো বা খাবার গরম করা যায়। এতে রান্নার সময় কিংবা বিদ্যুৎ খরচও কম লাগে। পাত্র সরিয়ে নিলে চুলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
বেচাকেনা বাড়ার কথা জানিয়েছে কোম্পানিগুলোও। দেশে ভিশন ও ভিগো ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলা বানায় প্রাণ গ্রুপ। আরএফএলের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মুর্শিদ মুনিম বলেন, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ইনফ্রারেড কুকারের চাহিদা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। আর রাইস কুকারের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ শতাংশ। মানুষ গ্যাসের চুলা থেকে বৈদ্যুতিক কুকারের দিকে যেতে শুরু করেছে বলেন তিনি। ইনফ্রারেড কুকারের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো এতে বাসায় থাকা সাধারণ হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহার করা যায়।
অন্যদিকে ইনডাকশন কুকারের জন্য বিশেষ ধরনের হাঁড়ি ও প্যান প্রয়োজন হয়। ফলে ইনডাকশন কুকারের চাহিদা তুলনামূলক ধীরে বেড়েছে বলে জানান মুর্শিদ। তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় আরএফএল তাদের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০০ শতাংশ বাড়িয়েছে। কিন্তু চাহিদা তার চেয়েও দ্রুত বাড়ায় বাজারে উল্লেখযোগ্য সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ওয়ালটন হোম অ্যাপ্লায়েন্সেসের প্রধান ব্যবসায়িক কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ-আল-জুনায়েদ বলেন, গ্যাস সংকট ও সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তাদের বৈদ্যুতিক কুকারের চাহিদা সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। চাহিদা স্পষ্টভাবেই বাড়ছে। ভোক্তারা বিকল্প খুঁজছেন। আর বৈদ্যুতিক কুকার সেই বিকল্প হিসেবে নির্ভরযোগ্য সমাধান দিচ্ছে বলেন তিনি। আবদুল্লাহ জানান, ওয়ালটনের ১২ থেকে ১৫ ধরনের ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড কুকার রয়েছে। এসব কুকারের দাম ৩ হাজার ৭৯০ থেকে ৫ হাজার ৭৯০ টাকার মধ্যে।
কিয়াম মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিয়ার রহমান হায়দার বলেন, গ্যাস সংকট তাদের বৈদ্যুতিক কুকারের বিক্রিতে তেমন কোনো প্রভাব ফেলেনি। আমাদের বিক্রি কমবেশি আগের মতোই আছে বলেন তিনি। কিয়ামের ব্যবসার খুব সামান্য অংশ বৈদ্যুতিক সরঞ্জামনির্ভর। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পণ্যের মধ্যে রয়েছে প্রেসার কুকার, ফ্রাই প্যান, ক্যাসেরোল, অ্যালুমিনিয়ামের পণ্য ও হটপট। এসব পণ্যের বাজারই আমাদের জন্য অনেক বড় বলেন হায়দার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









