জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) মোহাম্মদপুরের ‘দোলনচাঁপা ও কনকচাঁপা’ আবাসন প্রকল্পে দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রকল্পের কাজ চলমান থাকাবস্থায় প্রথম সংশোধনীতেই লিফট, সাব-স্টেশন, জেনারেটরসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একই চেয়ারে টানা ২০ বছর ধরে বহাল থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম) মো. মিরাজ হোসেন ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে এই হরিলুট চালিয়ে যাচ্ছেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিদেশ সফরের ‘টোপ’ খাইয়ে নিজের চেয়ার চিরস্থায়ী করে রেখেছেন।
সূত্রমতে, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মোহাম্মদপুর এলাকায় দুটি ফ্ল্যাট প্রকল্প চলমান রয়েছে। দোলনচাঁপা-কনকচাঁপা নামে এ প্রকল্পে ৪৩০টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের অনুমোদিত প্রথম সংশোধনীতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি লিফট কেনার জন্য যে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, সেখানে ৩১ কোটি টাকা বেশি খরচ করা হচ্ছে। এ কেনাকাটার জন্য যেসব কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হবে ইতোমধ্যে সেগুলোও ঠিক করা হয়েছে।
শুধু লিফট নয়, এ প্রকল্পে ইএম বিভাগের আওতায় জেনারেটর, অগ্নিনিরোধক ব্যবস্থাপনা, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশনসহ অন্যান্য কেনাকাটায়ও অনুমোদিত দরের চেয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বেশি খরচ করা হচ্ছে। এ কাজের সঙ্গে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী (ইএম) মো. মিরাজ হোসেন জড়িত বলে জানা যায়।
জানা গেছে, ঢাকার মোহাম্মদপুর হাউজিং এস্টেটের আসাদ এভিনিউতে (গৃহায়ন কনকচাঁপা) ও সাত মসজিদ রোডে (গৃহায়ন দোলনচাঁপা) প্রকল্পটির মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৪৬৯ কোটি ১৯ লাখ ১১ হাজার টাকা। প্রথম সংশোধনীতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪১ কোটি ২১ লাখ ৮২ হাজার টাকা। অর্থাৎ সংশোধনীতে প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৭২ কোটি ৩ লাখ টাকা, যা মূল ব্যয়ের প্রায় ১৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। তবে বৃদ্ধি পাওয়া মূল প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৭২ কোটি টাকার মধ্যে কেবল লিফট কেনা বাবদই বাড়ানো হয়েছে ৩১ কোটি ৭৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। অথচ মূল প্রস্তাবে লিফট কেনার ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭ কোটি ২০ লাখ ৮৭ হাজার টাকা, যা সংশোধিত প্রস্তাবে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৮ কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
বৈদ্যুতিক অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন সংখ্যা ১০টি থেকে ৮টিতে নামালেও ব্যয় ৬ কোটি ১০ লাখ ৯৪ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮ কোটি ৩৯ লাখ ১১ হাজার টাকা। বৃদ্ধি ২ কোটি ২৮ লাখ ১৭ হাজার টাকা। একইভাবে বৈদ্যুতিক জেনারেটর ১০টি থেকে ৮টিতে নামলেও ব্যয় ২ কোটি ৯১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪ কোটি ৭৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। এ খাতে বাড়তি ব্যয় ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। বৈদ্যুতিক পাম্প-মোটর মূল প্রস্তাবে প্রতি সেট ৮ লাখ ৩০ হাজার করে ধরা হলেও, সংশোধনীতে প্রতি সেটের দাম ধরা হয়েছে ১১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা।
ফলে এই খাতে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬৬ লাখ ২১ হাজার টাকা। নির্মাণ প্রকল্পটির নিরাপত্তাসংক্রান্ত অগ্নিনিরোধক ব্যবস্থাপনা খাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। এ খাতে মূল ব্যয় ছিল ৬ কোটি ৫০ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। সংশোধনীতে জব সংখ্যা ১০টি থেকে কমিয়ে ২টি করলেও ব্যয় বাড়িয়ে ৯ কোটি ৮২ লাখ ১৭ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ বৃদ্ধি ৩ কোটি ৩১ লাখ ৩২ হাজার টাকা। ফোর্স ভেন্টিলেশন খাতে ব্যয় ৪৮ লাখ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৯ হাজার টাকা। এ খাতেও অতিরিক্ত ব্যয় বেড়েছে ১ কোটি ৪৫ লাখ ৯ হাজার টাকা।
কনকচাঁপা ভবন-১ এ ফ্ল্যাট রয়েছে ৩০টি, ভবন-২-এ ১০৪টি, ভবন-৩ এ ৬৫টি এবং ভবন-৪ এ ৭৮টি ফ্ল্যাট। মোট ২৭৭টি। অন্যদিকে দোলনচাঁপা ভবন-১ এ ১৮টি, ভবন-২ এ ৯৪টি, ভবন-৩ এ ১৮টি এবং ভবন-৪ এ ২৬টি মোট ১৫৩টি। অর্থাৎ, কনকচাঁপা-দোলনচাঁপায় মোট ৪৩০টি ফ্ল্যাট। প্রসপেক্টাসের নির্দেশনা অনুযায়ী পূর্বে বসবাসদের জন্য নির্ধারিত ছিল ২৫৩টি আর সংরক্ষিত, গ্রেডেশন ও লটারির মাধ্যমে বরাদ্দকৃত ১৬৪টি। বাকি ১৩টি অবশিষ্ট থাকবে সেগুলো সাধারণ নাগরিকের কাছ থেকে আবেদন সংগ্রহ করে বিক্রি করবে জাগৃক। এ প্রকল্পে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের জন্য নির্ধারিত কোটা ছিল ১৬টি। সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৭টি। আর কোটার ১৬টির মধ্যে জাগৃকের কর্মকর্তা-কর্মচারী পেয়েছেন মাত্র ছয়টি। বাকি ১১টি অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা ভাগবাটোয়ারা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘ম্যানেজ মাস্টার’ খ্যাত প্রকৌশলী মিরাজ একই চেয়ারে ২০ বছর
সরকার আসে সরকার যায়, প্রকৌশলী মিরাজ থাকেন বহাল তবিয়তে। ২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর যে বিভাগে বসেছেন আজও সেখানেই আছেন। নির্বাহী প্রকৌশলীর চেয়ারে বসে গত দেড় যুগে ঢাকাসহ সারাদেশে কমপক্ষে ৩০টি প্রকল্পের ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যালের সব কেনাকাটা করেছেন এই মিরাজ। যার সবগুলোতেই উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) থেকে অনেক বেশি টাকা ব্যয় দেখান তিনি। সেই টাকা ঠিকাদারদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বপ্ননগর আবাসিক প্রকল্প-১, ২, মিরপুর ৩৬০ ফ্ল্যাট প্রকল্প, লালমাটিয়া ৮৮ ফ্ল্যাট প্রকল্প, লালমাটিয়া ৫৪ ফ্ল্যাট প্রকল্প, লালমাটিয়া অফিসার্স কোয়ার্টার, লালমাটিয়া বাণিজ্যিক মার্কেট, যশোর বাণিজ্যিক প্রকল্প, মিরপুর গ্রেনেড হামলা প্রকল্প, চট্টগ্রামে ৫টি ফ্ল্যাট প্রকল্প, কক্সবাজার ফ্ল্যাট প্রকল্প, বগুড়া ফ্ল্যাট প্রকল্প, দিনাজপুর ফ্ল্যাট প্রকল্প, সেগুনবাগিচা গৃহায়ন ভবন, যশোর ফ্ল্যাট প্রকল্পেও ইলেক্ট্রো ম্যাকানিক্যাল বিভাগে কেনাকাটায় পিপিআর (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস) মানা হয়নি।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলেন, সর্বশেষ যশোর বাণিজ্যিক প্রকল্পেও ১০ কোটি টাকার লিফট ১৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় কিনে আলোচনায় এসেছেন তিনি। কিন্তু ‘ম্যানেজ মাস্টার‘ খ্যাত মিরাজ হোসেনের চেয়ার নড়ে না। এর বড় কারণ-লিফট কেনাকাটায় কৌশলী মিরাজ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, সদস্য ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের টোপে ফেলেন। এরপর এসব কর্মকর্তাকে ইচ্ছেমাফিক ডলার দিয়ে একটি সার্থক প্রমোদভ্রমণ দেওয়ার পর আর কেউ মিরাজ প্রশ্নে শব্দ করেন না।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ডলার সংকটের কারণে ব্যয়সংকোচন নীতির অংশ হিসেবে সরকার অর্থ ব্যয়ে কড়াকড়ি আরোপ করার সময়ও থেমে থাকেনি বিদেশ সফর। গৃহায়নের দুটি প্রকল্পে ৯ জন ভ্রমণ করেছে। লিফট কেনার নামে মিরপুরে (স্বপ্ননগর-২) ১৪ তলা আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদার প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের অর্থে প্রকৌশলী মিরাজ হোসেনসহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিদেশ ঘুরে এসেছেন। ৮৮টি আবাসিক ফ্ল্যাট ও কর্মচারীদের জন্য ৫৪টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদার ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের টাকায় বেশ কয়েকজন সুইজারল্যান্ড সফর করেছেন। এসব কারণে সবার বদলি হলেও মিরাজ হোসেনের বদলি হয় না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম ডিভিশন) মো. মিরাজ হোসেন দৈনিক এদিনকে বলেন, “আমাদের ডিভিডিপিতে ধরা ছিল ‘বি’ ক্যাটাগরি লিফট। পরে মন্ত্রণালয়ের স্ট্যান্ডিং কমিটি সিদ্ধান্ত দেয় ‘এ’ ক্যাটাগরির লিফট ধরতে হবে। পিডব্লিউডির শিডিউল অনুযায়ী আমরা ‘এ’ ক্যাটাগরির লিফট ধরেছি। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ধরা ক্যাটাগরির লিফট, যেগুলোর দাম এত বেশি– অর্থাৎ ডাবলের বেশি। পিডব্লিউডি শিডিউলের পরিবর্তন করে যে নতুন শিডিউল, যে দর হয়েছে সেটাই ধরেছি।
দুর্নীতির সুযোগ নেই জানিয়ে তিনি আরো বলেন, মিনিস্ট্রিতে সমন্বয় সভা হয়। এ প্রকল্পের পিডি আছেন, আমার অধীনস্থ লোকজন আছেন, আমার হাই অফিসাররা আছেন। এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।” দীর্ঘদিন এক পদে বহালের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাকে দেবে কোথায়, যাওয়ার তো জায়গা নাই!’
উল্লেখ্য, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) মোহাম্মদপুর হাউজিং এস্টেটের আসাদ এভিনিউয়ে (গৃহায়ন কনকচাঁপা) ও সাত মসজিদ রোডের ডি-টাইপ কলোনিতে (গৃহায়ন দোলনচাঁপা) ৪৩০টি আবাসিক ফ্ল্যাট প্রকল্পের কাজ চলমান। এ প্রকল্পে অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা ১৯৬০ সাল থেকে বসবাসকারী বাসিন্দাদের। কিন্তু আওয়ামী লীগের শাসনামলে সরকারি দলের দাস হিসেবে পরিচিত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন কর্মকর্তা, জাগৃকের চেয়ারম্যান ও কর্মকর্তারা নিজেদের পছন্দমতো ফ্ল্যাট ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগের সাবেক নেতা, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ের তার আস্থাভাজন কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগের স্বার্থ রক্ষাকারী কর্মকর্তাদের এ প্রকল্পের ফ্ল্যাট দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে। উপরন্তু অধিকাংশ কর্মকর্তা রাজউকের অন্যান্য প্রকল্পে প্লট/ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাওয়ার পরও তথ্য গোপন করে নীতিমালা ভেঙে এ প্রকল্পে ফ্ল্যাট বাগিয়ে নিয়েছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









