চলমান হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত সারাদেশে এক কোটি ৯৭ লাখ ৭১ হাজার ৭২০ জন শিশু টিকা নিয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার থেকে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। দেশজুড়ে এই টিকা কর্মসূচি পালনের পরও শিশুদের হামের সংক্রমণ কমছেই না। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আটজনসহ মাত্র ছয়মাসেই ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত হাম রোগ ও উপসর্গে প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩০ জনে। তবে, আল জাজিরার বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু জাতীয় পর্যায়ে কত শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে—এই হিসাব দিয়ে হাম নিয়ন্ত্রণের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে ডেঙ্গুর প্রকোপও ঠেকেছে রেকর্ড হারে। এর মধ্যে, ডেঙ্গুতে এ বছর একদিনে সর্বোচ্চসংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছে গতকাল সোমবার। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৭৩৩ জন। একই সময়ে মারা গেছেন আটজন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৭ জনে। এ বছর এক দিনে এত বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তির তথ্য এই প্রথম পাওয়া গেল, যাদের নিয়ে এ পর্যন্ত আক্রান্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৫৭০ জনে। এর আগে গত ৮ সেপ্টেম্বর নয়জনের মৃত্যুর পাশাপাশি এক হাজার ৫৭১ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন, যা দৈনিক হিসেবে ছিল চলতি বছরের সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও প্রাণহানির রেকর্ড।
হামে সংক্রমণ বাড়ছেই
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নিয়মিত পরিসংখ্যানে বয়সভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায় না। রোগতত্ত্ববিদেরা বলছেন, হাম সব বয়সী মানুষের হতে পারে, তবে শিশুরাই এতে বেশি আক্রান্ত হয়। প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গ নিয়ে যত মৃত্যু হচ্ছে, তার সবই হামে মৃত্যু বলে বিবেচনা করা হয়। সেই হিসেবে এ বছর মৃত এক হাজার ৩০ জন শিশুর মধ্যে হামে আক্রান্ত ছিল ১০০ জন এবং উপসর্গ নিয়ে বাকি ৯৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে রোগটি শনাক্তসহ আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ১৩২ জন। তাদের মধ্যে এক হাজার ১৭৭ জন হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে আর নতুন করে রোগ শনাক্ত হয়েছে আরো ৫৫ জন শিশুর শরীরে। ফলে উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৭২ হাজার ৭২০ জনে আর হাম শনাক্ত হয়েছে ২০ হাজার ১২৪ জন শিশুর শরীরে। সব মিলিয়ে শনাক্তসহ হাম ও উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা এখন এক লাখ ৯২ হাজার ৮৪৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের হাম বিষয়ক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত রবিবার সকাল আটটা থেকে গতকাল সোমবার সকাল আটটা পর্যন্ত হামের উপসর্গে সারা দেশে মৃত আটজন শিশুর চারজন করে ঢাকা ও সিলেট বিভাগের হাসপাতালে মারা গেছে। জেলা হিসেবেও ঢাকায় সর্বোচ্চ চারজনের প্রাণহানি ঘটেছে। এ সময়ে রোগটির উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে আরো এক হাজার ১৭৭ জন শিশু, যাদের এক হাজার ৯৩ জনই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে ৩৫৫ জন, চট্টগ্রামে ২৭৩ জন, সিলেটে ১৪৬ জন, বরিশালে ১২৫ জন, খুলনায় ৮৮ জন, ময়মনসিংহে ৫৭ জন, রাজশাহীতে ২৩ জন এবং রংপুরে ২৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া এক হাজার ১৪৮ জন শিশু হাসপাতাল থেকে ছুটিও পেয়েছে। সারাদেশে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল এক লাখ ৫২ হাজার ১১৭ জন, যাদের এক লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে হামের প্রকোপ শুরু হয়। পরে ১৫ মার্চ থেকে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর তথ্য দিয়ে আসছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর থেকে গত ১৮৪ দিনে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ও আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গে ৪৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে ও আক্রান্ত হয়েছে ৮৬ হাজার ৬৩০ জন শিশু। সর্বোচ্চ মৃত্যুর দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাছাড়া এই সময়ে রাজশাহী বিভাগে ৯৬ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৮০ জন, বরিশাল বিভাগে ৭৬ জন, খুলনা বিভাগে ৩৯ জন ও রংপুর বিভাগে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
২৬ জুন হাম ও হামের উপসর্গে শিশুর মৃত্যু ৭০০ জন, ২২ জুলাই ৮০০ জন ও ১৫ আগস্ট ৯০০ জন ছাড়ায়। আর সব মিলিয়ে প্রাণহানির সংখ্যা এক হাজার পার হয় ৮ সেপ্টেম্বর। এদিকে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়ায় ৬ আগস্ট, এর মাত্র এক মাস এক সপ্তাহের মাথায় এক লাখ ৯০ হাজার ছাড়িয়েছে ১২ সেপ্টেম্বর। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে যারা হাসপাতালে যাচ্ছে বা যাদের মৃত্যু হচ্ছে, তাদের সবার নমুনা পরীক্ষা করা হয় না। ফলে নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দিয়ে হামের বিস্তারের প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরো অবনতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু সংক্রান্ত বুলেটিনে বলা হয়েছে, গত রবিবার সকাল আটটা থেকে গতকাল সোমবার সকাল আটটা পর্যন্ত মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত আটজনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে চারজন, চট্টগ্রাম বিভাগে তিনজন ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজন মারা গেছেন, যাদের ছয়জন নারী ও দুজন পুরুষ। তাঁদের মধ্যে ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী দুজন, ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী দুজন এবং ১৬ থেকে ২০, ৩৬ থেকে ৪০, ৪১ থেকে ৪৫ ও ৬১ থেকে ৬৫ বছর বয়সী একজন করে রয়েছেন।
এ বছর মারা যাওয়া ১৫৭ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার হাসপাতালে। এরপর খুলনা বিভাগে ২৭ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ২১ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৬ জন, বরিশাল বিভাগে ১২ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৫ জন, রাজশাহী বিভাগে পাঁচজন, সিটি করপোরেশন বাদে ঢাকা বিভাগে ১০ জন, রংপুর বিভাগে দুজন এবং সিলেট বিভাগে একজন মারা গেছেন রোগটিতে। অন্যদিকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নতুন ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে ডিএসসিসিতে ৩৮৮ জন, ডিএনসিসিতে ৩০২ জন ও সিটি করপোরেশন বাদে ঢাকা বিভাগের ১৯১ জন রয়েছেন। এছাড়া খুলনা বিভাগে ১৭০ জন, রংপুর বিভাগে ১৪৫ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৪৩ জন, বরিশাল বিভাগে ১৯১ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১১০ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৮৬ জন এবং সিলেট বিভাগে সাতজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৪ দিনেই ৬০ জনের মৃত্যু ও ১৭ হাজার ৪২৪ জন আক্রান্ত হওয়ায় আতঙ্কও বাড়ছে। এর আগে আগস্ট মাসে ২০ হাজার ৫৩৬ জন আক্রান্ত ও ৪৩ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ, মাসওয়ারি সর্বোচ্চ প্রাণহানিও বিদায়ী মাসের তুলনায় ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া গত জুন মাসে প্রাণ গেছে ১৩ জনের, আক্রান্ত হন দুই হাজার ৯০৭ জন আর নয় হাজার ২০৬ জন আক্রান্ত ও ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল জুলাইয়ে।
চলতি বছর ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগে। এ এলাকায় আট হাজার ৭২৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এরপরই আছে খুলনা বিভাগ। উপকূলের এই বিভাগে রোগীর সংখ্যা আট হাজার ৬৭৩। বয়সভিত্তিক হিসাবে, চলতি বছর ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ২৮২ জনসহ এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৪৯ হাজার ৩৭৫ জন । ১৫৭ জনের মৃত্যুর পর এখনো বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চার হাজার ৩৮ জন।
সারা দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর। গত বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় চার শতাধিক মানুষের, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল এক লাখ দুই হাজারের মতো।
টিকা পেয়েছে প্রায় এক কোটি ৯৮ লাখ শিশু
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষের দিকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সরকার দ্রুততার সঙ্গে ৫ এপ্রিল প্রথম দফায় দেশের ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। দ্বিতীয় দফায় ১২ এপ্রিল থেকে গুরুত্বপূর্ণ চারটি সিটি কর্পোরেশনে (ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, বরিশাল ও ময়মনসিংহ) এবং সর্বশেষ তৃতীয় দফায় ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে একযোগে হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়, যা এখনও চলমান। তবে দেশে এখনও হামের প্রাদুর্ভাব থাকায় আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে হাম প্রতিরোধে সরকার আবারও নতুন করে ব্যাপকভাবে টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করতে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রথমে এই কর্মসূচির আওতায় সারাদেশের প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারের নানা উদ্যোগে শিশুদের টিকা গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১০৯ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হজার ৬৪ জন শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া। কিন্তু ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেখা গেছে, সারাদেশে এক কোটি ৯৭ লাখ ৭১ হাজার ৭২০ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে হাম-রুবেলার টিকার সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বরিশাল বিভাগে ১১ লাখ ১০ হাজার ৬৯৮ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৮ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪ জন, ঢাকা বিভাগে ৪৯ লাখ ১৯ হাজার ৯১৩ জন, খুলনা বিভাগে ১৬ লাখ ৯৫ হাজার ৭৭৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৫ লাখ ৩০ হাজার ৯১৬ জন, রাজশাহী বিভাগে ২২ লাখ ১৩ হাজার ১৯৭ জন, রংপুর বিভাগে ২০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৮৮ জন ও সিলেট বিভাগে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮০৫ জন শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে ৪৪ হাজার ১১৯ জন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮৭০ জন, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনে ৪৮ হাজার ৬৪৩ জন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ৬৮৮ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে চার লাখ ১৮ হাজার ৯৭২ জন, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে দুই লাখ ৬ হাজার ৯২৭ জন, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে ৮৩ হাজার ৬৯৭ জন, খুলনা সিটি কর্পোরেশনে ৯৬ হাজার ৭৯২ জন, ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনে ৬২ হাজার ৩০৫ জন, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে ৬৩ হাজার ৫৯ জন, রংপুর সিটি কর্পোরেশনে ৮২ হাজার ২৫৩ জন ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৭২ হাজার ৩৪৯ জন শিশু হাম-রুবেলার টিকা নিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান বলেন, শিশুদের টিকা দেওয়া চলমান পক্রিয়া। তবে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে সারাদেশে ব্যাপকভাবে শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, এটা সরকারের বাড়তি তৎপরতা। তিনি বলেন, এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য, যাতে কোনো শিশু টিকা গ্রহণ থেকে বাদ না পড়ে।
নেপথ্যে বাদপড়া শিশুরা
সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় ১০ শতাংশ বেশি শিশু হামের টিকা পেলেও কেন প্রাদুর্ভাব ও প্রাণহানি ছড়িয়ে পড়ছে আশঙ্কাজনক হারে? আল জাজিরার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো একটি এলাকায় টিকাদানের হার বেশি হলেও সেখানে বড় একটি অংশের শিশু টিকা না পেলে হাম ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি।
গতকাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, দেশে হামজনিত মৃত্যু হয়েছে এক হাজার ৩০ জন শিশুর। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে হাম নিশ্চিত হওয়া রোগীদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১০০ জনের। আরও ৯০৯ জনের মৃত্যু হাম-সন্দেহজনক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি তথ্যানুসারে, জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরুর পর থেকে এক কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। কর্মসূচির প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক কোটি ৮০ লাখ শিশু। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরপরও হাম আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আপাতদৃষ্টিতে টিকাদানের এই সাফল্যের পরিসংখ্যানই বাংলাদেশের হাম মোকাবিলার অন্যতম দুর্বলতা সামনে নিয়ে আসছে। একদিকে শুরুতেই টিকা পাওয়ার উপযোগী শিশুর সংখ্যা কম হিসাব করা হয়েছিল, অন্যদিকে জাতীয় পর্যায়ের গড় টিকাদানের হার দেশের বিভিন্ন এলাকার বাস্তব চিত্রকে আড়াল করতে পারে। আল জাজিরা প্রতিবেদনে বলেছে, কোনো একটি এলাকায় টিকাদানের হার বেশি হলেও সেখানে বড় একটি অংশের শিশু টিকা না পেলে হাম ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ, হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি।
আল জাজিরা বলছে, বাংলাদেশে হামের বর্তমান সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। প্রায় ১৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষের দেশটি একসময় হাম নির্মূলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কয়েক বছর ধরে নিয়মিত টিকাদানের হার কমতে থাকায় বিপুলসংখ্যক শিশু হাম থেকে সুরক্ষাবঞ্চিত হয়ে পড়ে। ২০২৩ সালের বাংলাদেশ কভারেজ ইভ্যালুয়েশন সার্ভে অনুসারে, হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণের হার ২০১৯ সালের ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে কমে ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। দ্বিতীয় ডোজের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ২০১৯ সালে দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে কমে ৮০ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে একটি জনগোষ্ঠীতে প্রায় ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন। সেই মাত্রায় ধারাবাহিকভাবে পৌঁছাতে না পারায় বছরের পর বছর ধরে টিকা না পাওয়া শিশুদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
আল জাজিরা বলছে, কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এর পাশাপাশি টিকা নিয়ে ভুল তথ্য, গুজব ও মানুষের মধ্যে টিকা নিতে অনীহাও শিশুদের টিকাদান থেকে বাদ পড়ার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে বলে ইউনিসেফ জানিয়েছে। এছাড়া চলতি বছরের আগে বাংলাদেশে সর্বশেষ দেশজুড়ে অতিরিক্ত হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। এরপর দীর্ঘ সময় বড় ধরনের জাতীয় সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি না হওয়ায় টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
এর সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশের টিকাদান কর্মসূচিতেও বিঘ্ন ঘটে। ওই সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পরিবর্তন হয়।
বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেনের মতে, সরকার পরিবর্তনের পর টিকা সংগ্রহে বিলম্ব হয়। এর ফলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকার সংকট তৈরি হয়েছিল। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশে হাম আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। মার্চে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পর ৪ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে (ডব্লিউএইচও) দেশজুড়ে হাম প্রাদুর্ভাবের কথা জানায় বাংলাদেশ। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে হাম আক্রান্তের খবর পাওয়া যায়। ৫ এপ্রিল উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জরুরি টিকাদান শুরু করে সরকার। এরপর এপ্রিলের শেষ দিকে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়।
২০ এপ্রিল শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় দুই মাস পর, ২৮ জুন ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচিতে একই বয়সসীমার প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অর্থাৎ একই বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে দুই কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে প্রায় ৬০ লাখের পার্থক্য ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবধানই দেখিয়ে দেয়, হাম-রুবেলা টিকাদানের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রায় যোগ্য শিশুর প্রকৃত সংখ্যা কম হিসাব করা হয়ে থাকতে পারে। ফলে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যেতে পারে। মুশতাক হোসেনও টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যবহৃত জনসংখ্যার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, যোগ্য শিশুদের সংখ্যা যথাযথভাবে নিরূপণ করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জাতীয় পর্যায়ে কত শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে—এই হিসাব দিয়ে হাম নিয়ন্ত্রণের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। একটি এলাকায় ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হলেও অন্য কোনও এলাকায় যদি টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বেশি থাকে, তাহলে ওই এলাকাটি হাম সংক্রমণের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। মুশতাক হোসেনের মতে, টিকাদানের ক্ষেত্রে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্গম, প্রত্যন্ত ও চলমান জনগোষ্ঠীর শিশুদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত একজন মহামারি বিশেষজ্ঞ, পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আক্রান্ত শিশুদের বয়স, টিকা নেওয়ার ইতিহাস এবং তারা কোন এলাকায় বসবাস করে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে টিকা থেকে বাদ পড়া জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করা জরুরি। তার মতে, ওই শিশুদের লক্ষ্য করে টিকাদান না করলে জাতীয় পর্যায়ে আক্রান্তের সংখ্যা কমে এলেও ভাইরাসের
সংক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ হবে না।
ঢাকার আইডিএইচে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যেও টিকাদানের ঘাটতির চিত্র স্পষ্ট।
হাসপাতালের চিকিৎসক শ্রেবাশ পাল জানান, বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া হাম রোগীদের বড় অংশই টিকা নেয়নি। কিছু শিশু টিকাদান কর্মসূচির সময় অসুস্থ থাকায় টিকা নিতে পারেনি।
তবে হাসপাতালটিতে হাম রোগী ভর্তির সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় কমেছে। চিকিৎসকদের মতে, এতে বোঝা যায় যে, টিকাদান কর্মসূচি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। তারপরও হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশু আসা অব্যাহত রয়েছে।
মাত্র এক বছর বয়সী সাইফ হাসানকে ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের (আইডিএইচ) নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। গত ২৭ আগস্ট মারা যায় শরীয়তপুরের এই শিশুটি।
এর কয়েক দিন আগে সাইফের জ্বর ও শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিয়েছিল। এর মধ্যেই তাকে প্রথমবারের মতো হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হয়। ফলে পরিবারের সদস্যদের মনে প্রশ্ন জাগে, টিকা নেওয়ার কারণেই কি শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়েছিল?
তবে চিকিৎসকদের মতে, বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের একটি সমস্যায় চিকিৎসাধীন থাকা সাইফ টিকা নেওয়ার আগেই সম্ভবত হাম ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল। টিকা শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরির সুযোগ পাওয়ার আগেই সংক্রমণটি তার বিদ্যমান শারীরিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তোলে।
আইডিএইচের জুনিয়র কনসালট্যান্ট শ্রেবাশ পাল বলেন, সংক্রমণটি সাইফের আগের শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইফের মৃত্যু বাংলাদেশে চলমান ভয়াবহ হাম পরিস্থিতির একটি করুণ চিত্র তুলে ধরেছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অথচ মাত্র এক বছর আগে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সারা বছরে হাম শনাক্ত হয়েছিল ১৩২টি এবং কোনও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিপুল প্রাণহানির মধ্যেও সরকার ব্যাপক আকারে টিকাদান কর্মসূচি চালিয়েছে। জরুরি এই কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে প্রায় দুই কোটি টিকা দেওয়া হয়েছে।
আইডিএইচের মৃত্যুর পর্যালোচনার তথ্যও পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিচ্ছে। ২৩ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালটিতে চলতি বছরে তিন হাজার ১৬৭টি সন্দেহভাজন হাম রোগী, ৫৩৭টি পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম এবং ৫৭টি নিশ্চিত বা সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। মৃতদের বড় অংশই ছিল খুব অল্পবয়সী শিশু। ৫৭ জন মৃতের মধ্যে ৪৯ জন বা প্রায় ৮৬ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ মাসের কম। এর মধ্যে ৩১ জন শিশুর বয়স ছিল ৯ মাসের কম—অর্থাৎ বাংলাদেশে নিয়মিত হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজ পাওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই তারা মারা গেছে। হাসপাতালের বিশ্লেষণ অনুসারে, মৃত ৫৭ জনের মধ্যে ৪৭ জন বা ৮৩ শতাংশ কোনো হাম টিকা পায়নি।
মৃত্যুর অন্যতম প্রধান জটিলতা ছিল নিউমোনিয়া। নথিভুক্ত ৫৭ মৃত্যুর মধ্যে ৫০ জনের নিউমোনিয়া ছিল। চিকিৎসক শ্রেবাশ পাল আল জাজিরাকে বলেন, নিয়মিত টিকা দেওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই যেসব শিশু হাম আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের নিয়ে চিকিৎসকদের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। আইডিএইচ বর্তমানে ৯ মাস বয়সের আগেই হাম আক্রান্ত শিশু এবং তাদের মায়েদের তথ্য বিশ্লেষণ করছে, যাতে এত কম বয়সী শিশুদের সংক্রমিত হওয়ার পেছনের কারণগুলো আরও ভালোভাবে বোঝা যায়। তবে হাসপাতালের এই পরিসংখ্যানকে পুরো দেশের চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয় বলেও সতর্ক করেছেন পাল। কারণ, আইডিএইচ একটি বিশেষায়িত রেফারেল হাসপাতাল এবং ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গুরুতর রোগীদের এখানে পাঠানো হয়।
তারপরও এই তথ্য দেখিয়ে দেয়, হাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে কোন শিশুরা।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারাও বলছেন, সরকারি পরিসংখ্যান দিয়ে হাম সংক্রমণের প্রকৃত প্রবণতা পুরোপুরি বোঝা নাও যেতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশিদ জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ আরও একটি টিকাদান কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে নতুন কর্মসূচি শুরু হতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পরবর্তী কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে আগের কর্মসূচির চেয়ে বেশি সংখ্যক টিকা দেওয়ার ওপর নয়; বরং কোন শিশু এখনও ঝুঁকিতে রয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরবর্তী টিকাদান কর্মসূচিতে কমিউনিটি বা এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। কোন এলাকায় কত শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের বয়স কত, কেন তারা টিকা পায়নি এবং তারা কোথায় বসবাস করছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে।
মুশতাক হোসেনের পরামর্শ, নজরদারিতে কোনও এলাকায় বড় ধরনের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি ধরা পড়লে ছোট শিশুদের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক মহামারি বিশেষজ্ঞের মতে, আক্রান্ত এলাকায় প্রয়োজন হলে ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু-কিশোরদেরও টিকাদানের আওতায় আনা হতে পারে।
আল জাজিরা মনে করে, বাংলাদেশে চলমান হাম পরিস্থিতির সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো—যেসব শিশু টিকাদানের বিভিন্ন স্তরের ফাঁক দিয়ে বাদ পড়ে গেছে, তাদের অনেকেই আর ফিরে আসবে না।
কিশোরগঞ্জের পূর্ব-মধ্যাঞ্চলের নয় মাস বয়সী মোস্তাকিমও ছিল এমনই এক শিশু। হাম প্রতিরোধের কোনও টিকা সে পায়নি। গত ৩০ আগস্ট ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। সাইফ ও মোস্তাকিমের মতো শিশুদের মৃত্যু বাংলাদেশের হাম মোকাবিলায় একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে এনেছে। বিপুলসংখ্যক শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও যদি নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠী টিকাবঞ্চিত থেকে যায়, তাহলে অত্যন্ত সংক্রামক এই রোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আরেকটি বড় টিকাদানের সংখ্যা দেখানো নয়; বরং যে শিশুরা এখনও সুরক্ষার বাইরে, তাদের একজনকেও বাদ না দেওয়া। স্থানীয় পর্যায়ে সঠিক তথ্য, লক্ষ্যভিত্তিক টিকাদান, নিয়মিত নজরদারি এবং দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোই পারে এই প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাব থামানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









