যেখানে জন্ম ও বেড়ে ওঠা সেই কুমিল্লার গন্ধমতি এলাকার নিজেদের বাড়ির কাছেই চিরশায়িত হয়েছে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। গতকাল রবিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দুই দফা নামাজে জানাজার পর কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার কোটবাড়ি উপশহরের গন্ধমতি কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জানাজায় হাজারো মানুষের ঢল নামে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ১৩ বছরের এই স্কুলছাত্রকে হত্যার ঘটনায় শোকস্তব্ধ-ক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয়টিসহ পুরো নগরী। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে খুনিদের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ চারটি দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
চোখের জলে জানাজা, দাফন ও অপ্রতিমকে শেষ বিদায় জানাতে আসা ব্যবসায়ী বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারসহ কুমিল্লাবাসীর দাবি, অপ্রতিমকে জীবিত খুঁজে বের করতে পুলিশের ব্যর্থতা ও অবহেলা ছিল ষ্পষ্ট। মহাসড়ক অবরোধে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরাও কুমিল্লার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে তীব্র হতাশা-ক্ষোভ জানিয়েছেন।
এদিকে নগরীর কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নিতেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের। তাদের ভাষ্য, মায়ের আইফোন ছিনিয়ে নিতে অপ্রতীমকে পরিকল্পিতভাবে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নেওয়া হয়। সেখানে ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। পরে তার মৃত্যু নিশ্চিত হলে ফোনটি নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় দুই কিশোরসহ তিনজন।
ওই তিনজনকে গ্রেফতারের পর গতকাল জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, অপ্রতিম হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন এবং তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া আইফোনটি গ্রেফতার হওয়া একজনের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে, অপ্রতিম হত্যার বিচার ‘সংক্ষিপ্ত’ সময়ে শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনিও বলেছেন, ওই ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতারের পাশাপাশি তার মায়ের আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরিবারের ভাষ্য, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে সে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল। এরপর আর বাসায় ফেরেনি। স্বজনেরা খোঁজাখুঁজি শুরু করার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি জানায়। রাত পর্যন্ত অপ্রতিম বাসায় না ফেরায় তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় নিখোঁজ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি ঝোপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছিল।
বাড়ির কাছেই চিরশায়িত
গতকাল সকাল দশটার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে প্রথম ও পরে বেলা ১১টায় তার বাড়ি সংলগ্ন এলাকায় গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে নিহত অপ্রতিমের দ্বিতীয় নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়। এসব জানাজায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন। এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
শনিবার রাতে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়না তদন্ত শেষে অপ্রতিমের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। রাতে মরদেহটি গন্ধমতির বাড়িতে রেখে সকালে নামাজে জানাজার জন্য কুবির মাঠে আনা হয়। জানাজায় শোকস্তব্ধ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয়রা অংশ নেন। অকালে প্রাণ হারানো কিশোর অপ্রতীমের আত্মার মাগফেরাত কামনার পাশাপাশি জড়িতদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানান তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম বলেন, নিহত অপ্রতিমের দাদার বাড়ি কুষ্টিয়ায়। নানার বাড়ি চাঁদপুরে। গন্ধমতি এলাকায় যে বাড়িতে তারা থাকতেন, সেটি তাদের নিজেদের করা বাড়ি। অপ্রতিমের জন্ম হয়েছিল এখানেই। সে বড়ও হয়েছে এই গন্ধমতি এলাকায়। তাই তার পরিবারের ইচ্ছায় বাড়িটির পাশের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে। দাফন শেষে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘দ্রুত বিচার যেন হয়, বর্তমান প্রশাসনের কাছে এইটা আমার চাওয়া। আমার ছেলের বয়স মাত্র ১৩ বছর, সে এই বয়সে কোনো ক্রাইম তো করবেই না, না কোনো প্রেমঘটিত কারণ থাকবে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বোঝাই যাচ্ছে যে আনন্দে তাদের সঙ্গে যাচ্ছে।’
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মা ড. নাহিদা বেগম ও বাবা ফিরোজ শাহরিয়ারের আহাজারিতে কান্নার রোল পড়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। বারবার মূর্ছা গিয়ে মা ড. নাহিদা বেগম বলছিলেন, ‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছিল? আমাকে জবাব দেন, আমি কেমনে জীবন পার করবো? এটা কোনো দেশ, একটা ছেলে ঘর থেকে বের হলে তাকে মেরে ফেলতে হবে?’
এ মর্মান্তিক হত্যার প্রতিবাদ ও শ্রদ্ধায় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে সাধারণ শোক দিবস পালন করা হচ্ছে, স্থগিত রাখা হয়েছে সব ধরনের ক্লাস ও পরীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও নিহতের বাসায় গিয়ে নিহতের স্বজনদের সমবেদনা জানান স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী ও কুবি প্রশাসন। এমপি মনিরুল হক চৌধুরী ৯০ দিনের মধ্যে এ হত্যার বিচারকাজ সম্পন্ন করার দাবি জানান।
বিচার দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ
অপ্রতিম হত্যায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত ছাড়াও আরো তিনটি দাবি জানিয়েছেন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করা কুবির শিক্ষার্থীরা। সেগুলো হচ্ছে, কোতোয়ালি ও সদর দক্ষিণ থানা পুলিশসহ পুলিশ সুপারের ব্যর্থতার বিষয়টি স্বীকার এবং দুই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও পুলিশ সুপারের অপসারণ। এছাড়া রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন ও সিসি ক্যামেরা দিয়ে এলাকাটি নজরদারির আওতায় আনা, প্রয়োজনে সাঙ্গিশ্বর পুলিশ ফাঁড়ি কুবির পাশে স্থানান্তর এবং কুমিল্লাসহ সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান ও কার্যকর উন্নতিসহ নিখোঁজ ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও উদ্ধারে প্রযুক্তিনির্ভর বিশেষ ইউনিট গঠন।
বেলা পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে অপ্রতিমের প্রথম নামাজে জানাজা শেষেই শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে আসেন এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি এলাকায় বসে বিক্ষোভ শুরু করেন তারা। অপ্রতিম হত্যায় জড়িতদের বিচার-সর্বোচ্চ শাস্তি এবং নিরাপদ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘দড়ি লাগলে দড়ি নে, খুনিদের খবর দে কবর দেব’, ‘শিক্ষকের সন্তান মরে, প্রশাসন কি করে’, আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে’ এসব স্লোগান দেন তারা। এতে মহাসড়কের দুপাশে আটকা পড়ে বিভিন্ন যানবাহন। সোয়া এক ঘণ্টার অবরোধ শেষে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে মহাসড়কটি ছাড়েন শিক্ষার্থীরা।
আইফোন ছিনিয়ে নিতেই হত্যা: পুলিশ
দেশজুড়ে চাঞ্চল্য তোলা অপ্রতিম হত্যার ঘটনাটিতে মামলা হওয়ার পর গ্রেফতার হওয়া ১৯ বছরের কিশোর সাইফুল ইসলাম তুহিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সানন্দা এলাকার নূরে আলমের ছেলে। তিনি কুমিল্লা সিটি কলেজ একাদশ শ্রেণিতে পড়তেন। ২০২৫ সালে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর তিনি ড্রপআউট হয়ে যান। ১৫ বছরের অন্য দুই কিশোর হচ্ছে, সালমানপুর এলাকার মমিন হোসেনের ছেলে মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ এবং সদর উপজেলার হাতিগাড়া এলাকার মো. আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে কামরুল হাসান। তারা দুজনই ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এছাড়া আবদাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র মো. সিয়ামকে (১৯) হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তিনি সদর দক্ষিণের এলাহিপুর এলাকার সেলিম মিয়ার ছেলে।
শনিবার মধ্যরাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় নিহত অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাটি করেন। এতে তুহিন এবং দুই কিশোর ফাহাদ ও কামরুলকে গ্রেফতার দেখানোর কথা সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।
পুলিশ সুপার জানান, গ্রেফতার হওয়া তিনজনের বিরুদ্ধে আগে কোনো পুলিশ রেকর্ড (পিসিপিআর) নেই। আসামিরা মাথায় আঘাত করে অপ্রতিমকে হত্যা করে বর্ণনা করে তিনি জানান, ‘তাদের মধ্যে অসম বন্ধুত্ব ছিল। অর্থাৎ অপ্রতিম ক্লাস সেভেনে পড়ত, কিন্তু যারা তার বন্ধু তারা তার সহপাঠী ছিল না। এরা বয়সে তার চেয়ে বড় ও বখাটে। পুলিশ সুপার বলেন, ‘আমরা ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করেছি। মূল আসামিদের গ্রেফতার করেছি এবং যে আইফোনটির কারণে এই হত্যা, সেই আইফোনটিও আমরা আসামি তুহিনের দেখানো মতে তার বাসা থেকে উদ্ধার করেছি।’
সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান ও পঙ্কজ বড়ুয়াসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় সিসিটিভি ভিডিও দেখে তুহিনকে প্রথমে আটক করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্য দুই কিশোর ফাহাদ ও কামরুলকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে অপ্রতিমকে হত্যার বিস্তারিত জানা গেছে।
পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তাকে উদ্ধারে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা ও কোটবাড়ির বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়। একটি ফুটেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে অপ্রতিমের সঙ্গে একজন কিশোরকে দেখা যায়। পরে আশেপাশের আরও একটি সিসিটিভি ফুটেজে ওই কিশোরকে অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে যেতে দেখা যায়। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হয়।
পুলিশ সুপার জানান, জিডির ভিত্তিতে হওয়া তদন্তে ঘটনাস্থল ও আশেপাশের এলাকার ওইসব সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুলিশ দেখতে পায়, দুপুর আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটে অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলের দিকে যান তুহিন। অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজে সঙ্গে থাকা তুহিনকে হেফাজতে নেওয়া হয়।
পুলিশ সুপারের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন জানান, অপ্রতিমের মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে পরিকল্পনা করে ওই স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্য দুই কিশোরের সম্পৃক্ততার তথ্য পায় পুলিশ। তিনি জানান, তুহিনের দেওয়া তথ্য ও দেখানো জায়গা অনুসারে তাঁর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।
এর আগে শনিবার রাতে সালমানপুর এলাকার একটি বাড়ি থেকে ফোনটি উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল জেলা পুলিশ।
পুলিশ সুপার বলেন, মূলত অপ্রতিমের মায়ের আইফোনটির দিকে নজর ছিল তুহিনের। ওই ফোন নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় বলে তদন্তে পাওয়া গেছে। তিনি জানান, হত্যায় সরাসরি ফাহাদ ও তার বন্ধু কামরুলও জড়িত।
পুলিশ সুপার জানান, হত্যার পরও ঘাতকেরা অত্যন্ত নির্ভার থাকে। শনিবার সকাল আটটার দিকে তুহিন, আনাস ও ফাহিম অপ্রতিমের বাসায় গিয়ে তার ক্রন্দনরত মা নাহিদা বেগমকে সান্ত্বনা পর্যন্ত দেয়। সেখান থেকে ফিরে তুহিন নিজ বাসায় স্বাভাবিক সময় কাটাতে থাকেন। এরপর সাধারণ শিক্ষার্থীদের সহায়তায় বিকেলে তুহিনকে গ্রেফতারের পর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফাহাদকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ফাহাদকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার বন্ধু কামরুলও জড়িত বলে তথ্য পাওয়া যায় এবং তাকে গ্রেফতার করা হয়।
হত্যা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মো. আনিসুজ্জামান জানান, ‘ঘটনার দিন (শুক্রবার) বিকেল পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যে শালবন এলাকার চারপাশে পাহাড় ঘেরা নির্জন বনের ভেতরে অপ্রতিমের আইফোনটি তিনজন মিলে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। অপ্রতিম তাতে বাধা দেয়। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এর মধ্যে প্রথমে তুহিন ও পরে সঙ্গে থাকা ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে। একপর্যায়ে অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত করে তিনজন। এরপর তুহিন আইফোনটি নেয় এবং অন্য দুজনকে নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাযন।’
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক কলেজ ছাত্র সিয়ামের বিষয়ে আনিসুজ্জামান বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করছি। ঘটনায় জড়িত অন্যান্য বিষয় এবং অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা, সেগুলোও আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি।’ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুতই পুলিশ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে বলেও জানান পুলিশ সুপার।
তবে পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্যকে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনো চলছে। এজন্য আটক সিয়ামের সম্পৃক্ততার বিষয়টি এখনও অধিকতর যাচাই-বাছাই এবং হত্যায় অন্য কেউ জড়িত কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা?
সংবাদ সম্মেলনে অপ্রতিম হত্যায় কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, কুমিল্লায় এ পর্যন্ত ২৫০ জনেরও বেশি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অপ্রতীম হত্যায় গ্রেফতার আসামিরা কিশোর গ্যাংয়ে জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশেপাশের এলাকায় মাদকসেবী, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় মানুষের আধিপত্যের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন করেন সাংবাদিকেরা। একই সঙ্গে লালমাই পাহাড়ে সাম্প্রতিক কয়েকটি অপরাধের ঘটনা এবং অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পুলিশ সুপার এসব বিষয়েও তদন্তের কথা জানান। তিনি বলেন, লালমাই পাহাড় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ কাজ করছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সন্তান কখন, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কখন বাড়িতে ফিরছে—এসব বিষয়ে মা–বাবাকে খোঁজ রাখতে হবে। বিশেষ করে অল্প বয়সী সন্তানদের হাতে ফোন ও বিভিন্ন ডিভাইস দেওয়ার ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
‘সংক্ষিপ্ত সময়ে’ বিচার করার আশা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
কিশোর অপ্রতিম হত্যায় দ্রুততম সময়ে আসামিদের গ্রেফতার ও আলামত উদ্ধারের কাজ হয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মরদেহ উদ্ধার এবং পরবর্তী ১২ ঘণ্টার মধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আশা করি, রামিসা হত্যার বিচারের মত এই হত্যার বিচারটা আমরা সংক্ষিপ্ত সময়ে সমাপ্ত করাতে পারব।’ গতকাল রবিবার সচিবালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, সর্বশেষ হিসাব মতে, আগে তিনজন, পরে একজন, চারজন গ্রেফতার হয়েছে এবং তারা অপরাধ স্বীকার করেছে। যে কিশোরদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের দুজনের বয়স ১৮ বছরের বেশি এবং একজনের কম হতে পারে বলে ধারণা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃতদের আচরণ ও কর্মকাণ্ড অনেকটা কিশোর অপরাধী চক্রের মতো। তাদের বয়স নিহত অপ্রতিমের চেয়ে পাঁচ থেকে ১০ বছর বেশি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এদের সাথে অপ্রতিমের সম্পর্ক, ওঠাবসা ছিল, বন্ধুত্ব ছিল, প্রায় সময় আড্ডা দিত।’
কুমিল্লার পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিম সেদিন যাদের সঙ্গে বেরিয়েছিল, তাদের একজন, তুহিনের বাসা থেকেই আইফোনটি উদ্ধার করা হয়। তুহিনকেই ‘প্রধান সন্দেহভাজন’ হিসেবে বর্ণনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের কাছ থেকে নিহত কিশোরের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনসহ সমস্ত আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আলামতের ফরেনসিক বিশ্লেষণ চলছে। তারা ঘটনাও স্বীকার করেছে। এখন পুলিশ অন্যান্য আইনি কার্যক্রম বা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি করানো যায় কি না- সেগুলো নিয়েও কাজ করছে।’
অপ্রতিমকে জীবিত খুঁজে বের করতে বা এই নির্মম হত্যার ঘটনায় পুলিশের ব্যর্থতা ও দায়িত্বে গাফিলতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন কুমিল্লাবাসী। তবে, পুলিশের তৎপরতার প্রশংসা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় দ্রুততম সময়ে আসামিদের গ্রেফতার ও আলামত উদ্ধার হয়েছে। এখন আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত অভিযোগপত্রও দেওয়া হবে। রামিসা হত্যার মতো এ মামলার বিচারও সংক্ষিপ্ত সময়ে সম্পন্নে বিচার বিভাগকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। অপ্রতিম হত্যায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিটি জঘন্য অপরাধ দ্রুততম সময়ে উদ্ঘাটন, অপরাধীদের গ্রেফতার এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছে। যেসব ঘটনা তদন্তসাপেক্ষ, সেগুলোর অগ্রগতি তদন্ত শেষ হওয়ার পর জানা যাবে।
সামাজিক অবক্ষয়কে অপরাধের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধের পেছনে অনেক ক্ষেত্রে মাদক, জুয়া ও পর্নোগ্রাফির মতো অনুষঙ্গ রয়েছে। সামাজিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা ও নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সমাজের সর্বস্তরের সচেতন নাগরিকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।
অভিভাবকদের আরও সতর্ক হতে বললেন রাশেদ খাঁন
অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনার পর অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়ার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন। গতকাল ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, ‘সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে, তার বন্ধু সার্কেল কেমন, সেটার খোঁজখবর রাখা আমাদের প্রত্যেক বাবা-মায়ের দায়িত্বও বটে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার একমাত্র সন্তান অপ্রতিম হত্যাকা সেটি আমাদের আরও স্মরণ করিয়ে দেয়।’
রাশেদ খাঁন তার পোস্টে বলেন, ‘যে তিনজন ঘাতককে পুলিশ গ্রেফতার করেছে, তারা এলাকায় কিশোরগ্যাং হিসেবে পরিচিত। সিসিটিভি ফুটেজ থেকে পরিলক্ষিত হয় যে, হত্যার শিকার অপ্রতিম ঘাতক তুহিনের সাথে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটাচলা করছে।’ রাশেদ বলেন, ‘আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, অপ্রতিম একটু সিনিয়র ক্লাসের বন্ধুদের সাথে মিশতে পছন্দ করত। সেই জায়গা থেকে তুহিনদের সাথে যোগাযোগ তৈরি হয়। আমরাও ছোটবেলায় এলাকার বড় ভাইদের সাথে ওঠাবসা করেছি। কিন্তু এলাকার খারাপ ছেলেদের থেকে সবসময় দূরে থাকার চেষ্টা করেছি। এক্ষেত্রে বাবা-মায়ের শাসন ও নৈতিক নির্দেশনাও বড় একটি ব্যাপার ছিল।’
সব এলাকাতেই তুহিনদের মত কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘ফেসবুকে চটকদার ছবি, সিনেমাটিক ভিডিও প্রকাশ করে এরা অল্পবয়স্ক তরুণদের মধ্যে আকর্ষণ তৈরি করে সার্কেলে ভেড়াতে চেষ্টা করে। গণমাধ্যমের খবরে এসেছে, আইফোনের লোভে ছবি তোলার কথা বলে এরা শিশু অপ্রতিমকেও বিভ্রান্ত করে ঘর থেকে বের করে আনে। বাবা-মায়ের কর্মব্যস্ততায় হয়ত শিশুটির যে এদের সাথে যোগাযোগ তৈরি হয়েছে, সেটি বুঝে উঠতে পারেনি।’
তবে অপ্রতিমের নির্মম হত্যা কিশোর গ্যাং ‘নির্মূলের’ প্রয়োজনীয়তার বার্তা দেয় বলেও মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী। তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলব, এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। নতুবা আগামীকাল আপনার আমার সন্তানের পরিণতিও অপ্রতিমের মতো হতে পারে।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এ ঘটনায় দায় দিলেও অন্য বাস্তবতাও মনে করিয়ে দেন রাশেদ খাঁন। তিনি বলেন, ‘সব ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়ী করতে পারেন, যেহেতু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি বর্তমান বিরোধীদলের দেশব্যাপী নিত্য নতুন কর্মসূচির নিরাপত্তা দিতে ব্যস্ত থাকবে, নাকি ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের অপতৎপরতা রোধে মনোযোগ দিবে, নাকি সামাজিক অপরাধ বন্ধে বেশি গুরুত্ব দেবে? কোথায় অগ্রাধিকার থাকা দরকার? কারণ, জনসংখ্যার অনুপাতে তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের সংখ্যা বাংলাদেশে পর্যাপ্ত নয়। আর ১৬ বছরে বাহিনীগুলোকে দলীয়করণ করার অপচেষ্টার ইতিহাসও কারও অজানা নয়।’
বিরোধী দলের সমালোচনা করে রাশেদ খাঁন বলেন, ‘যেখানে বিরোধীদলের দায়িত্ব ছিল ১৬ বছর ধরে তৈরি হওয়া জঞ্জাল, অপসংস্কৃতি, অপরাধ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের দমনে সরকারকে সহযোগিতা করা, কিন্তু উল্টো অসহযোগিতার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক করে ক্ষমতায় যেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।’
দেশের বিভিন্ন স্থানে হাতবোমা, ককটেল বিস্ফোরণের জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করে রাশেদ বলেন, ‘আওয়ামীলীগ ছাত্রলীগ বাসে আগুন দিচ্ছে, ককটেল মারছে, আবার জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধীদল এক দফার হুমকি দিয়ে রাজপথ গরম করছে। অর্থাৎ বিএনপি সরকারকে একসাথে দুইটা বিরোধীদলের অপতৎপরতা সামলিয়ে দেশ চালাতে হচ্ছে। এটা সরকার ও রাষ্ট্রের জন্য বড় একটা চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মিলিতভাবে সরকারকে সহযোগিতার বিকল্প নেই।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









