একদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, তার ওপর মধ্যরাতে হঠাৎ বাড়ানো হলো জ্বালানি তেলের দাম। সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটার প্রতি ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলছেন, জ্বালানির এই দাম বাড়ায় গাড়ি ভাড়া তথা পণ্য পরিবহন ও যাতায়াত খরচ বাড়বে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়বে। ফলে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণে বেড়ে গিয়ে তাদের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এবং পৃথক বিবৃতিতে তারা এর প্রতিবাদ জানিয়ে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারেরও দাবি জানান।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, এমনিতেই গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত। দ্রব্যমূল্যে ঊর্ধ্বগতিতে জনসাধারণের নাভিশ্বাস উঠছে। সরকার এসব সমস্যার কোনো কার্যকর সমাধান করতে পারছে না। মুক্তবাজারের নিষ্ঠুর কষাঘাতে পিষ্ট সাধারণ মানুষের ওপর রাষ্ট্র আবারও চাপিয়ে দিল এক চরম জুলুমের বোঝা।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, ‘যখন মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, তখন বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ না করে দাম বৃদ্ধি ও জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে সরকারের তথাকথিত লোকসান কমানোর এই নীতি সরাসরি আমজনতার পকেট কাটার সামিল।
জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি- চাল, ডাল, সবজিসহ প্রতিটি মৌলিক পণ্যের দামের ওপর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাব ফেলবে যা সাধারণ শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষের মুখের আহার কেড়ে নেবে। বর্তমান সরকার পাঁচ মাসে তিনবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়াল যা সরকারের গণবিরোধী নীতির প্রকাশ। অবিলম্বে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার; গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির সংকট নিরসন এবং দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখার দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদুল হাসান মানিক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নুর আহমদ বকুল পৃথক বিবৃতিতে ফের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারা বলেন, ‘বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকটময় পরিস্থিতিতে গৃহস্থালি, অফিস, কারখানা, কৃষি শিল্প, উৎপাদন পরিপূর্ণ হুমকির মধ্যে। ক্রমাগত মুদ্রাস্ফীতির কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানা যাচ্ছে না। সারাদেশে অস্থির পরিস্থিতি, মানুষ ক্রমাগত ক্রয়ক্ষমতা হারাচ্ছে। গরিবের সূচক মাত্রা বাড়ছে, এই পরিস্থিতিতে আবার তেলের মূল্যবৃদ্ধি- বাজার থেকে উৎপাদন পর্যন্ত সর্বত্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
এই নেতারা বলেন, ‘পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্যের দাম বেড়ে যাবে, সরবরাহ কমে যাবে। মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে। এ অসহনীয় পরিস্থিতি সাধারণ মানুষ সামাল দিতে পারবে না। সরকারের পক্ষে এখনও কোনো পরিপূর্ণ জ্বালানি নীতি ঘোষণা করা হয়নি। মার্কিন-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তির পর জ্বালানি ক্ষেত্রে একটা লুকোচুরি খেলা হচ্ছে। যখন যেমন তখন তেমন নীতিতে দেশপরিচালনার নীতি কখনও মঙ্গল বয়ে আনবে না। সরকারের উচিত হবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি না করে অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে বাজারসহ জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সব কিছু রাখা।’
বাসদের (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা বলেন, ‘বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটার প্রতি ২০ টাকা বাড়িয়ে মূল্যবৃদ্ধির চাপে পিষ্ট জনগণের কাঁধে আরও মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপালো। জ্বালানি তেলের বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধিতে সেচ খরচসহ কৃষকের উৎপাদন খরচ, শিল্পপণ্য, যাতায়াত, গৃহস্থালি খরচসহ সব পণ্যের দাম কয়েকগুণ বাড়বে। সরকার এমন সময় জ্বালানি তেলের দাম বাড়াল, যখন কয়েক বছর ধরে লাভে আছে বিপিসি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সব খরচ ও কর বাদ দিয়ে বিপিসি প্রায় চার হাজার ৩০০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে।
বিপিসি গত ১১ বছরে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। বছরে গড়ে লাভ সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। এ সময় সংস্থাটি সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে সোয়া লাখ কোটি টাকার ওপর।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি- বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের পরিকল্পনায় বিশাল বিশাল মেগাপ্রকল্প, নতুন পে-স্কেল ঘোষণা ইত্যাদিই গুরুত্ব পাচ্ছে, যার মাধ্যমে সরকারি ব্যয় বহুগুণ বাড়ছে অথচ জনগণকে মূল্যবৃদ্ধির কবল থেকে রক্ষার জন্য দীর্ঘমেয়াদি জনবান্ধব কোনো পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না। জনগণের ওপর বিরাট মূল্যবৃদ্ধির বোঝা না চাপিয়ে সরকারি ব্যয় সমন্বয় করে স্বস্তি দেওয়া এ পরিস্থিতিতে সরকারের অন্যতম কর্তব্য হওয়া উচিত ছিল। লাভে থাকার পরও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে সরকারি সেবা খাতে ভর্তুকি কমানোর নামে জ্বালানি তেলের এ মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত জনবিরোধী।
অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই বর্তমান সরকার আইএমএফসহ সাম্রাজ্যবাদী সংস্থা, দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিদের তোষণ করার নীতিতেই অর্থনীতি পরিচালনা করছে, যার সরাসরি ভুক্তভোগী হচ্ছে সীমিত আয়ের মানুষ। অবিলম্বে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই। জনগণকে এই মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাই।
সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি যাত্রী কল্যাণ সমিতির
যাত্রী কল্যাণ সমিতির বিৃবতিতে বলা হয়, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এখন নিম্নমুখী। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকটে বিভিন্ন কলকারখানা বন্ধের কারণে বেকারত্ব বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে দেশে এক চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এমন সময় সংকট মোকাবিলায় দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সাত মাসের মাথায় দুই দফা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করেছে। ফলে যাতায়াত, যোগাযোগ, পণ্য ও যাত্রী পরিবহনসহ শিল্প উৎপাদনে ভাড়া ও মূল্য উসকে দেওয়া হয়।’
এই ‘গণবিরোধী’ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে জ্বালানি তেলের বর্ধিত দাম প্রত্যাহার করে আগের দাম বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘সরকার জনস্বার্থে কোথাও ব্যবসা করবে, কোথাও ভর্তুকি দেবে এটাই বাস্তবতা। দেশের চরম আর্থিক সংকটের মুহূর্তে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিয়ে দেশের অর্থনীতি সচল রাখা, মূল্যস্ফীতি কমানোর মধ্য দিয়ে দেশের সংকটাপন্ন জনগণের পাশে থাকা সরকারের দায়িত্ব।’
দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে পোস্ট, চবি ছাত্রদল নেতাকে শোকজ
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসাইন হৃদয়কে শোকজ করেছে কেন্দ্রীয় কমিটি। গতকাল সোমবার সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলমের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়। সাজ্জাদকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের উপস্থিতিতে সংগঠনের প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবাদ জানিয়ে সাজ্জাদ ফেসবুকে লেখেন, ‘ছাত্র রাজনীতির শুরু থেকে বিএনপির যেসব কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি তার অধিকাংশই ছিল তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে। আজ (গতকাল) জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। প্রতিবাদ জানালাম।’ তিনি একই পোস্টে মন্তব্য ঘরে লেখেন, ‘যদিও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও জ্বালানি মূল্যে বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। মার্চ থেকে সারা বিশ্বে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলেও সরকার জণগণের কথা চিন্তা করে দাম কম রাখার ফলে মার্চ টু আগস্ট পর্যন্ত ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়। আশা করি, আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতিশীলতা আসার মাধ্যমে দেশেও দাম কমে আসবে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









