ইহলোক ত্যাগ করে অনন্তলোকের পথে পাড়ি জমালেন দেশের শিশুসাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ছড়াকার ও কবি আখতার হুসেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। আখতার হুসেনের স্ত্রী মল্লিকা হুসেন আগেই প্রয়াত হয়েছেন। দুই ছেলে পান্থ হুসেন ও প্রমিত হুসেনকে রেখে গেছেন তাঁরা।
নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বরে তাঁর জন্ম। অনেক দিন ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা ও মরণব্যাধি ক্যানসারে ভুগছিলেন। তাঁর দুই ছেলে পান্থ হুসেন ও প্রমিত হুসেন জানান, তাঁদের বাবার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ও শরীরে রক্তচাপ কমে গেলে প্রথমে তাঁকে ফার্মগেটের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখান থেকে বারডেম হাসপাতালে আনা হয়। এরপর তাঁকে গ্রিন লাইফ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। পরে আবার নেওয়া হয় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। সেখানে এক সপ্তাহ ধরে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণসহ নানা জটিলতার চিকিৎসা চলছিল আখতার হুসেনের। চার দিন আগে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। সেখান থেকে আর ফেরানো যায়নি।
ঢাকার তেজকুনী পাড়ায় তাদের বাসভবনের কাছে রেলওয়ে কলোনি জামে মসজিদে গতকাল আখতার হুসেনের প্রথম নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়। রাতে মরদেহ রাখা হয়েছিল বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সবার শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্যআজ শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আখতার হুসেনের মরদেহবাহী কফিন রাখা হবে। সেখান থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে সিরাজগঞ্জে। সেখানে স্ত্রীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে।
শিশুসাহিত্যের অপরিসীম ক্ষতি
আখতার হুসেনের ছড়ার ভাষা ছিল সহজ, প্রাণবন্ত ও স্বাভাবিক। শিশুরা যেন পড়তে গিয়ে আটকে না যায়, বরং শব্দের সঙ্গে খেলতে খেলতে এগিয়ে যেতে পারে, সেই স্বাভাবিক ছন্দ ছিল তাঁর ছড়ায়। তাঁর অনেক ছড়া বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে স্থান পেয়েছে। ফলে কোনো এক প্রজন্ম নয়, বহু প্রজন্মের শিশুর শৈশবের সঙ্গে মিশে আছে তাঁর লেখা।
মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোয় কলম হয়ে উঠেছিল অস্ত্র। কলম ধরেছিলেন দেশের সবচেয়ে গৌরবের অর্জন স্বাধীনতাসংগ্রামে আত্মনিবেদিত জাতির বীর সন্তানদের জন্য। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর লেখা এবং সুরকার অজিত রায়ের সুরে শিল্পী তিমির নন্দীর গাওয়া সেই কালজয়ী গান ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা/ আজ রুখবে তাদের কারা’ চিরকাল জাতির গৌরবের ইতিহাসের সঙ্গে অচ্ছেদ্য হয়ে থাকবে। অনুপ্রাণিত করবে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে।
মজার মজার ছড়া লিখে শিশুদের মন অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে দেওয়ার সেই মানুষটি চিরতরে চলে গেলেন। আখতার হুসেন আর কোনো দিন লিখবেন না ‘হ্যাঁরে খবরটা কী উড়ো’র মতো ছড়া, মায়াময় গল্প বা উদ্দীপনা জাগানো গান। যেমন মহান মুক্তিযুদ্ধকালে লিখেছিলেন ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা’। ছোটদের জন্য প্রায় ছয় দশক ধরে যে আনন্দের ভুবন সৃজন করে চলেছিলেন আখতার হুসেন, এবার তার যবনিকা নামল। আখতার হুসেনের প্রস্থানে দেশের শিশুসাহিত্যে সৃষ্টি হলো গভীর শূন্যতা। তবে শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেনের নশ্বর দেহ চলে গেলেও তিনি থেকে যাবেন শিশুদের নির্মল চিত্তে, থাকবেন মুক্তির গানে।
সাদাসিধে জীবন
অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন কাটিয়ে গেলেন আখতার হুসেন। খুব আন্তরিক, সুহৃদ, সদা হাস্যোজ্জ্বল নির্লোভ মানুষ ছিলেন তিনি। অনেকটাই তাঁর ছড়ার মতো সহজ–সরল। যেমন শিশুতোষ সাহিত্য রচনা করতেন তিনি, তেমনি স্বভাবও ছিল তাঁর শিশুসুলভ। খ্যাতিমান ছিলেন, কিন্তু খ্যাতির মোহে পড়েননি। আপন মনে নিজের কাজটি করে গেছেন। বিনয়ের সঙ্গে মাথা নিচু করে চলেছেন বরাবর। খুব সহজে অপরের সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন। শিশু, তরুণ প্রজন্ম ও সহকর্মীদের প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করতেন। অজাতশত্রু কথাটি সম্ভবত এমন মানুষদের জন্যই।
পেশাগত জীবনে সাংবাদিকতা করেছেন। দৈনিক সংবাদ, দৈনিক জনকণ্ঠ, প্রথম আলোসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। বাংলা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আখতার হুসেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথমা প্রকাশনের পাণ্ডুলিপি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে অবসরে যান। বাম চিন্তাধারায় বিভিন্ন সময় যুক্ত থেকেছেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর ও উদীচীর সঙ্গে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও খেলাঘরের দলীয় সংগীতের রচয়িতা তিনি। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি।
প্রকাশিত গ্রন্থ
আখতার হুসেন প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন। তাঁর ছড়া ও শিশুতোষ মৌলিক গ্রন্থ, জীবনী, অনুবাদ, সম্পাদিত গ্রন্থসহ প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এ সর্বাধিকসংখ্যক ভুক্তি লেখার কৃতিত্বও তাঁর। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ ‘ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস’ ইত্যাদি।
পদক ও পুরস্কার
সাহিত্যে অবদান রাখায় আখতার হুসেন ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’, ‘অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার’, ‘আলাওল সাহিত্য পুরস্কার’, ‘ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতি পদক’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ প্রদত্ত ‘মুক্তিযোদ্ধা কলম সৈনিক সম্মাননা স্মারক’, ‘মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার’, ‘এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার’, ‘বজলুর রহমান স্মৃতিপদক’সহ আরো অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমির ফেলো।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









