দেশের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা ধারণক্ষমতার প্রায় তিনগুণ। কোনো কোনো জেলখানায় একজন কয়েদির জায়গায় থাকছে তিন-চারজন। রাজনৈতিক ও কিশোর গ্যাং ইস্যুতে কারাগারে বন্দির সংখ্যা হু-হু করে বেড়ে চলেছে। কারাগারের সেলে স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেক বন্দিকে সেলের ভেতরে রাত কাটাতে হচ্ছে নির্ঘুম রাত। এছাড়া মাদকাসক্ত ও কিশোর অপরাধীদের আলাদা করার কারণে বেগ পেতে হচ্ছে জেলখানাগুলোতে। শুধু তা-ই নয়, ছোট সেলে অধিকসংখ্যক বন্দি থাকায় চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বন্দিরা।
কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, কারাগারের আরেকটি স্পর্শকাতর বিষয় হলো বিদেশি বন্দি। ভাষা-সংস্কৃতিগত সমস্যা ও ভিন্ন খাদ্যাভ্যাসের কারণে তাদের কারাগারে রাখতে নানামুখী চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়। এসব বিদেশি বন্দি নিয়ে বেকায়দায় রয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। বিদেশি বন্দির মধ্যে বেশির ভাগেরই সাজার মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু তাদের মুক্তি দেওয়া যাচ্ছে না। শুধু তা-ই নয়, তাদের নিজ নিজ দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে সংবাদ পাঠানো হলেও স্বজনদের পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর আসেনি। এর ফলে কারা কর্তৃপক্ষ তাদের মুক্তি দিতে পারছে না। জেলগেট থেকে তাদের রিসিভ করা বা বুঝে নেওয়ার মতো কোনো স্বজনকে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই নিরাপত্তার কারণে তাদের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি কারাগারে আটকাবস্থায় হাসপাতালে মারা গেলে স্বজনদের না পেয়ে সেই মরদেহ নিয়েও বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষকে।
সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও, দেশের কারাগারে বন্দি ১৫৭ বিদেশি নাগরিক। এর মধ্যে, ছয় মাসের সাজার মেয়াদ শেষে ২১ বছর ধরে কারাগারে এক ভারতীয় নাগরিক। এছাড়া পাঁচ দিনের সাজায় ১০ বছর ধরে জেলে আছেন আরেকজন।
কারা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন অপরাধের সাজা শেষে প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় থাকা ১৫৭ বিদেশি কারাবন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে ১৫০ জন ভারতের, পাঁচজন মিয়ানমারের এবং একজন করে পাকিস্তান ও নেপালের নাগরিক। এদের মধ্যে ১৯ জনের মতো নারী রয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, সাজা খাটা শেষ হলেও অন্য দেশের নাগরিক হওয়ায় সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে এসব ব্যক্তিকে নিজ দেশে প্রত্যাবাসন করতে হয়। সেই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের মুক্তি দেওয়াও সম্ভব নয়।
কারাসূত্র বলছে, দেশের ৭৪টি কারাগারে বন্দির সংখ্যা ধারণক্ষমতার প্রায় তিনগুণ। তাদের মধ্যে বেশির ভাগ বন্দি আছেন বিচারাধীন মামলায়। দণ্ডপ্রাপ্ত না হয়েও দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হচ্ছে অনেককে। অতিরিক্ত বন্দির চাপে কারাগারের নিরাপত্তা, আবাসন, চিকিৎসা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় সংকট তৈরি হচ্ছে। বন্দিদের গাদাগাদি করে রাখায় সংক্রামকসহ বিভিন্ন রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ছে। এদিকে রাজনৈতিক হেভিওয়েট বন্দির ভিড়ে প্রকৃত অসুস্থ বন্দিরা কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতালে ভর্তি এবং সুষ্ঠু চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছে না।
সাজাপ্রাপ্ত কয়েদির চেয়ে হাজতি বেশি হওয়ায় তাদের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে চলছে কারাগারগুলো। বন্দিরা পাচ্ছে না কারাবিধি অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা।
সাবেক কারা কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের কারাগারগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই এ অবস্থা চলে আসছে। আসামিদের প্রায় ৭০ ভাগই বিচারাধীন মামলার হাজতি হওয়ায় প্রতিনিয়ত তাদের সংখ্যা পরিবর্তন হয়। এমন নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেই চলছে কারা অধিদপ্তর।
কারা অধিদপ্তর বলছে, দেশের ৭৪টি কারাগারে সম্মিলিত ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। বর্তমানে সেখানে বন্দি আছেন ১ লাখ ৬ হাজার ৮০৩ জন। এর মধ্যে হাজতি ৭২ হাজার ২৯১। বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডপ্রাপ্ত ৩৫ হাজার এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি ৬ হাজার ৬২৩ জন। সক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দির ব্যবস্থাপনায় হিমশিম খাচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ।
কারা অধিদপ্তরের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক মেজর অব শামসুল হায়দার সিদ্দিকী দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘যে পরিমাণ বন্দি রয়েছে, তাদের জন্য কিন্তু সেই পরিমাণ টয়লেট বা ওয়াশরুম নেই। রাজনৈতিক কারণে বন্দি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি এক দিন, দুই দিন বা ১৫ দিন ঘটতে পারে। তারপর কিন্তু আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার কথা।’
কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, কারাগারের আরেকটি স্পর্শকাতর বিষয় হলো বিদেশি বন্দিরা। ভাষা-সংস্কৃতিগত সমস্যা ও ভিন্ন খাদ্যাভ্যাসের কারণে তাদেরকে কারাগারে রাখতে নানামুখী চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়। কারাবন্দি এই বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে সাধারণত অনুপ্রবেশের দায়ে দ্য কন্ট্রোল অব এন্ট্রি অ্যাক্ট-১৯৫২, পাসপোর্ট আইন-১৯৫২ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলায় হয়েছে।
এ বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল দৈনিক এদিনকে বলেন, সরকার কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করার জন্য চেষ্টায় আছে। এর কিন্তু একটা প্রভাব কারাগারে আছে। বন্দির সংখ্যাটা দেখলেই বুঝবেন বাইরে সরকার কতটা চেষ্টা করছে। কিশোর বন্দির সংখ্যা এখন বেড়ে গেছে। মাদকের ব্যাপারে এই সরকার খুবই কঠোর। মাদকের বিরোধী আইন পাস করেছে। মাদকের মামলায় গ্রেপ্তারের কারণে কারাগারে বন্দির সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









