বঙ্গোপসাগরকে সংঘাতের ক্ষেত্র না বানিয়ে বাংলাদেশ শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার অঞ্চল হিসেবে রাখতে চায় বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। গতকাল সোমবার ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর তৃতীয় দিনের একটি অধিবেশনে তিনি বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়াতে হবে।
এদিকে সরকারি সেবায় পুরোনো ও দুর্বল ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যুক্ত করলে মানুষের আস্থা তৈরি হবে না বলে অন্য একটি অধিবেশনে মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) তিনদিনের এই সম্মেলন শেষ হয়েছে। একটি অধিবেশনের বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্বও ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। তাই বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত সুযোগে পরিণত করতে হবে। বঙ্গোপসাগর দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাজার, সমুদ্রপথ ও দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিগুলোর সংযোগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ চায়, এটি শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে থাকুক; সংঘাতের মঞ্চে পরিণত না হোক।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি জাতীয় স্বার্থ। সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা সুরক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণ এবং জাতীয় উন্নয়নের অনুকূল আন্তর্জাতিক পরিবেশ তৈরি করাও এর লক্ষ্য। পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় বাংলাদেশ।’ বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের মধ্যে কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার বিষয় হিসেবে দেখে না বাংলাদেশ। যেখানে স্বার্থের মিল রয়েছে, সেখানে সহযোগিতা ও মতপার্থক্য থাকলে সংলাপের মাধ্যমে তা মোকাবিলা করা হবে।’
অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক নীতিকে এখন আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বাজার, সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের বিষয়গুলো কূটনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোকে বাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও দেশের পণ্যের জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতে আরও সক্রিয় হতে হবে।’
আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সাইবার, খাদ্য, জ্বালানি, পানি, জলবায়ু ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো অপ্রচলিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তদেশীয় সহযোগিতা প্রয়োজন।’
জলবায়ু পরিবর্তন ও রোহিঙ্গা সংকটকেও বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বড় প্রভাব দেশটিকে বহন করতে হচ্ছে। এ কারণে জলবায়ু ন্যায়বিচার, অভিযোজন অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।’
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির বলেন, ’বাংলাদেশ ১০ লাখের বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। তবে মানবিক সহায়তা এই সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়; এর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সমাধান প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই চূড়ান্ত লক্ষ্য।’ হুমায়ুন কবির আরো বলেন, ’পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ শুধু পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াবে না, বরং তা গঠনে ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশকে শান্তির অংশীদার, আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্র, বিনিয়োগের গন্তব্য ও বৈশ্বিক দক্ষিণের দায়িত্বশীল কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।’
এআই ব্যবহারে নাগরিকদের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ
বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের শেষ দিনের অন্য একটি অধিবেশনে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এআই ব্যবহারের আগে সিস্টেম সংস্কার, স্থানীয় ও মানসম্মত তথ্য নিশ্চিত এবং তথ্য ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে হবে। এআই কীভাবে ও কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে নাগরিকদের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।
‘ক্যান অ্যালগরিদমস বিল্ড ট্রাস্ট? রিথিংকিং স্টেট ক্যাপাসিটি ইন দ্য এজ অব এআই’শীর্ষক অধিবেশনে অ্যাকাউন্টেবিলিটি ল্যাব পাকিস্তানের নির্বাহী পরিচালক ফাইয়াজ ইয়াসিন বলেন, সরকার ও জনগণের মধ্যে আগে থেকেই আস্থার বড় ঘাটতি রয়েছে। এই অবস্থায় এআই সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়াকে দ্রুত করবে, নাকি আরও ১০-১৫ বছর সমস্যা সমাধান না করার অজুহাত হয়ে উঠবে, সেই প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, এআই ব্যবহারের আগে সরকারকে বুঝতে হবে, তারা এই প্রযুক্তির কাছ থেকে কী চায়। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা, আমলাতন্ত্র ও সাধারণ মানুষকেও এআই ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে ফাইয়াজ ইয়াসিন বলেন, সেখানে এখনো অধিকাংশ সরকারি সিদ্ধান্ত তথ্যভিত্তিক নয়। অথচ এআই কার্যকর করতে হলে আগে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত তথ্য দরকার।
সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্স বাংলাদেশের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ দানিয়াল বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে ভালো ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরি করেও লাভ হবে না, যদি সেই ব্যবস্থার পেছনের সিস্টেম পরিবর্তন করা না হয়। সরকারি সেবার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সরকারি সেবায় প্রচলিত ব্যবস্থায় ফাইল এগিয়ে নিতে ঘুষ দেওয়ার সুযোগ থাকলে ডিজিটাল ব্যবস্থা করেও মানুষের আস্থা তৈরি করা যাবে না। এআই ব্যবহারে স্থানীয় বাস্তবতা ও তথ্যের গুরুত্বের কথা বলেন অর্থনীতিবিদ ও এআই গবেষক শিমেলসে মেকোনেন।
তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র বা চীনে তৈরি এআই মডেল অন্য দেশে ব্যবহার করা গেলেও স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। মডেল যে তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত, সেই তথ্য বর্তমান স্থানীয় পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এআইয়ের ভুলের ঝুঁকি বিবেচনা করে শুরুতে তুলনামূলক কম ঝুঁকির সরকারি সেবায় এ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শও দেন তিনি।
মানুষকে সম্পৃক্ত না করে অ্যালগরিদমের ওপর আস্থা তৈরি কঠিন বলে মনে করেন সোলশেয়ারের প্রধান নির্বাহী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সেবাস্তিয়ান গ্রোহ। তিনি বলেন, যাদের জন্য অ্যালগরিদম কাজ করবে, সেটি তৈরির সময় তাদের তথ্য ও মতামত নিতে হবে। প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের কাজে লাগছে, সেটি তাদের বুঝতে দিতে হবে। অ্যালগরিদমের সিদ্ধান্তে সমস্যা হলে অভিযোগ বা প্রতিকারের সুযোগও রাখতে হবে। মানুষের কাছে প্রযুক্তির উপকার দৃশ্যমান না হলে শুধু প্রযুক্তির ওপর আস্থা তৈরি হবে না বলে মনে করেন তিনি।
প্রযুক্তি ব্যবহারে শুধু নতুন ব্যবস্থা তৈরি করাই যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন অ্যাকাউন্টেবিলিটি ল্যাব নেপালের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পরিচালক নারায়ণ অধিকারী। তাঁর মতে, প্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাচ্ছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আস্থা তৈরির জন্য শুধু ‘মেশিন মাইন্ডসেট’ দিয়ে কাজ না করে মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও পারস্পরিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
অ্যালগরিদম কীভাবে মানুষের মতামত ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে, সে বিষয়টিও অধিবেশনের আলোচনায় উঠে আসে। সিটি ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের সহযোগী অধ্যাপক মার্কো স্কোরিক বলেন, অ্যালগরিদমের অতিরিক্ত বাছাইয়ের কারণে মানুষ একই ধরনের বিষয় বারবার দেখতে থাকে। ফলে ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ কমে যায়। এভাবে মানুষ ক্রমে ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে কথা বলতেও অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। এতে সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে আস্থার সংকটও বাড়তে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









