জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সেপ্টেম্বরে খাদ্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় মূল্যস্ফীতির পারদ কিছুটা চড়েছে। চলতি অর্থবছরের তৃতীয় এই মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৩৪ শতাংশ। তবে, মূল্যস্ফীতি বাড়লেও সেপ্টেম্বরে মজুরি সূচক কমে জাতীয় গড় মজুরির হার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ।
অন্যদিকে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৮২ কোটি ডলার। এই অঙ্ক গত অর্থবছরের একই মাসের চেয়ে ২৯ শতাংশ বেশি। এছাড়া, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) পরিশোধিত তেল আমদানির দরপত্রে বিডিং বা প্রতিযোগিতামূলক মূল্য প্রস্তাবের সময় ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ২১ দিন করার অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গতকাল বুধবার মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে জানিয়েছে, গত ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের শেষ মাস জুনে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে দেশে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়ায় ৮.৩২ শতাংশ, যা ছিল আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম। পরের মাস আগস্টে এর হার আরও কমে ৮.২৬ শতাংশে দাঁড়ায়। বিদায়ী সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৩৪ শতাংশ। তবে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল দেশে। সেই হিসেবে এ বছরের এই মাসে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কম।
সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির মানে হচ্ছে- গত বছরের সেপ্টেম্বরে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলেছে, তা এখন কিনতে খরচ করতে হয়েছে ১০৮ টাকা ৩৪ পয়সা। বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়লেও খাদ্যবহির্ভুত মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ; আগের মাস আগস্টে হয়েছিল ৭ দশমিক শূন্য দুই শতাংশ। অন্যদিকে সেপ্টেম্বরে খাদ্যবহির্ভুত খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ, আগস্টে হয়েছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।
১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে সরকার।
সেপেম্বরে গ্রামের পাশাপাশি শহরেও সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে এ মাসে গ্রামীণ এলাকায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আগের মাস আগস্টে গ্রামে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। যার মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক শূন্য এক শতাংশ; খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অন্যদিকে সেপ্টেম্বর মাসে শহরাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ; খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ। আগস্টে শহর এলাকায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। যার মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৭ দশমিক শূন্য চার শতাংশ; খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে আন্দোলনের ধাক্কায় দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে উঠেছিল। ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ। জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরের কয়েক মাস সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যেই ওঠানামা করছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে রাখার লক্ষ্য ধরেছিল অন্তবর্তী সরকার। তবে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ গড় মূল্যস্ফীতি নিয়ে শেষ হয়েছিল ওই আর্থিক বছর। এদিকে সেপ্টেম্বর শেষে (২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর) দেশে গড় মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিন মাস পর গত জুলাইয়ে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামে। গত এপ্রিলে ৯ দশমিক শূন্য চার শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল দেশে। মে মাসে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উঠেছিল। জুনে তা সামান্য কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নামে। জুলাইয়ে তা থেকে আরও দশমিক ৮৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৯ শতাংশের নিচে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছিল, আগস্টে তা আরও কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নামে। চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৫৮ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল দেশে। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে ওঠে। মার্চে অবশ্য কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমেছিল। এরপর টানা তিন মাস ৯ শতাংশের ওপরে ছিল।
জ্বালানি তেলের ‘মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায়’ নিম্মমুখী মূল্যস্ফীতি ফের ঊর্ধ্বমূখী হওয়ার কথা বলেছেন অর্থনীতির গবেষক বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও। তিনি বলেন, ‘গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ায় সরকার। এতে পরিবহন, খাদ্যপণ্যসহ অনেক জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। ওই মাসের ১০ দিনে তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে জিনিসপত্রের দামে। এর প্রভাব আগামী দিনেও পড়বে। সে কারণে আগামী দু-এক মাস মূল্যস্ফীতি কমবে না বলেই মনে হচ্ছে।’
মজুরি সূচক কমেছে
মূল্যস্ফীতি বাড়লেও চলতি অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে মজুরি সূচকও কমেছে। এ মাসে জাতীয় গড় মজুরির হার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। আগের মাস অগাস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ। এর মানে হল, সেপ্টেম্বরেও মূল্যস্ফীতি মজুরি হারের চেয়ে বেশিই রয়ে গেছে।
মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। প্রকৃত আয় কমে যায়। মূল্যস্ফীতির তুলনায় আয় না বাড়লে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়। কিংবা খাবার, পোশাক, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে কাটছাঁট করতে হয়। মানুষের আয় বেশি বাড়লে জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও তা কিনতে তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু দেশে সাড়ে চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম।
সাধারণত প্রতি মাসে যত মূল্যস্ফীতি হয়, এর বেশি হারে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধি হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মজুরি বৃদ্ধির হারকে টপকে যায় মূল্যস্ফীতি। বিবিএসের তথ্য অনুসারে, ওই মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। আর মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। এরপর আর কোনোমাসেই মূল্যস্ফীতিকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি মজুরি সূচক।
দুই মাসে বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়েছে ২৯ শতাংশ
এদিকে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৮২ কোটি ডলার। এই অঙ্ক গত অর্থবছরের একই মাসের চেয়ে ২৯ শতাংশ বেশি। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২৯৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। মূলত, জ্বালানি তেল আমদানিতে অস্বাভাবিক ব্যয়বৃদ্ধিতেই এই ঘাটতি বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরাও।
১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ আর্থিক বছরের তিন মাস পার হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মঙ্গলবার এই অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট-বিওপি) তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, জুলাই-আগস্ট সময়ে মোট এক হাজার ২২০ কোটি (১২.২০ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য আমদানি করেছেন দেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা। এ অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের এই দুই মাসে এক হাজার ৮৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছিল। এর বিপরীতে চলতি অর্থবছরের জুলাই-অগাস্টে পণ্য রপ্তানি থেকে ৮৩৮ কোটি (৮.৩৮ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছেন রপ্তানিকারকরা, যা আগের গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই দুই মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে ৭৯২ কোটি ৪০ লাখ (৭.৯২ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়েছিল। এ হিসাবেই জুলাই-অগাস্ট সময়ে পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার।
এই দুই মাসে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২৪৯ কোটি ৩০ লাখ (২.৪৯ বিলিয়ন) ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের দ্বিগুণ। শতাংশ হিসাবে বেড়েছে ১০০ শতাংশ বেশি। ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের জুলাই-অগাস্টে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ১২৪ কোটি (১.২৫ বিলিয়ন) ডলার। অন্য কোনো পণ্য আমদানিতে এত ব্যয় বাড়েনি। কোনো কোনো পণ্য আমদানিতে ব্যয় উল্টো কমেছে। যেমন, মূলধনী পণ্য (যে পণ্য অন্য পণ্য বা সেবা উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হয়; মেশিন, কারখানার যন্ত্রপাতি, উৎপাদন সরঞ্জাম) আমদানি কমেছে ২০ শতাংশ। চাল আমদানিতে ব্যয় কমেছে ৭৮ দশমিক ৩০ শতাংশ।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় বাড়ার কারণেই মূলত বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। প্রতি বছরই তেলের চাহিদা বাড়ে। চাহিদা বাড়ার কারণে ব্যয় একটু বাড়ে। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাজার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, দাম বেড়ে যায়। এখনও সেই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় চলতি আর্থিক বছরেও তেল আমদানিতে অনেক বেশি অর্থ খরচ হচ্ছে।
দুই হাজার ৭২৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৫-২৬ আর্থিক বছর, যা ছিল আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৩৪ শতাংশ বেশি। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি। ডলার সংকটে আমদানি ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল, তার সুফলও মিলেছিল। আমদানি ব্যয় বেশ কমে এসেছিল। তাতে বাণিজ্য ঘাটতিও অনেকটা কমে শেষ হয়েছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছর। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও সেই একই পথ অনুসরণ করে চলে। এতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বাণিজ্য ঘাটতিতে নিম্মমুখী প্রবণতাই দেখা যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি নয় শতাংশ কমে দুই হাজার ৪৫ কোটি ডলারে নেমেছিল। আগের অর্থবছরে এই ঘাটতি ছিল দুই হাজার ২৪৩ কোটি ডলার। অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি তিন হাজার ৩২৫ কোটি ডলারে উঠেছিল।
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে (ব্যালান্স অব পেমেন্ট-বিওপি) উদ্বৃত্ত নিয়ে শুরু হয়েছে অর্থবছর। ২০২৬-২৬ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকে ৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এই দুই মাসে উদ্বৃত্ত ছিল ১৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার। তবে ১৫৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতি নিয়ে শেষ হয়েছিল অর্থবছর। ২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে এই ঘাটতি ছিল মাত্র ১৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
ব্যালান্স অব পেমেন্টে উদ্বৃত্ত থাকলেও আর্থিক হিসাবে (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) বড় ঘাটতি নিয়ে শুরু হয়েছে অর্থবছর। দুই মাসেই (জুলাই-অগাস্ট) ঘাটতি ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে ১১৪ কোটি ২০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের বড় উদ্বৃত্ত নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৫-২৬ অর্থবছর। ৩৫৯ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত নিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যেও (ওভারঅল ব্যালান্স) ঘাটতি নিয়ে শুরু হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছর। এই আর্থিক বছরের জুলাই-অগাস্টে ৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
৬৬০ কোটি ডলারের বড় উদ্বৃত্ত নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৫-২৬ অর্থবছর। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হয়েছিল ৩৩৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত নিয়ে। আর ৪৩০ কোটি ডলারের বিশাল ঘাটতি নিয়ে শেষ হয় ২০২৩-২৪ অর্থবছর। এদিকে চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে ২২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের ডলারের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) পেয়েছে বাংলাদেশ, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ কম। ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের এই দুই মাসে ২৪ কোটি ৩০ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছিল দেশে। পুরো অর্থবছরে (২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন) ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ (১.৪৬ বিলিয়ন) ডলারের নিট এফডিআই এসেছিল, যা ছিল আগের বছরের চেয়ে ১৫ শতাংশ কম।
বিপিসির পরিশোধিত তেল আমদানি দরপত্রের মূল্য প্রস্তাব অর্ধেকে
আগামী বছরের জন্য সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) সরাসরি অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। সভায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) পরিশোধিত তেল আমদানির দরপত্রে বিডিং বা প্রতিযোগিতামূলক মূল্য প্রস্তাবের সময় ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ২১ দিন করারও অনুমোদন দেওয়া হয়। মূলত পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ সংকটের মধ্যে আমদানির সময় কমানোর লক্ষ্যে এমন সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ৪৮তম বৈঠকে এসব প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলছে, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন সময়ে বিপিসির পরিশোধিত তেল আমদানিতে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে দরপত্র প্রস্তুত ও দাখিলের সময়সীমা ৪২ দিনের বদলে ২১ দিন করার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ছয় মাসের এই আমদানি দরপত্রের মাধ্যমে হলেও বিডারদের হাতে সময় থাকবে আগের তুলনায় অর্ধেক। দ্রুত দরপত্র শেষ করে আমদানি করতে চায় সরকার। বৈঠকে জ্বালানির সরবরাহের অপর প্রস্তাবে বলা হয়, ২০২৭ পঞ্জিকাবর্ষে ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসিতে (ইআরপিএলসি) প্রক্রিয়াকরণের জন্য অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানি করা হবে। এ জন্য সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির আওতায় জিটুজি প্রক্রিয়ায় কেনার নীতিগত অনুমোদন চাওয়া হয়েছিল। কমিটি তা সুপারিশ করেছে।
এছাড়া ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরাসরি জিটুজি প্রক্রিয়ায় কেনারও নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সভায় বিদ্যুৎ খাতের একটি প্রস্তাবও অনুমোদনের সুপারিশ পেয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের ৪০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল (ইস্ট) বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সংশোধিত ট্যারিফ কাঠামো (রেফারেন্স ট্যারিফ) অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেনার লক্ষ্যে পুনর্নির্ধারিত লেভেলাইজড ট্যারিফ অনুমোদনের প্রস্তাব এসেছিল বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে।
প্রস্তাবে মূল চুক্তিমূল্য ধরা হয়েছে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা ৩.৭০০ মার্কিন সেন্ট, যা টাকায় প্রায় ৪.৫ টাকার সমান। ক্রয় কমিটির সভায় এছাড়াও কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য মরক্কোর ওসিপি নিউট্রিক্রপস থেকে ৮০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানি, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে হাওর এলাকায় উড়াল সড়ক ও ভৌত অবকাঠামো প্রকল্পের ২৬৪ কোটি টাকার নির্মাণ কাজ, স্বাস্থ্য খাতের কয়েকটি ক্রয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক নিয়োগ এবং সড়ক বিভাগের দুটি প্রস্তাবেও সায় মেলে সভার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









