‘চাইল-ডাইলের দাম বাড়ে, প্রতিবাদ অয়; ত্যাল-গ্যাসের দাম বাড়ে, আন্দোলন অয়। কিন্তু এই যে ওষুদের দাম দিনকে দিন খালি বাড়তাছেই। কেউ তো কুনো আওয়াজও করে না! ওষুদ কি খালি বড়লোকগোই লাগে? আমরা গরিব মাইনষের লাগে না! আমার আগে মাসে হাজার ট্যাকার ওষুদ লাগতো, হেই ওষুদ আইজ কিনলাম তেরো শ ট্যাকায়।’ রাগে গজরাতে গজরাতে কথাগুলো একদমে বলে গেলেন রাজধানীর কড়াইল বস্তির বৃদ্ধ আরফান মিয়া।
শুধু আরফান মিয়া নন, ওষুধের দামের ঊর্ধ্বগতির জাঁতাকলে পিষ্ট এখন সাধারণ সব মানুষই। অতিরিক্ত দামের কারণে অসুস্থ নিম্নবিত্ত পরিবারের লোকজনের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে বহু ওষুধ। সারাদেশে ওষুধের দাম বেড়েই চলেছে। কিন্তু ওষুধের দাম বাড়লেও অনেক মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না।
দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় এখন আকাশচুম্বী। পুষ্টিকর খাবারের বাজেট কাটছাঁট করলেও ওষুধের খরচ কমাতে পারছে না মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। পাড়া-মহল্লায় ফার্মেসিও বেড়ে চলেছে। সেখানে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি সমস্যার ওষুধ কিনতে মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। ওষুধের দাম বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়েছে। তবে এসব ফার্মেসির তদারকি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কেননা বিভিন্ন সময়ে অনেক ফার্মেসির বিরুদ্ধে নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।
সম্প্রতি গবেষণা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট’(র্যাপিড)-এর এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেশের দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্য-ব্যয়ের এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। রাজধানী ঢাকার মিরপুর, শাহবাগ, ধানমন্ডির অন্তত ১০টি ওষুধের দোকান ঘুরে দেখা যায়, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ থেকে শুরু করে শিশুদের ওষুধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় মেডিকেল পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে আছে কাজী ফার্মেসি।
এই ফার্মেসির বিক্রয়কর্মী সোহেল জানান, স্কয়ার কোম্পানির ডায়াবেটিসের ওষুধ কমেট আগের বছর ৪০ টাকা পাতা ছিল (১০ পিস)। এখন প্রতি পাতা ৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। স্কয়ারের কোরাক্স আগে পিস ১২ টাকা ছিল, এখন ২০ টাকা। জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক সেফথ্রি ২০০ এমজির দাম ছিল ৩৫ টাকা। এখন ৪৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে র্যাডিয়েন্ট কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক ২০০ এমজি (একই জেনেরিক) এখন প্রতি পিসের দাম ৫২ টাকা। এক বছর আগে পাওয়া যেত ৩৫-৩৮ টাকায়।
পাশের ওষুধের দোকানের বিক্রয়কর্মীরা জানান, অ্যাজিথ্রো মাইসিন (৫০০ এমজি) প্রতি পিস দেড় বছর আগে ছিল ৩০ টাকা। এখন সেটি ৪০ টাকার কমে পাওয়া যায় না। নাপা এক পাতার দাম ৮ টাকা ছিল। এখন ১২ টাকায় বিক্রি হয়। অ্যাভোলাক সিরাপ (অ্যারিস্টোফার্মা) দুই বছর আগে ১০০-১২০ টাকায় মিলত। এখন দাম ২০০ টাকা। ৭ টাকার নিচে কোনো গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেট-ক্যাপসুল পাওয়া যায় না, যা ৫ টাকায় আগে বিক্রি হতো। জীবন রক্ষাকারী ওরস্যালাইন এখন ৬ টাকায় বিক্রি হয়। এক বছরে ২০ শতাংশ বেড়েছে স্যালাইনের দাম। ফেক্সো ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগে ৮০ টাকা ছিল। নাপা সিরাপের দাম ২০ টাকা ছিল, এখন ৩৫ টাকার নিচে পাওয়া যায় না।
এছাড়া সাধারণ ওষুধের দোকানে ৪০ পিসের ডায়াপারের দাম যেখানে ৬৫০ টাকা। সুপার মেডিকেল শপ লাজফার্মায় এটি বিক্রি হয় ৭৩০ টাকায়। জেনসুলিন আর ভায়াল ইনসুলিন সাধারণ ফার্মেসিতে পাওয়া যায় ৩৯০ টাকায়। লাজফার্মায় এর দাম ৪১৫ টাকা। যদিও প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা এর কারণ জানাতে পারেননি।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য-ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশ নাগরিককে নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যার অর্ধেকেরও বেশি (প্রায় ৬৪ শতাংশ) খরচ হয় শুধু ওষুধ কেনার পেছনে। এই অতিরিক্ত খরচের কারণে দেশের নিম্ন আয়ের ৪০ শতাংশ মানুষের মোট ব্যয়যোগ্য আয়ের ২০ শতাংশই চলে যাচ্ছে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ কিনতে। এর মধ্যেই বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (বাপি) জ্বালানি সংকটের কারণে ওষুধের আরেক দফা মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রিত ওষুধের সরকারি দাম স্থির ছিল। ২০২২ সালে ৫৩টি ব্র্যান্ডের দাম বাড়ে। প্যারাসিটামল ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ২০ পয়সা, মেট্রোনিডাজল ৬০ পয়সা থেকে ১ টাকা করা হয়। ২০২৩ সালেও কিছু ওষুধের দাম বাড়ানোর অনুমতি দেওয়া হয়। তবে ২০২৪ সালে বাজারে ওষুধ কোম্পানিগুলোর নিজস্বভাবে দাম বাড়ানোর অভিযোগ পাওয়া যায়। অন্তত ৫০ ধরনের ওষুধের দাম ২০ থেকে ১৪০ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়।
তথ্য বলেছে, দেশে ২ লাখ ১৬ হাজার ৭৯১টি লাইসেন্সধারী ফার্মেসি রয়েছে। তবে তাদের অনলাইন ডেটাবেসে ১ লাখ ৬১ হাজার ২৯৩টি ফার্মেসি তালিকাভুক্ত রয়েছে। বাকি ৫৫ হাজার ৪৯৮টি লাইসেন্স কী অবস্থায় আছে এ বিষয়ে জানা যায়নি। এ বিষয়ে জানতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আকতার হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। মেসেজ দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ওষুধের ব্যবহার বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে চিকিৎসা খরচও। মফস্বল এলাকায় ৭০ শতাংশের বেশি অ্যান্টিবায়োটিক কোনো নিবন্ধিত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই সরাসরি ফার্মেসি থেকে কিনে সেবন করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের প্রতি ছয়টির মধ্যে একটি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। সাধারণ টাইফয়েড, মূত্রনালির সংক্রমণ ও নিউমোনিয়া রোগের চিকিৎসা জটিল এবং ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে।
এ বিষয়ে বাপির মহাসচিব মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান দৈনিক এদিনকে জানান, তীব্র গ্যাস সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কারখানা সচল রাখতে জেনারেটর ও বিকল্প জ্বালানির (ডিজেল) ওপর তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে। যেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের সরকারি দর ১৫ টাকা, সেখানে জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদন করতে খরচ পড়ছে প্রায় ৪২ টাকা।
শুধু তাই নয়, অতিরিক্ত ব্যয় ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে ওষুধের দাম সমন্বয় না করায় ইতোমধ্যেই দেশের ১১৭টি অতিপ্রয়োজনীয় ওষুধের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশেরই উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন উৎপাদকরা। নেতারা স্পষ্ট জানান, এই দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট ও বর্ধিত উৎপাদন খরচ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে একপর্যায়ে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি বা সমন্বয় করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় থাকবে না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বে-নজীর আহমেদ বলেন, পৃথিবীতে এত ওষুধের দোকান কোথাও দেখিনি। এসব দোকানে কী ওষুধ বিক্রি হচ্ছে সেটিও দেখা হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে যেন ওষুধ থাকে- এ বিষয়ে সরকারকে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। যেন গ্রামের দরিদ্র মানুষরাও ওষুধ কিনে খেতে পারেন। কিন্তু ঔষধ প্রশাসনের জনবল সংকট ও সীমাবদ্ধতার কারণে কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি কমে এসেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









