কারও ছুটি শেষ, ফিরতে হবে কর্মস্থলে; কারও ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন সৌদি আরবগামী অনেক বাংলাদেশি। চোখমুখে দুশ্চিন্তা নিয়ে তারা অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। এর মধ্যেই আবার বিকল্প ফ্লাইটের টিকিট হাতে পেয়ে কারও মুখে স্বস্তির হাসি। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে গত শনিবার রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুতিদের হামলার পর সৌদি আরবের দুটি বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়।
তার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবগামী ফ্লাইটেও। গতকাল সোমবার বিকাল পর্যন্ত ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ও ট্রানজিট মিলিয়ে ৫১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন এসব ফ্লাইটের ৫ হাজার ৪১৮ জন যাত্রী। এ পরিস্থিতিতে রিয়াদগামী যাত্রীদের বিকল্প পথে মদিনা হয়ে সৌদি আরবে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
গতকাল সোমবার বিকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রধান কার্যালয় বলাকা ভবনে গিয়ে দেখা যায় সৌদি আরবগামী উৎকণ্ঠিত যাত্রীদের ভিড়। তাদের কেউ বিকল্প ফ্লাইটের টিকিট পেয়েছেন। আবার কেউ টিকিটের অপেক্ষায় রয়েছেন। বিকল্প ফ্লাইটের টিকিট পাওয়া যাত্রী রাজিব আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে চাকরি নিয়ে ঝুঁকিতে পড়তে পারেন তিনি। এর প্রভাব পড়বে দেশে থাকা তার পরিবারের ওপরও। বিকল্প পথে সৌদি আরবে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ায় এখন কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন।
তিনি বললেন, ছুটি শেষে সময়মতো কর্মস্থলে ফেরার কথা ছিল। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। দেরি হলে চাকরি নিয়ে সমস্যা হতে পারে, পরিবারও দুশ্চিন্তায় থাকে। এখন বিকল্প টিকিট পেয়েছি। আশা করছি, দ্রুত সৌদি আরবে পৌঁছাতে পারব। অন্যদিকে শাওন শেখ নামে একজন তখনো ছিলেন বিকল্প ফ্লাইটের টিকিটের অপেক্ষায়। তিনি যে ফ্লাইটের টিকিট কিনেছিলেন, তাও বাতিল হয়েছে।
শাওন শেখ বললেন, ‘ফ্লাইট বাতিল হওয়ার পর থেকে চিন্তায় আছি। ভিসার মেয়াদ ও কর্মস্থলে ফেরার সময়— দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। কখন টিকিট পাব, কবে যেতে পারব, তা এখনো নিশ্চিত নই। দ্রুত বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা হলে আমাদের অনেক দুশ্চিন্তা কমত।’
বিমানের টিকিট কাউন্টারের এক কর্মী জানালেন, রিয়াদ ও দাম্মামগামী যাত্রীদের মদিনা হয়ে সৌদি আরবে পাঠানো হচ্ছে। যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে এবং যাদের রিয়াদগামী ফ্লাইটের টিকিট ছিল, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বাতিল হওয়া ফ্লাইটের টিকিট ক্যানসেলেশন ফি ছাড়াই আবার ইস্যু করার ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে বলে ওই বিমানকর্মী জানালেন। সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে সীমিত চলাচলের কারণে বেশ কয়েকটি এয়ারলাইনসের ফ্লাইট সূচিতে বিঘ্ন ঘটেছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) জনসংযোগ কর্মকর্তা কাওসার মাহমুদের আগামীর সময়কে দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে ১২টি।
এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চারটি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের দুটি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের তিনটি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের তিনটি ফ্লাইট। এ ছাড়া ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল হয়েছে ৩৯টি। এর মধ্যে ১৬টি ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের, তিনটি সালাম এয়ারের, একটি ইজিপ্ট এয়ারের, নয়টি এমিরেটসের, পাঁচটি কাতার এয়ারওয়েজের, এবং পাঁচটি ফ্লাই দুবাইয়ের। এই পরিস্থিতিতে এয়ারলাইন্সগুলো বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে যাত্রীদের যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা ও পরিবর্তিত সময়সূচি জেনে নিতে বলেছে।
ঢাকা থেকে ৫১ ফ্লাইট বাতিল–স্থগিত, ক্ষতিগ্রস্ত ৫৪১৮ যাত্রী
সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল কার্যক্রম বন্ধ করার কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ৫১টি ফ্লাইটে সরাসরি প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে কিছু ফ্লাইট বাতিল ও কিছু স্থগিত হয়েছে। এসব ফ্লাইটের ৫ হাজার ৪১৮ যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাঁদের ঢাকা থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার কথা ছিল। গতকাল সোমবার বিকেলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এসব তথ্য জানিয়েছে।
গত শনিবার রাত থেকে গতকাল বিকেল পর্যন্ত এসব ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হয়েছে। এদিকে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার পর কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ঢাকা-রিয়াদ রুটের ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। এতে আটকেপড়া যাত্রীদের বিকল্প পথে সৌদি আরবে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর অংশ হিসেবে রিয়াদগামী যাত্রীদের মদিনা হয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, ৫১টি ফ্লাইটের মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি চলাচলকারী ফ্লাইট ১২টি। বাকি ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট। সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চারটি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের দুটি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের তিনটি এবং রিয়াদ এয়ারের তিনটি ফ্লাইট রয়েছে। অন্যদিকে ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ১৬টি, সালাম এয়ারের ৩টি, ইজিপ্টএয়ারের ১টি, এমিরেটসের ৯টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৫টি এবং ফ্লাইদুবাইয়ের ৫টি ফ্লাইট রয়েছে। বেবিচকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় কার্যক্রমের ওপর বিধিনিষেধের প্রভাব এখন শুধু সরাসরি ফ্লাইটে সীমাবদ্ধ নেই; বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের ট্রানজিট ফ্লাইটও এর আওতায় এসেছে। এতে যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ফ্লাইট পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪–এর তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদগামী সব ফ্লাইট হয় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, নয়তো বাতিল করা হয়েছে। শনিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বড় ধরনের হামলা হওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট স্থগিত হওয়ার তথ্য দিয়ে রয়টার্স বলেছে, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের সেখানে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে। ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থাও যাচাই করতে বলা হয়েছে।
মক্কা-মদিনার ওপর হুমকি এলে বাংলাদেশ বসে থাকবে না: শামা ওবায়েদ
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, ‘মক্কা-মদিনার ওপর যদি হুমকি আসে তবে বাংলাদেশ বসে থাকবে না। অবশ্যই তাদের জন্য সাহায্যের হাত আমরা বাড়িয়ে দেব।’গতকাল সোমবার রাজধানীর বিস মিলনায়তনে এক সেমিনারের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেছেন প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস–বিস) ‘বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি: পরিবর্তনশীল বিশ্বে দিক নির্ণয়ের পথরেখা’ শীর্ষক ওই সেমিনারের আয়োজন করে।
আমরা তো মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার জন্য একধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যদি এই মুহূর্তে সৌদি আরবের প্রয়োজন হয় এবং তারা আমাদের কাছ থেকে সৈন্য চায়, আমরা কি সেটা পাঠাব, এমন এক প্রশ্নের উত্তরে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমরা মক্কা প্যাক্টে এখনো যোগ দিইনি। হ্যাঁ, আমরা সিদ্ধান্ত, আপনি তখনই বলতে পারেন যে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যখন এটা আমরা কোনো মানে আনুষ্ঠানিকভাবে এটা হবে, কিন্তু আমরা মক্কা প্যাক্টে এখনো যোগ দিইনি, তো সেখানে সৈন্য পাঠানোর প্রশ্ন এই মুহূর্তে উঠছে না।’প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘কিন্তু আমরা অবশ্যই আপনারা দেখবেন যে সৌদি আরবে এই ঘটনাটা যেটা ঘটছে, সেটা আমরা সৌদি আরবের সরকার এবং সৌদি আরবের মানুষের প্রতি আমরা একাত্মতা ঘোষণা করেছি, এটা আমরা অবিলম্বে বন্ধ চাই। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্সকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। সুতরাং আমরা এটা অবিলম্বে বন্ধ চাই, সৌদি আরবের মানুষের পাশে আমরা আছি, সরকারের পাশে আমরা আছি।’
মক্কা-মদিনার নিরাপত্তার বিষয়ে বাংলাদেশ সহায়তা করবে কি না, জানতে চাইলে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘অবশ্যই, তারা যদি মক্কা-মদিনা যদি-এটা তো আমাদের, আমরা যারা মুসলমান, আমরা যারা সারা বিশ্বে একটা সংহতি নিয়ে আছি, সারা বিশ্ব-আমরা মুসলমানরা, তারা তো অবশ্যই মক্কা-মদিনার ব্যাপারে শুধু আমাদের একটা ডিপ্লোমেসি (কূটনীতি) না, আমাদের একটা আবেগও তার ওপরে কাজ করে। সেই জায়গাটা থেকে অবশ্যই আমরা মক্কা-মদিনার যদি এ রকম কোনো থ্রেট (হুমকি) আসে, সেটা বাংলাদেশি যারা আমরা মেজরিটি (সংখ্যাগরিষ্ঠ) মুসলমান আছি, আমরা তো বসে থাকব না। অবশ্যই তাদের সাহায্যের জন্য হাত আমরা বাড়িয়ে দেব।’
এখন যাইতে না পারলে চাকরি বাঁচানো যাবে না
গতকাল বেলা ২টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে সৌদি আরবের দাম্মাম যাওয়ার কথা ছিল আবুল হোসেনের। সেই ফ্লাইট ধরতে নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে সকাল ১০টার দিকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন তিনি। এসে জানতে পারেন তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ছয় বছর ধরে সৌদি আরবে কাজ করেন বলে জানালের আবুল হোসেন। রিয়াদে এখন টাইলস মিস্ত্রী হিসেবে কাজ করছেন। তিন মাসের ছুটিতে দেশে এসেছেন। তাই ছুটি অনুযায়ী তিন মাস আগেই ফেরার টিকিট কেটে রেখেছিলেন। এখন ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় নিজের কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন আবুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘ছুটি শেষ হয়েছে। এখন যাইতে না পারলে চাকরি বাঁচানো যাবে না। সব কিছু অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবে। আবুল হোসেনের মতোই ফ্লাইট বাতিল হয়েছে মো. মোসলেম তালুকদারের।
বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে তাঁর রিয়াদগামী ফ্লাইট ছিল। সেই ফ্লাইট ধরতে সকাল ১০টা থেকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। বিমানবন্দরে এসে ফ্লাইট বাতিলের তথ্য জানতে পারেন। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে মোসলেম তালুকদার বলেন, ‘দুপুর ১২টায় ফ্লাইট ছিল, যেতে পারিনি, বিমান বন্ধ, ফ্লাইট ক্যান্সেল (বাতিল) হয়েছে। এখন দেখছি, অন্য কোনো ফ্লাইটে যেতে পারি কি-না। নইলে বাড়ি ফিরে যেতে হবে।’ রিয়াদের একটি দোকানে তাঁর কাজে যোগ দেওয়ার কথা ছিল বলে জানান তিনি। গতকাল বেলা একটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য আসা ১৫ জনেরও বেশি যাত্রীর সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তাদের বেশিরভাগই জানতেন না ফ্লাইট বাতিল হওয়ার বিষয়টি। আবার কেউ কেউ অপেক্ষা করছেন বিকল্প কোনো ফ্লাইটে গন্তব্যে যেতে।
ভিসার মেয়াদ নিয়ে উৎকণ্ঠায় রিয়াদগামী প্রবাসীরা
অনেক ভয় কাজ করছে। ভিসার মেয়াদ শেষ হবে ১৬ তারিখ। এখন ফ্লাইট বাতিল হলে ভিসার মেয়াদ বাড়াতে পারব না। আমার কোম্পানির পরিচালক দেশের বাইরে। তাকে ছাড়া ভিসার মেয়াদ বাড়ানো সম্ভব নয়। এ কারণে অনেক টেনশন হচ্ছে। ভিসার মেয়াদ শেষ হলে কী করব, জানি না।
সৌদি আরবগামী যাত্রী ফরিদ হোসেনের কণ্ঠে ছিল উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে সৌদি আরব যাওয়ার কথা তার। কিন্তু রিয়াদ বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনি। ফরিদ বলেন, আমি গরিব মানুষ। যেতে না পারলে অনেক বেশি সমস্যায় পড়ব। ফ্লাইট বাতিলের খবর আগে জানানো হয়নি। গতকাল ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। আমি ঢাকায় ছিলাম। এখন এমিরেটসের গুলশান অফিস থেকে ফ্লাইটের বিষয়ে জানানো হয়েছে। অনেক ভোগান্তিতে পড়েছি। এই ভোগান্তির যেন শেষ নেই।
টাঙ্গাইল থেকে আসা ফরিদ সৌদি আরবের জেদ্দায় একটি মার্কেটে কাজ করেন। নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারা এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা তাকে আরও বেশি উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। শুধু ফরিদ নন, রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় এমন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কয়েক হাজার যাত্রী। কেউ একবার বিমানবন্দরে এসে ফিরে গেছেন, কেউ আবার নতুন করে ফ্লাইটের সময় নির্ধারণ করতে গিয়ে ছুটছেন এয়ারলাইন্সের অফিসে। নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লাইট ছাড়বে কি না, তা নিশ্চিত না হওয়ায় অনেকে বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছেন। এতে বাড়ছে যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচ।
গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনাল-১ এলাকায় কথা হয় নরসিংদীর শিবপুর থেকে আসা মাফিয়ার সঙ্গে। তার ছেলে তুষার ইমরান ২০২১ সাল থেকে সৌদি আরবের রিয়াদের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। গত ১ আগস্ট দেশে আসেন তিনি। গত ১১ অক্টোবর রাত ২টায় তার সৌদি আরব যাওয়ার ফ্লাইট নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সেদিন ফ্লাইট বাতিল হয়। মাফিয়া বলেন, সেদিন ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বাসায় ফিরতে ফিরতে সকাল হয়ে যায়। গতকাল আবার ঢাকায় এসে এয়ারলাইন্সের অফিসে গিয়ে ফ্লাইট ঠিক করেছি। আজ বিকেল ৩টা ৩৯ মিনিটে ফ্লাইট। ছেলে এখন বিমানবন্দরে গেছে। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। জানি না কী হবে। তিনি বলেন, শিবপুর থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়া করতে হয়েছে দুবার।
এতে ভালোই খরচ হয়েছে। আগে থেকে ফ্লাইট বাতিলের খবর জানানো হলে এই ভোগান্তিতে পড়তে হতো না। কিশোরগঞ্জ থেকে আসা আরেক সৌদিগামী যাত্রী বলেন, ‘এয়ারলাইন্স থেকে ফোন করে জানিয়েছে, ফ্লাইট বন্ধ। কেন বন্ধ, তা জানি না। যুদ্ধ বা অন্য কোনো কারণে ফ্লাইট বন্ধ থাকতে পারে। এ নিয়ে টেনশনে আছি। আমরা মধ্যবিত্ত মানুষ, অনেক টাকা খরচ করে বিদেশ যাচ্ছি। এভাবে ভোগান্তি হলে সমস্যা আরও বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত যেতে পারব কি না, জানি না। যাত্রীদের অভিযোগ, ফ্লাইট বাতিলের খবর অনেক ক্ষেত্রে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর জানতে পারছেন তারা। আগে থেকে জানানো হলে বাড়ি থেকে রওয়ানা হতেন না। একবার পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিমানবন্দরে এসে আবার বাড়ি ফিরে যাওয়া মানসিকভাবেও কষ্টকর। তার ওপর নতুন ফ্লাইটের সময় নির্দিষ্ট না হওয়ায় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কারও কারও অতিরিক্ত খরচ করে হোটেলে থাকতে হচ্ছে।
সৌদিগামী আরেক যাত্রী তারেক মনোয়ারের তিনবার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। তিনি বলেন, ভোগান্তির শেষ নেই। সিলেট থেকে ৮-১০ ঘণ্টা ভ্রমণ করে এসেছি। এখন কী করব, বুঝতে পারছি না। পরবর্তী ফ্লাইট পাব কি না, তা নিয়েও শঙ্কা আছে। কিছু করার নেই, বোমা হামলার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
নিরাপত্তার কারণে ঢাকা-দাম্মাম রুটে বিমানের ফ্লাইট স্থগিত
নিরাপত্তার কারণে ঢাকা-দাম্মাম রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৪৯ ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে ফ্লাইটটি স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, স্থগিত হওয়া ফ্লাইটটির পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও নতুন সময়সূচি সম্পর্কে আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টার দিকে হালনাগাদ তথ্য জানানো হবে। এর আগে দাম্মাম বিমানবন্দর সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রোববারও একই ফ্লাইটের যাত্রায় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ঢাকা থেকে দাম্মামের উদ্দেশে যাত্রার সময় কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (ডিএমএম) কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলেও পরে বিমানবন্দরটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
বিকল্প পথে সৌদি যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে বিমান
গতকাল সোমবার বিকেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রধান কার্যালয় বলাকার টিকিট বিক্রয় কাউন্টারে সরেজমিনে দেখা যায়, বিকল্প ফ্লাইটের টিকিট পেতে ভিড় করছেন রিয়াদগামী যাত্রীরা। কেউ টিকিট হাতে পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করছেন, আবার কেউ গন্তব্যে যাওয়ার নিশ্চয়তার অপেক্ষায়। যাত্রীদের মধ্যে ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরা প্রবাসীদের পাশাপাশি ভিসার মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন। নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তাদের যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এখন মদিনাগামী ফ্লাইটে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে অনেকের সেই দুশ্চিন্তা কিছুটা কমেছে। যাত্রীরা জানান, সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এতে দেশে থাকা পরিবারের সদস্যরাও আর্থিক ও মানসিক চাপে পড়বেন। তাই বিকল্প পথে সৌদি আরবে যাওয়ার সুযোগ তাদের জন্য স্বস্তির। তবে এখনো বিকল্প টিকিট পাননি অনেক যাত্রী। বলাকার সামনে অপেক্ষায় থাকা এসব মানুষের উদ্বেগ—কবে টিকিট পাবেন, কখন সৌদি আরবে পৌঁছাতে পারবেন।
রিয়াদের যাত্রী কামাল হোসেন বলেন, আগামীকাল তার ছুটি শেষ। আজই তার রিয়াদ পৌঁছাতে হবে। অন্যথায় চাকরির সমস্যা হবে। এছাড়া ভিসার মেয়াদও আছে মাত্র তিনদিন। তাই এখন যে করেই হোক আগে সৌদি আরবে ঢুকতে হবে।
ভিসার মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া প্রবাসীদের অগ্রাধিকার
এ পরিস্থিতিতে সরকারের ঘোষণার পর রিয়াদগামী যাত্রীদের মদিনা হয়ে সৌদি আরবে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। বিমান সূত্র জানায়, যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে এবং যাদের সোমবার রিয়াদগামী ফ্লাইটে যাওয়ার কথা ছিল, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বাতিল হওয়া ফ্লাইটের টিকিট কোনো ক্যানসেলেশন ফি ছাড়াই পুনরায় ইস্যু করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে বিকল্প ফ্লাইটে যাত্রার সুযোগ পেতে যাত্রীদের সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হচ্ছে। যাত্রীদের বিমানবন্দরে আসার আগে নিজ নিজ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা ও পরিবর্তিত সময়সূচি জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিমানের সেলস বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ আগে তাদের পাঠাতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মদিনা থেকে প্রবাসীরা সড়ক পথে নিজ নিজ গন্তব্যে যাবেন বলে জানান তিনি।
২১ অক্টোবর পর্যন্ত ইউএস-বাংলার রিয়াদগামী সব ফ্লাইট বাতিল
বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা পথে তাদের সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এসব ফ্লাইটের নম্বর বিএস ৩৮১ ও বিএস ৩৮২। ফ্লাইটের নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করা হলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের জানিয়ে দেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে। সৌদি আরবের যাত্রীদের আপাতত বিমানবন্দরে না যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে ইউএস-বাংলা। ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা, আবার টিকিট বুকিং ও অন্যান্য তথ্য জানতে বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্র বা ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য যাত্রীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









