ওয়ান-ইলেভেন এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের সময় গুম, খুন, জোরপূর্বক অর্থ আদায় এবং প্রতারণার অভিযোগে আরো একডজন কর্মকর্তাকে কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তথ্য যাচাইয়ের জন্য ওয়ান-ইলেভেনের সময় বিভিন্ন সংস্থায় কর্মরত অনেক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। প্রয়োজনে তাদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে নিশ্চিত করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ সূত্র। এদিকে গোয়েন্দা জালে ওয়ান-ইলেভেনের সব কুশীলব।
আপাতত সেখানে রেখেই যাচাই-বাছাই হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের। এর ধারাবাহিকতায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টাসহ সুনির্দিষ্ট বেশকিছু অভিযোগে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষ কুমার বড়ুয়া ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরাকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার সুরক্ষা আইনে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গোয়েন্দা কার্যালয়ে রেখেই তাদেও জিজ্ঞাসাবাদঅব্যাহত রাখা হয়েছে।
গতকাল সোমবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. আকতার হোসেন। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে গতকাল রোববার রাতে সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ। আকতার হোসেন বলেন, তারা সরকারবিরোধী বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট তৈরি করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার করছিলেন। এছাড়া আসন্ন দুর্গা পুজা ঘিরে নাশকতার আশঙ্কা করা হচ্ছিল। পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন।
এদিকে এক এগার সংশ্লিষ্ট একডজন সাবেক সেনা কর্মকর্তার অনেকেই বর্তমানে দুবাই, আমেরিকা, কানাডা, মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। তবে তাদের ফেরানোর জন্য ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্নার থেকে সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ২৯ মার্চ রাতে রাজধানীর ডিওএইচএস এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে বরখাস্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আফজাল নাছেরকে। সে ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। তিনি কারাগারে আছেন।
সূত্র আরো বলছে, ওয়ান-ইলেভেনের সময় মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিনের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন তৎকালীন মেজর সুলতানুজ্জামান সালেহ। শুরুতে তাকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরে (ডিজিএফআই) অ্যাটাচমেন্টে নিয়ে আসেন মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন। জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা হয়। তিনি সারা দেশে ব্যাটালিয়ন অধিনায়কদের সঙ্গে অপারেশন সমন্বয় করতেন। অনেক ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও সমন্বয় করতেন তিনি।
শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর তিনি ডিজিএফআইতে সিটিআইবির কর্নেল ‘জিএস’ হিসেবে পদোন্নতি পান। সবশেষ মেজর জেনারেল হয়ে অবসরে যান। ইভিএম মেশিন কেলেঙ্কারিসহ নানা গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে সালেহর বিরুদ্ধে। সূত্রের দাবি, ওয়ান-ইলেভেনের সময় গ্রেফতার মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, এটিএম আমিন এবং গ্রেফতার মামুন খালেদ অন্তত ছয়জন কর্মকর্তাকে বিশেষ অ্যাসাইনমেন্টের জন্য ডিজিএফআইতে অ্যাটাচমেন্টে নিয়ে আসেন। তাদের মধ্যে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার আসামি কর্নেল মাহফুজের দুই সন্তানও ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৮-এর ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের আগে স্পেশাল অ্যাসাইনমেন্টের জন্য তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার মামুন খালেদকে আনসার বাহিনীতে পদায়ন করা হয়।
অন্যদিকে নীলনকশার নির্বাচনের জন্য দেওয়া বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট বাস্তবায়ন করেন তিনি। জানা গেছে, ওয়ান-ইলেভেনের নেপথ্য কারিগর এবং পরবর্তী নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত দেড় ডজন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে। এ তালিকায় সশস্ত্র বাহিনীর চার বাহিনী প্রধানের নাম রয়েছে। তারা ওয়ান-ইলেভেনে দেশকে বিরাজনীতির দিকে ঠেলে দিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে ছিলেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে থাকা গ্রেফতার দুজন সাবেক লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং শেখ মামুন খালেদ এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টদের।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, মাসুদ এবং মামুন নানা কৌশল করে অনেক কিছুই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে তাদের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদায় করা গেছে। এগুলোর সত্যতা যাচাইবাছাই করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আফজাল নাছের অনেক কিছুর সঙ্গেই জড়িত ছিলেন। আদালতের নির্দেশে মাত্র রিমান্ডে আনা হলো। যেহেতু তিনি অনেক কিছুর সাক্ষী, তাই তার কাছ থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।
অপরদিকে খালেদা জিয়াকে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেননি ডিজিএফআইর সাবেক পরিচালক, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) মো. আফজাল নাছের। আদালতে রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক এই তথ্য তুলে ধরে বলেন, আফজাল নাছের ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ডিজিএফআইয়ে কর্মরত ছিলেন। মঈন উদ্দিন-ফখরুদ্দীনের আমলে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ব্যবসায়ীদের অত্যাচার করেছিল। বিশেষ করে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আবদুল আউয়াল মিন্টু, লুৎফুজ্জামান বাবর, মোসাদ্দেক আলী ফালুকে মিথ্যাচার করে গ্রেফতারের টিমে ছিলেন আফজাল নাছের। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা টিমের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী বলেন, খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের পর অত্যাচার করেও জিঘাংসা শেষ হয়নি ফ্যাসিস্ট হাসিনার। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে জেলে আটকে রেখে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। তাকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে দেওয়া হয়নি। নিরুপায় হয়ে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তবে ইউনাইটেড গ্রুপের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়ায় তিনি (নাছের) খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা নিতে দেননি। সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হয়েও নাছের নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন। তিনি ফ্যাসিস্ট হাসিনার সহযোগী ছিলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হাসিনাকে রক্ষা করার জন্য কাজ করেছেন।
অবশ্য সবকিছুর কলকাঠি নেড়েছেন মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন এবং লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তবে বহুল আলোচিত চরিত্র জেনারেল (অব.) মইন ইউ আহমেদ অধিনায়কের ভূমিকায় থাকলেও তাকে সার্বিক সহায়তা করেছেন তৎকালীন বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল (অব.) শাহ মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান এবং নৌবাহিনীর প্রধান ভাইস এডমিরাল (অব.) সরওয়ার জাহান নিজাম। এক-এগারোর পরবর্তী সময়ে সেনাপ্রধান হয়েছিলেন জেনারেল আবদুল মুবীন। তিনি ২০০৯ সালের ১৫ই জুন থেকে ২০১২ সালের ২৪শে জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।
তার সময়েই ২০১০ সালের ১৩ই নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়াকে শহীদ মইনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। ওই সময় বাড়ি ভাঙার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকের আস্থাভাজন তৎকালীন ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের এক্সিকিউটিভ অফিসার নাজমুছ সাদাত সেলিম।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









