রাজধানীর কাকরাইল মসজিদসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদে তাবলীগের নিয়মিত ধর্মীয় কার্যক্রমে বাধা, মার্কাজ মসজিদ নিয়ে বিরোধ এবং পাল্টাপাল্টি প্রচারণা ধর্মীয় পরিবেশ ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন বিশ্ব এজতেমা ঘিরে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাবলীগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহিরাগত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক নেতাদের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধের জন্য আইন শৃংখলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি শুরু হয়েছে।
মাওলানা মোহাম্মদ জোবায়ের ও মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীদের মধ্যে চলমান বিবাদের জেরে উত্তেজনার প্রেক্ষিতে রাজধানীর কাকরাইল মসজিদের আশপাশে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। সাদ ও যোবায়ের পন্থিরা মসজিদে মুখোমুখী অবস্থানে রয়েছে। আসছে শুক্রবার সকাল থেকেই মাওলানা জোবায়েরের অনুসারীরা মসজিদে শক্ত অবস্থান নিয়ে মাওলানা সাদের অনুসারীদের প্রতিহত করার ঘোষণা দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাকরাইল মসজিদের আশপাশে বিপুলসংখ্যক আইশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
পুলিশ, র্যাবের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরাও সতর্ক অবস্থান নেন। পাশাপাশি মুসুল্লীরা টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানকেন্দ্রিক ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সহিংসতা এবং প্রাণহানির ঘটনায় নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে সংগঠনটি। পাশাপাশি ২০১৯ সালে কিশোরগঞ্জে আব্দুর রহিম রাজন এবং ২০২৩ সালে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় শামসুল হকের মৃত্যুর ঘটনাও যথাযথভাবে তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে।
২০১৮ সালে টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে ইসমাইল ম-ল ও শামসুদ্দিন বেলাল এবং ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর বেলাল হোসেন ও মিজানুর রহমান নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। এসব ঘটনায় প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষণাসহ তাবলীগ জামাতের ছয় দফা দাবি জানিয়েছে সাদ পন্থীরা। বিশ্ব ইজতেমার তারিখ দ্রুত ঘোষণা, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং টঙ্গীর ইজতেমা ময়দান ব্যবহারের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছে তাবলীগ জামাত বাংলাদেশ (মাওলানা সাদ সাহেবের অনুসারী)।
একই সঙ্গে মসজিদে তাবলীগের ধর্মীয় কার্যক্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধেরও দাবি জানিয়েছে তারা। বিভিন্ন জেলা ও থানার মার্কাজ মসজিদ নিয়ে বিরোধ ও দখলসংক্রান্ত অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, আইনানুগ প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি এবং বৈধ কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘তৌহিদি জনতা’ বা অন্য কোনো পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যাতে মসজিদে তাবলীগের ধর্মীয় কার্যক্রমে বেআইনি বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে তাবলীগ জামাত বাংলাদেশের উদ্যোগে বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনের জন্য দ্রুত নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ময়দান ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত এবং দখলসংক্রান্ত অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষণা, সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহিরাগত হস্তক্ষেপ বন্ধ, ইজতেমা ময়দান ব্যবহারের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত, মার্কাজ মসজিদ নিয়ে বিরোধের আইনানুগ নিষ্পত্তি এবং মসজিদে ধর্মীয় কার্যক্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিজ্ঞপ্তিতে আশা প্রকাশ করা হয়, সরকার সব পক্ষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করে দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মসজিদের আশপাশে সরেজমিন দেখা গেছে, স্থানীয় মুসল্লি ও মাওলানা জোবায়েরের অনুসারীরা অবস্থান নিয়েছেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মসজিদের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেন মাওলানা জোবায়েরের অনুসারীরা। গেটে অবস্থান নেওয়া সমর্থকরা বলতে থাকেন, ভেতরে নামাজের জায়গা নেই। আশপাশের অন্য মসজিদে নামাজ পড়ে আসেন। এ সময় অনেকে মসজিদের সামনে অবস্থান নিলে মূল সড়কের অনেকটা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। পরে দুপুর ১টার দিকে তাদের একে একে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়। মসজিদের গেটের ভেতর থাকা মাওলানা মোহাম্মদ জোবায়ের অনুসারীরা জানান, তারা মাওলানা সাদের অনুসারীদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেবেন না।
ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) বলেন, কাকরাইল মসজিদে গত ৫ থেকে ৬ বছর ধরে একটি রেওয়াজ ছিল ৪ সপ্তাহ থাকবে মাওলানা জোবায়েরপন্থি, এর পরের ২ সপ্তাহ থাকবে সাদপন্থি। পরিস্থিতি যখন খারাপের দিকে গেল, তখন মন্ত্রণালয় থেকেই সিদ্ধান্ত হয়েছে এখন থেকে এই মসজিদকেন্দ্রিক কাউকে ঝামেলা করতে দেওয়া হবে না। সাধারণ মুসল্লি যারা আছেন, তারা সচরাচর যেভাবে নামাজ পড়েন সেভাবে পড়বেন।
এদিকে সংগঠনটির মিডিয়া সমন্বয়ক মো. সায়েম স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। ওলামা-মাশায়েখ বাংলাদেশ’ নাম ব্যবহার করে এক সংবাদ সম্মেলনে তাবলীগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। সংগঠনটির দাবি, সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ব্যক্তিরা তাবলীগ জামাতের প্রতিনিধিত্ব করেন না। তাদের বক্তব্য অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সংগঠনটির অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা তৃতীয় পক্ষ হিসেবে তাবলীগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিরোধ উসকে দিচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে ধর্মীয় কার্যক্রমকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং প্রকৃত ঘটনা নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









