সুস্থ হয়ে ফিরে ফের বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অধ্যাপক শরীফুল জানান, বিভিন্ন গণমাধ্যমে তিনি পদত্যাগ করেছেন উল্লেখ করে যেসব সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে, তা সত্য নয়। ক্যাম্পাসে না ফেরার শর্তে শিক্ষার্থীরা তাঁকে বের হতে দিয়েছেন- এ তথ্যও অসত্য।
অন্যদিকে শিক্ষকদের কর্মবিরতি ও ‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ কর্মসূচি চলবে বলে জানিয়েছে চুয়েট শিক্ষক সমিতি। শিক্ষার্থীরাও জানিয়েছেন, উপাচার্য পদে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে তাঁদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের এক দফা দাবিতে চুয়েট ক্যাম্পাসে টানা ২৩ দিন ধরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন চলছে। এতে বন্ধ হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস–পরীক্ষাসহ সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম। তবে, গতকাল বুধবার থেকে শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে ক্যাম্পাস ছেড়ে গেছেন অনেক শিক্ষার্থী।
‘পদত্যাগ করিনি, মুচলেকাও দেইনি’
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই সোমবার সকালে ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে নিয়ে তালা ভেঙে নিজের দপ্তরে প্রবেশ করেন উপাচার্য শরীফুল আলম। এরপর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাঁকে ভেতরে রেখে ভবনের ফটকে ফের তালা দেন শিক্ষার্থীরা। পানি ও বিদ্যুতের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। প্রায় ৩০ ঘণ্টা নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে যান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার। রাতে পুলিশ প্রহরায় তাঁকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ভবন থেকে উপাচার্য বের হওয়ার সময় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দেন, ‘আমাদের নবনিযুক্ত ভিসি যিনি লুকিয়ে এই চুয়েটে প্রবেশ করেছিলেন। আজকে এই চুয়েট থেকে উনি জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বের হয়ে যাচ্ছেন, একটা মাত্র শর্তে। উনি আর কখনো এই চুয়েটের মাটিতে পা রাখবেন না।’ এরপর পুলিশ প্রহরায় উপাচার্য গাড়িতে উঠেন। সে সময় শিক্ষার্থীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন।
তবে, গতকাল বুধবার দুপুরে গণমাধ্যমকে উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যমে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে যে, আমি পদত্যাগ করেছি এবং ভবিষ্যতে কখনো চুয়েট ক্যাম্পাসে পদার্পণ করব না। এ ধরনের কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি আমি দেইনি। কারণ, আপনারা জেনে থাকবেন, যখন আমাকে নিয়ে আসা হচ্ছিল, তখন আসলে আমি কথা বলার মতো অবস্থাতেই ছিলাম না। অসুস্থতার কারণেই আমি ক্যাম্পাস ছেড়েছিলাম। এখনো আমি অসুস্থ এবং চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছি। সুস্থ হয়ে আমি আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করব।’ উপাচার্য বলেন, ‘আমি পুনর্ব্যক্ত করতে চাই, রাষ্ট্র আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, আমি সেই অর্পিত দায়িত্ব পালন করতেই চট্টগ্রামে এসেছি। কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ, বিশেষ কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়ন কিংবা দলীয় বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে আমি এখানে আসিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন এবং প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সচল রাখার বিষয়টি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’
নিজের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম বলেন, ‘আগের চেয়ে একটু ভালো আছি। প্রেসার নরমাল আছে। মাথা ব্যথা কম। বুকে ব্যথাও আগের তুলনায় কম। অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছে। চিকিৎসকরা যেভাবে পরামর্শ দেন, সেভাবে চিকিৎসা চলবে।’ তিনি বলেন, ‘সোমবার দুপুর ১২টার পর থেকে বিদ্যুৎবিহীন থাকায় আমাদের যে অমানবিক কষ্টের ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছে, সে কারণেই এক পর্যায়ে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। এবং সরকারি ডাক্তার ও সিভিল সার্জনের পরামর্শক্রমে আমাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।’
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি ‘শ্রদ্ধা ও সম্মান’ আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। চুয়েট নিয়ে আমারও আবেগ আছে। আমাকে তো তারা একদিনও দেখেনি। যদি ছয় মাস দায়িত্ব পালনের পর আমার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম, ব্যর্থতা বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠত তাহলে আন্দোলন করলে যৌক্তিকতা ছিল। হয়ত কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের দ্বারা তারা মিসগাইডেড হচ্ছে।’ শেখ শরীফুল বলেন, তিনি চান না, কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্ররোচনা বা ব্যবহারে শিক্ষার্থীদের অমূল্য শিক্ষাজীবন ও একাডেমিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হোক। শিক্ষার্থীদের দ্রুত শ্রেণিকক্ষে ফেরার আহ্বান জানান তিনি।
আন্দোলন চলবে
২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ও অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষার্থীরা। একই দাবিতে কর্মবিরতি ও ‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ কর্মসূচি পালন করে আসছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। এতে বন্ধ রয়েছে ক্লাস-পরীক্ষাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম।
গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে চুয়েট শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভা শেষে সভা শেষে যুগ্ম সম্পাদক সামিউন বাসির বলেন, ‘তালা ভেঙে উপাচার্য ভবনে প্রবেশের ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন। ভবনের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র রয়েছে। সেগুলো চুরি হয়েছে কি না এবং কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অধ্যাপক সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবিতে আমরা অটল রয়েছি। আমরা কর্মবিরতি ও অসহযোগ চালিয়ে যাব।’
আন্দোলনরত বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমরা অধ্যাপক সায়েম স্যারকে উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করে আসছি। এই আন্দোলন চালিয়ে যাব। আর সায়েম স্যারকে পুনর্বহালের দাবিতে শাটডাউন কর্মসূচি চলমান থাকবে।’
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ক্ষোভ
আন্দোলনের মুখে ক্যাম্পাসে সশরীরে উপস্থিত না হতে পেরে চুয়েটের নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফুল ২৪ সেপ্টেম্বর অনলাইনে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে না পারলেও আন্দোলন দমাতে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অনৈতিক কার্যক্রমের অভিযোগ তুলেছেন আন্দোলনরতরা। এর মধ্যে শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবি, তাঁদের সেপ্টেম্বর মাসের বেতন ও উৎসব ভাতা স্থগিত করেছিলেন নতুন ভিসি।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন যে, নিজের পদ ধরে রাখতে নবনিযুক্ত উপাচার্য মদুনাঘাট ও বহদ্দারহাট এবং চান্দগাঁও টার্মিনালে শিক্ষার্থীদের বহনকারী বাসে হামলা করিয়েছেন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা এটাও বলছেন, অনলাইনে যোগদানের ১৭ দিন পর বহিরাগতদের নিয়ে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। এসব ঘটনার পর তাকে আর উপাচার্য হিসেবে মেনে নিতে রাজি নন তাঁরা।
চুয়েটের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. মইনুল ইসলাম বলেন, সদ্য সাবেক উপাচার্যকে হঠাৎ করে অপসারণ করার পর থেকেই শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। কিন্তু তালা ভেঙে যেভাবে নতুন উপাচার্য তার কার্যালয়ে প্রবেশ করেছেন তাতে শিক্ষার্থীরা আরও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তিনি জানান, চুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও রাজনৈতিক নেতা ও বহিরাগতদের নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশের এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতিও নিন্দা জানিয়েছে। চুয়েটে চলমান আন্দোলন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই শিক্ষক।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের আন্দোলনে ক্লাস, পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ক্ষতি হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যায় মঞ্জুরি কমিশন কিংবা সরকারের কেউ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









