আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরকার অনুমতি দিলে এবং প্রয়োজন হলে পুলিশ ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন ফকির।
গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর চকবাজারের শাহজাহান ইমাম টাওয়ারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইজিপি বলেন, পুলিশ কঠোর হলে তাকে ‘ফ্যাসিস্ট পুলিশ’ বলা হয়, আবার নীরব থাকলে বলা হয় ‘দুর্বল পুলিশ’। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ দমনে পুলিশকে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। ‘ব্যাংকিং খাতে নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার তাগিদ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমরা পুলিশকে লাঠিপেটা করি, বলবেন, আমরা ফ্যাসিস্ট পুলিশ। আর আমরা যদি আপনার নীরবে থাকি, তাহলে বলবে দুর্বল পুলিশ। তাহলে আমাকে তো কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে। এমপাওয়ার করতে হবে।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে আলী হোসেন ফকির বলেন, পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার রোধে পুলিশ শূন্য সহনশীলতার নীতিতে কাজ করছে। পুলিশ সদস্যদের কেউ অপরাধ করলে তাকেও ছাড় দেওয়া হচ্ছে না বলেও জানান তিনি। আমাদেরও চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স রয়েছে। কিন্তু কথায় কথায় পুলিশের ওপর চড়াও হওয়া বা পুলিশকে অকার্যকর করার চেষ্টা করা হলে সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।‘
তিনি আরো বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরকার যদি অনুমতি দেয় এবং প্রয়োজন হয়, তবে আমরা ক্রসফায়ারও করব। পুলিশকে এমপাওয়ার না করলে এবং আইন প্রয়োগের সুযোগ না দিলে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।’ গুজব ও মিথ্যা প্রচারণায় কান না দিয়ে সংবিধান ও আইন অনুসারে দায়িত্ব পালনে সবার সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন অনিয়ম ও সুদের কুফল নিয়েও কথা বলেন আইজিপি। তিনি বলেন, ইসলামে সুদ ও ঘুষ সম্পূর্ণ হারাম। প্রকৃত ইসলামিক ব্যাংকিং হতে হবে সুদমুক্ত, যেখানে অংশীদারত্ব, নৈতিকতা এবং স্বচ্ছ ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। অতীতে ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন অনিয়ম, ব্যাংক দখল এবং উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার সমালোচনা করেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভিশন ও মনিটরিং ঠিক না থাকলে যতই আইন থাকুক না কেন, তা কার্যকর হবে না। গ্রাহক ও বাস্তবায়নকারী উভয় পক্ষকেই নৈতিকতার জায়গায় থাকতে হবে।’
বর্তমান ব্যবস্থাপনার অধীন গ্রাহকদের ব্যাংকের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা রাখার আহ্বান জানান তিনি। অতীতে ঘটে যাওয়া অনিয়ম বা বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি এখন আর ঘটার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন আইজিপি। পাশাপাশি মোবাইল আর্থিক সেবার তদারকি আরো জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ এবং গ্রাহকদের জন্য আধুনিক বিকল্প ব্যাংকিং সুবিধা চালুর ক্ষেত্রে ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর যাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
ব্যাখ্যা দিলো পুলিশ সদর দফতর
এদিকে‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরের এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। গতকাল বিকেলে স্পষ্টীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে সদর দফতর জানিয়েছে, আইজিপি আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যা বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে শব্দটি ব্যবহার করেননি বলেও দাবি করেছে পুলিশ সদর দফতর।
স্পষ্টীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সোমবার সকালে রাজধানীর চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং শাখা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আইজিপির বক্তব্যে ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ ও শিরোনামের বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। জনমনে বিভ্রান্তি নিরসনে এ স্পষ্টীকরণ দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
ওই অনুষ্ঠানের বক্তব্যে সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করার কথা বলেন আইজিপি। তাঁর ওই বক্তব্যের পর হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) উদ্বেগ ও নিন্দা জানায়। সংস্থাটি সরকারের কাছে বক্তব্যের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কারের আহ্বান জানায়। অন্যদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আইজিপির বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে তা প্রত্যাহার, তার জবাবদিহি এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত অবস্থানের পরিপন্থি বক্তব্যের বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি জানায়।
এসব সমালোচনার পর পুলিশ সদর দফতর স্পষ্টীকরণে বলেছে, বাংলাদেশ পুলিশ মানবাধিকার সমুন্নত রেখে জনগণের জানমাল রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সদর দফতরের বক্তব্য অনুসারে, আইজিপি তার বক্তব্যে মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। স্পষ্টীকরণে বলা হয়, বাংলাদেশ পুলিশ রাষ্ট্রের প্রধান আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। অপরাধ দমন, অপরাধী গ্রেফতার, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। এসব দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের কখনও অপরাধী, সংঘবদ্ধ হামলাকারী কিংবা আইন অমান্যকারী ব্যক্তিদের সরাসরি প্রতিরোধ ও আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়।
পুলিশ সদর দফতর জানায়, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধী গ্রেফতার, অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ এবং সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে পুলিশের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় চারজন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। দেশের প্রচলিত আইন, বিশেষ করে দণ্ডবিধি-১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮ এবং পুলিশ অ্যাক্ট-১৮৬১-এ পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বলা রয়েছে বলেও স্পষ্টীকরণে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে, একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সম্পর্কে আইজিপির মন্তব্য নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। এ বিষয়ে স্পষ্টীকরণে বলা হয়, ‘প্রকৃত অর্থে তিনি সাংবাদিকদের সম্পর্কে ঢালাও কোনও মন্তব্য করতে চাননি, এটি অসাবধানতাবশত হয়েছে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









