খাতায় কলমের আঁচড় নয়, যেন একেকটি শিক্ষার্থীর দীর্ঘশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। একদিকে এ প্লাসের জোয়ারে আনন্দের ফোয়ারা, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেয়ে বুকফাটা কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী—এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল মানেই যেন আনন্দ আর বেদনার এক অন্তহীন লুকোচুরি খেলা। খাতার পাতায় স্বপ্নভঙ্গের হাহাকার আর পরিবারের প্রত্যাশার চাপ মিলে এবারের ফল প্রকাশকে রূপ দিয়েছে এক অদ্ভুত হাসিকান্নার রোলারে। এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ শিক্ষার্থী, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেকের কিছু কম শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়ে কান্নার বিষাদ জমিয়েছে। ঠিক বিপরীত দিকে অর্ধেকের কিছু বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী কৃতকার্য হলেও অনেকের মেলেনি কাঙ্ক্ষিত ফলাফল। যারফলে এবারের উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলে হাসি-কান্না আধাআধিতে ভাগাভাগি হয়েছে।
দ্বাদশ শ্রেণির গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার পর্যায়ে পা রাখতে যাওয়া এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪০ হাজার ৮৪ জন জিপিএ ৫ পেয়েছে, যা উত্তীর্ণের মোট সংখ্যার ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এর আগে ২০২৫ সালে এ পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ; তাদের মধ্যে ৬৯ হাজার ৯৭ জন জিপিএ ৫ পেয়েছিল। এই হিসাবে ২০২৬ সালের পরীক্ষায় পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট। আর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন। এর আগে ২০০৪ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এরপর আর কখনো এবারের মতো বাজে ফল আর হয়নি। এবারের ফলাফলে বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড বাদে প্রায় সব শিক্ষা বোর্ডেই এ বিষয়ে পাসের হার কম। বাধ্যতামূলক এ বিষয়ে দুর্বল ফল সামগ্রিক পাসের হার কমার অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
গতকাল শনিবার সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আনুষ্ঠানিকভাবে ফলের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। বরাবরের মতোই শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইটের পাশাপাশি মোবাইলে এসএমএস করেও উচ্চমাধ্যমিকের ফল জানা গেছে।
প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত তিন বছরে পাসের হারে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। ২০২৪ সালে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশে। এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছিল প্রায় ১৮ শতাংশীয় পয়েন্ট। এবার তা আরো কমে ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশে নেমেছে। এবারের ফলাফল খারাপ হওয়ার পেছনে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান, প্রশ্নপত্রের ধরন এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নপদ্ধতি—সব বিষয়ই পর্যালোচনার দাবি রাখে। তবে ইংরেজির মতো বাধ্যতামূলক বিষয়ে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। যদিও শুধু ফলাফলের পরিসংখ্যান দিয়েই এর কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বিষয়ভিত্তিক ফলাফল, প্রশ্ন কঠিন হওয়া, পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের ধরন পর্যালোচনা করেই প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা দরকার বলে মনে করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবর এ বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের কথা ছিল। পরে তারিখ পরিবর্তন করে ৩১ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়। এ বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল গত ২ জুলাই। এবার নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন। এর মধ্যে পাস করেছেন ৫ লাখ ৪১ হাজার ২৪৯ জন।
ফলাফলে ছাত্রীদের পাসের হার ছাত্রদের তুলনায় বেশি। ছাত্রীদের পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ছাত্রদের ৪৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্ররা সামান্য এগিয়ে। জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ১৮ হাজার ১৫৫ জন এবং ছাত্রী ১৭ হাজার ৭৯৩ জন। অর্থাৎ পাসের হারে ছাত্রীরা এগিয়ে থাকলেও ফলের সর্বোচ্চ সূচক অর্জনে ছাত্রদের সংখ্যা কিছুটা বেশি। এবারের ফলাফলে বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা। বাধ্যতামূলক এ বিষয়ে দুর্বল ফল সামগ্রিক পাসের হার কমার অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবার শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। গত বছর শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২। এবার ৯১টি বেড়ে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান হয়েছে ২৯৩। অন্যদিকে অর্ধেকের বেশি কমেছে শতভাগ পাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। গত বছর ৩৪৫ প্রতিষ্ঠানের সবাই পাস করেছিলেন। এবার শতভাগ পাস করেছেন ১৩৯ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
২০০৫ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল। এবারও বিএনপি ক্ষমতায়। ২০০৫ সাল থেকে এ বছর পর্যন্ত ২২ বছরের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে পাসের হারে সবচেয়ে বড় পতন ঘটে গত বছর। ২০২৪ সালে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশে। ২০০৫ সালের পর গত বছরের পাসের হার ছিল সর্বনিম্ন। এবার সেই হার আরো কমে ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশে নেমেছে।
এর আগে ২০০৫ সালে পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এরপর ২০০৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোনো বছরই পাসের হার ৬০ শতাংশের নিচে নামেনি। এ বছরগুলোতে পাসের হার কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে। তবে অধিকাংশ বছরেই তা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের ওপর ছিল। করোনা শুরুর বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে পরীক্ষা ছাড়াই ফলাফল প্রকাশে সবাই পাস করেছিলেন। ফলে গত দুই বছরের ধারাবাহিক পতন এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের সাম্প্রতিক প্রবণতায় বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এবারের ফলাফলে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ছাড়া অন্য কোনো বোর্ডেই এ বিষয়ে পাসের হার ৭০ শতাংশে পৌঁছায়নি। ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। এবার সাধারণ শিক্ষাবোর্ডগুলোর মধ্যে পাসের হারে ঢাকা বোর্ড শীর্ষে। অন্য বোর্ডগুলোতে ইংরেজি বিষয়ে পাসের হার ৫৪ থেকে প্রায় ৬৬ শতাংশের মধ্যে। ইংরেজি বাধ্যতামূলক বিষয় হওয়ায় এ বিষয়ে বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব সামগ্রিক ফলাফলেও পড়েছে। তবে ইংরেজিতে ফল খারাপ হওয়ার কারণ শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত প্রস্তুতির ঘাটতি কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের প্রাপ্যতা, শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি শেখানোর পরিবেশ এবং পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন—সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া প্রশ্নপত্র কঠিন হওয়া এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় কঠোরতা এসেছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। কারণ এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র নিয়ে নানা ধরনের ভুল ও অসংগতির অভিযোগ উঠেছিল। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের দুটি প্রশ্নে ভুলের বিষয়টি সরকার স্বীকারও করেছিল। ওই দুটি প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এ ছাড়া রসায়ন ও জীববিজ্ঞান বিষয়েও প্রশ্নপত্রে কিছু অসংগতির অভিযোগ করেছিলেন পরীক্ষার্থীরা।
শুধু প্রশ্ন প্রণয়ন বা পরিশোধনেই (মডারেশন) ভুল নয়, এ বছর প্রশ্নপত্র বিতরণেও ঘটে বেশ কিছু গরমিল। কোথাও নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া হয়েছে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য তৈরি প্রশ্নপত্র, কোথাও আবার প্রথম পত্রের পরীক্ষার জায়গায় নেওয়া হয় দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি ও তদন্তের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এবার এবার বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়ায় পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ক্ষোভেরও সৃষ্টি হয়েছিল। এ ছাড়া এবার মূল্যায়নপদ্ধতির পরিবর্তনও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এসব কারণের কোনটির প্রভাব কতটা, তা নির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়।
ফলাফলের এই ধারাবাহিক অবনতি শুধু পরীক্ষায় পাস-ফেলের বিষয় নয়; এটি শিক্ষার্থীদের শিখন-অর্জন এবং শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে। পরীক্ষায় ভালো ফল করানোই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে, বিশেষ করে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে তাদের দক্ষতা কতটা তৈরি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এবারের ফলাফলকে কেবল পাসের হার কমে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে না দেখে শিক্ষার গুণগতমান মূল্যায়নের একটি সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্ধারিত দিন সকালে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা সারতেন সরকারপ্রধান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার হাতে ফলের প্রতিবেদন তুলে দিতেন বোর্ডের চেয়ারম্যানরা। শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা থাকতেন ওই অনুষ্ঠানে। সরকারপ্রধান আনুষ্ঠানিকতা সারার পর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ওয়েবসাইট ও মোবাইলে ফল জানার সুযোগ মিলত। এ ছাড়া শিক্ষামন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে সারাদেশের বিস্তারিত ফলাফলের সারসংক্ষেপ তুলে ধরতেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ফল প্রকাশের সেসব আনুষ্ঠানিকতা রাখা হয়নি। বর্তমান বিএনপি সরকারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে।
চব্বিশের আন্দোলন ঘিরে সার্বিক অস্থিরতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনের অধীন খাতা দেখার ধরন বদলে যাওয়ায় গতবার মাধ্যমিকের পাশাপাশি উচ্চ মাধ্যমিকেও পাসের হারে ধস নামে। এবার এসএসসিতে পাসের হার আরো কমে হয় ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। আর এইচএসসিতে ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বাজে ফল এল। ফলাফলে এমন ধসের পেছনে নির্মোহভাবে খাতা দেখা এবং শিক্ষার্থীদের শিখনের ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখার কথা বলছে সরকার।
ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেছেন, আমাদের নির্বাচিত সরকারের আয়োজিত প্রথম এই এইচএসসি এবং সমমানের পরীক্ষায় আমরা নির্মোহ মূল্যায়ন নিশ্চিত করেছি। প্রত্যেকের খাতায় যে পরীক্ষা যেভাবে দিয়েছে, তার উপর ভিত্তি করে সর্বোচ্চ স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে চাইছি এবং এই প্রথমবারের মতন থাকছে পূর্ণাঙ্গ পুনর্নিরীক্ষা। অকৃতকার্যদের মধ্যে এক বা দুই বিষয়ে যারা ফেল করেছে, সম্ভব হলে এক মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগের কথা বলেছেন তিনি। আর শিখনের ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকার কথা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ফলাফলে এভাবে নিচের দিকে নেমে আসা কখনো কাম্য নয়। ঘাটতি আমাদের শিখন পদ্ধতিতে রয়েছে, অভিভাবকদের রয়েছে, পরিবেশ রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে যে ঘাটতি রয়েছে, সেটাকে আমাদের পুনঃনির্ধারণ করতে হবে এবং এটাকে আমাদের অ্যাড্রেস করতে হবে—এটাই আমাদের দায়িত্ব। এ ঘাটতি পূরণের জন্য অভিভাবক এবং শিক্ষকদেরও উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
খাতা পুরোপুরি পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ থাকার কথা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, খাতা দেখায় স্বচ্ছতার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি এবং অসঙ্গতি পাওয়া গেলেই সেগুলো নিয়ে আপনাদের ছাত্র-ছাত্রীরা তারা রি-এক্সামিন করতে পারে। তখন আগামী দিনে কী হয়েছে, সেটা আমরা বলতে পারব। এসএসসি পরীক্ষার পুনর্নিরীক্ষায় ফলাফলে অনেক পরিবর্তন আসার কথা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ১৩ লাখ খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য এসেছিল। এর মধ্যে ৪৫ হাজারের গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে এবং ৫ হাজার জন ফেল থেকে পাস করেছে। আর ৩ হাজার ৭৯ জন বেশি জিপিএ-৫ পেয়েছিল।
এই পরিবর্তনের কারণ খতিয়ে দেখার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক রেজাল্ট চেঞ্জ হয়েছে, এবার কী অবস্থা হয়। আমাদের শিক্ষকদের, এক্সামিনারদের কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না সেটা আমরা দেখি। তো আপাতত আমরা বলতে পারি যে—এই রেজাল্টটি যতটা হয়েছে, যদিও আমরা উদ্বিগ্ন, কিন্তু রেজাল্টে ত্রুটি আছে কি-না, সেই বিষয়ে আমরা এখনো নির্ধারণ করতে পারিনি। রি-এক্সামিন করার পর বোঝা যাবে।
চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে, সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। মোট পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন পরীক্ষার্থী। গত বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ওই বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৬৯ হাজার ৯৭ জন।
এদিকে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনে রাজধানীর মিষ্টির দোকানগুলোতে এবার প্রত্যাশিত ভিড় দেখা যায়নি। পাসের হার কমে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাসও ছিল তুলনামূলক কম। এর প্রভাব পড়েছে মিষ্টি বিক্রিতে। প্রত্যাশা অনুযায়ী বিক্রি না হওয়ায় কিছুটা হতাশ ব্যবসায়ীরা। তবে আগামী এক-দুই দিনে বিক্রি বাড়বে বলে আশা করছেন তারা। গতকাল শনিবার ফল প্রকাশের পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মিষ্টির দোকান ঘুরে দেখা যায়, কিছু শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মিষ্টি কিনতে এলেও অন্যান্য বছরের মতো ক্রেতাদের ভিড় ছিল না। সকাল থেকে কয়েক দফা বৃষ্টিও ক্রেতাদের উপস্থিতি কমার একটি কারণ বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বিজয়নগরের মুসলিম সুইটসের ক্যাশিয়ার রফিকুল ইসলাম বলেন, এবার পাসের হার কম হওয়ায় মিষ্টি বিক্রি নিয়ে কিছুটা শঙ্কা ছিল। তবে প্রস্তুতি হিসেবে তারা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি মিষ্টি তৈরি করেছিলেন। সেই অনুপাতে বিক্রি হয়নি। সার্বিকভাবে বিক্রি কিছুটা বেড়েছে। তবে যে পরিমাণ বিক্রির আশা করেছিলেন, তা পূরণ হয়নি।
মালিবাগের বনফুল সুইটসেও ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। দোকানটির ব্যবস্থাপক জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বিক্রি কম। ফল প্রকাশের পরপরই মিষ্টির দোকানগুলোতে যে ভিড় তৈরি হয়, এবার তেমন চিত্র দেখা যায়নি। তবে মেয়ের ভালো ফলের আনন্দ পরিবারের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে মিষ্টি কিনতে এসেছেন অভিভাবক রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, মেয়ের ফল ভালো হয়েছে। তাই পরিবারের সবাই মিলে মিষ্টি কিনতে এসেছেন। তবে এবার অনেক শিক্ষার্থীর ফল প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। এ কারণে হয়তো আগের মতো মিষ্টি কেনার উৎসাহ দেখা যাচ্ছে না।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মূল সড়ক থেকে অলিগলি পর্যন্ত রয়েছে প্রাণ গ্রুপের মিষ্টির ব্র্যান্ড মিঠাইয়ের বিক্রয়কেন্দ্র। মালিবাগের আবুল হোটেল এলাকার মিঠাই বিক্রয়কেন্দ্রের ইনচার্জ আব্দুল কাদের বলেন, পরীক্ষার ফল উপলক্ষে মিষ্টি বিক্রি আগামীকাল ও পরশু পর্যন্ত চলবে। ফলে সামনের দুই দিনে বিক্রি বাড়তে পারে।
ব্যবসায়ীরা জানান, সাত-আট বছর আগেও এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি মিষ্টি বিক্রি হতো। করোনার পর সেই বিক্রি কমে প্রায় দ্বিগুণে নেমে এসেছে। ফল প্রকাশকে কেন্দ্র করে মিষ্টি কেনার প্রচলন দীর্ঘদিনের হলেও এবার প্রথম দিনেই সেই চেনা চিত্র দেখা যায়নি। ছুটির দিন শেষে অফিস-আদালত খুললে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে মিষ্টি কেনার প্রবণতা বাড়তে পারে। পরবর্তী এক-দুই দিনেও ফল উদ্যাপন চলবে। এতে বিক্রির ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার আশা করছেন তারা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









