সৌরবিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, সবুজ নির্মাণ সমাধান ও আধুনিক প্যাকেজিং প্রযুক্তিতে ব্যাপক সাড়া জাগিয়ে শেষ হয়েছে তিন দিনব্যাপী ১৫তম আন্তর্জাতিক বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনোভেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এক্সপো অ্যান্ড ডায়ালগ-২০২৬ এবং ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্যাকেজিং এক্সপো। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এ প্রদর্শনীতে তিনদিনে প্রায় আট হাজারের বেশি ব্যবসায়িক দর্শনার্থী, শিল্প উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি সরবরাহকারী, তৈরি পোশাক খাতের প্রতিনিধি, টেকসই কৃষির উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা পরিদর্শন করেন। প্রদর্শনীতে ১২টি দেশের প্রায় ১৪০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। তারা বিদ্যুৎ, জ্বালানি, অবকাঠামো উন্নয়ন, সবুজ নির্মাণ, শিল্প প্রযুক্তি, প্যাকেজিং, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা প্রদর্শন করে।
আয়োজকরা জানান, এবারের প্রদর্শনীতে সৌরবিদ্যুৎ, রুফটপ সোলার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি-সাশ্রয়ী জেনারেটর প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণ, আধুনিক অবকাঠামো প্রযুক্তি এবং টেকসই প্যাকেজিং সমাধানের প্রতি দর্শনার্থীদের আগ্রহ ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের মধ্যে সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিয়ে বেশি আগ্রহ দেখা গেছে।
আয়োজক প্রতিষ্ঠান এক্সপোনেট এক্সিবিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল হক বলেন, এই প্রদর্শনী কেবল পণ্য প্রদর্শনের আয়োজন নয়; এটি ব্যবসায়িক সংযোগ, প্রযুক্তি বিনিময়, বিনিয়োগ সম্ভাবনা এবং জ্ঞানভিত্তিক আলোচনার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, অবকাঠামো, সবুজ নির্মাণ প্রযুক্তি ও প্যাকেজিং খাতের দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক জায়গায় আনাই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য। তিনি আরো বলেন, তিন দিনে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি এবং উদ্যোক্তাদের আগ্রহ প্রমাণ করে, বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি-দক্ষ প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প সমাধানের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
রাশেদুল হক দৈনিক এদিনকে বলেন, আমরা যখন এটা প্রথমে শুরু করি ২০০৯ সালে তখন বাংলাদেশে গ্রিন ফ্যাক্টরি নিয়ে তেমন কারো ধারণা ছিল না। প্রথম বছর আমরা যখন এ ধরনের প্রদর্শনী করি তখন খুব ছোট পরিসরে আয়োজন ছিলো। এরপর আমাদের বাংলাদেশে গ্রিন এনার্জি নিয়ে একটা ভালো রেভ্যুলেশন হয়। প্রথমে যখন অনেক কোম্পানিতে এ প্রদর্শনীর ব্যাপারে যেতাম তখন গ্রিন শুনলেই তারা নাক শিটকাতো। এখন প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠান নিজেকে গ্রিন বলে পরিচয় দিতে চায়। যে কোনো ব্যবসা করতে গেলে আপনাকে পরিবেশ ও এর নিয়মকে অবশ্যই মানতে হবে। পরবেশের নিয়মকে যদি মানতে হয় তাহলে পানি এবং এনার্জিকে সাশ্রয় করতে হবে আর প্রক্রিয়াই হলো গ্রিন। সূর্যের আলোকে বেশি ব্যবহার করা, পানির ব্যবহারকে কমিয়ে নিয়ে আসা, জ্বালানি বা ফুয়েলের ব্যবহারকে কমিয়ে আনা। কারণ ২০৫০ সালের মধ্যে আমাদের ৭০ শতাংশ কার্বন রিডাকশন করতে হবে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত হওয়া কঠিন। এমনকি জাহাজের ব্যবসা যদি পরিবেশ বান্ধব না হয় তাহলে কার্বন ট্যাক্স দিতে হবে অর্থাৎ পানি ও জ্বালানির ব্যবহারের মাত্রা কমাতে আমাদের এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া। শুরুর দিকে ১২টা কোম্পানি নিয়ে প্রদর্শনী শুরু করে আলহামদুলিল্লাহ এখন আমাদের সাথে দেশ-বিদেশি মিলে ১৪০টি কোম্পানি এই প্রদর্শনীতে যুক্ত। তখন এক হাজার স্কয়ার ফিট জায়গা নিয়ে শুরু হলেও এখন প্রয়োজন হচ্ছে ছেচল্লিশ হাজার স্কয়ারফিটের বড় পরিসরের যায়গা।
তিনি আরো বলেন, সরকারের পাওয়ার সেল এবং স্রেডার সাথে আমরা দীর্ঘদিন এক্সিবিউশন করে আসছিলাম। যে কারণে পূর্বের সফলতা দেখে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী আমাদের এখানে এসেছিলেন এবং সরকার পুরোপরি সহযোগিতা করছে। সোলার সিস্টেম থেকে আগামী পাঁচ বছরে দশ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা সেটাও কিন্তু এখানে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলে গিয়েছেন। তবে এবার আমাদের সবচেয়ে বেশি মিডিয়া সাপোর্ট আমরা পেয়েছি কোনো কোনো মিডিয়া আমাদের নিউজকে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। অন্য যে কোনোবারের চেয়ে এবারের মিডিয়া কাভারেজ ভালো ছিল, এটা আমাদের বড় পাওয়া।
আর এ মিডিয়া কাভারেজের মাধ্যমে গ্লোবাল ইনভেস্টররা আমাদের দেশের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। এই যে মন্ত্রী বলেছেন, পাঁচ বছরে দশ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা এটাকে ফোকাস করে এতে যে ইনভেস্টমেন্ট দরকার তারা মানে বিদেশি কোম্পানিগুলি এখন প্রস্তুতি নিচ্ছে। দৈনিক এদিন আমাদের মিডিয়া পার্টনার হিসেবে আমাদের যে কাভারেজ করেছে ভবিষ্যতে এদিনের এই রিপোর্ট আমাদের রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগবে। এদিনকে অবশ্যই আমরা আন্তরিক ধনবাদ জানাতে চাই, কারণ আমাদের নিয়ে এদিনে পরিপূর্ণ নিউজ দিয়েছে। অনেকেই এই প্রদর্শনীকে শুধু মেলা হিসেবে মনে করে এদিন তা সঠিকভাবে তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে এদিনকে সারাবছরই আমরা মিডিয়া পার্টনার হিসেবে রেখে কাজ করতে চাই। আমরা আমাদেরও প্রচার করব তাঁদেরও আমরা প্রমোট করব।
বিআরবি গ্রুপের ম্যানেজার মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, এক্সপোনেট এক্সিবিশনের মতো আন্তর্জাতিক মানের আয়োজন বর্তমান ব্যবসায়িক বিশ্বে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম। এখানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পণ্য, প্রযুক্তি ও সেবাকে সরাসরি বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী, ব্যবসায়ী, করপোরেট প্রতিনিধি এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরতে পেরেছি। বিশেষ করে এ আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের ব্র্যান্ডের প্রচার ও পরিচিতি বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ভবিষ্যতে ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরো বলেন, প্রদর্শনীতে আগত দর্শনার্থীদের আগ্রহ, পণ্যের প্রতি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ আমাদের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। বর্তমানে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে শুধু মানসম্মত পণ্য উৎপাদন করলেই হয় না, কার্যকর প্রচার-প্রচারণা এবং গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এক্সপোনেট এক্সিবিশন সেই সুযোগটি তৈরি করেছে। বিআরবি গ্রুপ সবসময় গ্রাহকদের আস্থা ও চাহিদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য এবং উন্নত সেবার মাধ্যমে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করাই আমাদের লক্ষ্য। এ ধরনের আয়োজন ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নয়ন, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং ব্র্যান্ড ভ্যালু বৃদ্ধিতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
এক্সপো নেট এক্সিবিউশনে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ওমেরা গ্রুপের ব্র্যান্ডিং ডিপার্টমেন্টের এক্সিকিউটিভ আজিজ বলেন, এক্সপোনেট এক্সিবিশনের মাধ্যমে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নতুন ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। ওমেরা গ্রুপ সবসময় আধুনিক ও মানসম্পন্ন সেবা নিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছাতে কাজ করছে। এ আয়োজন আমাদের ব্র্যান্ডকে আরো বিস্তৃত পরিসরে উপস্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছে।
ওমেরা সোলারের এক প্রতিনিধি জানান, শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ ব্যয় কমানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা রুফটপ সোলার, হাইব্রিড এনার্জি সল্যুশন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থার বিষয়ে বেশি জানতে চেয়েছেন। তিনি বলেন, সরকার আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে নীতিমালা করলে এই খাতে বিনিয়োগ আরো বাড়বে। এতে শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন এবং কৃষিভিত্তিক স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
তৈরি পোশাক খাতের দর্শনার্থী ফিরোজ আলম বলেন, কারখানায় বিদ্যুৎ ব্যয় কমানো এখন আমাদের জন্য বড় বিষয়। সৌরবিদ্যুৎ ও জ্বালানি-দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহার করলে উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব হবে।
টেকসই কৃষি খাতের উদ্যোক্তা জিল্লুর রহমান বলেন, সেচ, কোল্ড স্টোরেজ এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা গেলে কৃষি খাত আরো লাভজনক ও টেকসই হবে।
একই ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্যাকেজিং এক্সপোতে পরিবেশবান্ধব, পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং রপ্তানিমুখী প্যাকেজিং প্রযুক্তির প্রতি উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকদের আগ্রহ দেখা যায়। সংশ্লিষ্টরা বলেন, প্যাকেজিং এখন শুধু পণ্যের মোড়ক নয়; এটি পণ্যের মান, ব্র্যান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্যাকেজিং এক্সপো যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন এবং এক্সপোনেট এক্সিবিশন প্রাইভেট লিমিটেড। এ এক্সপোর কো-স্পন্সর ছিল টাম্পাকো গ্রুপ। অন্যদিকে বিআইআইডি এক্সপোর স্পন্সর ছিল আরআর কেবল, ব্রাইট পাওয়ারটেক ও রান পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং। তিন দিনব্যাপী আয়োজনের মিডিয়া পার্টনার ছিল ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ—এফইআরবি।
আয়োজকরা জানান, প্রদর্শনীতে ব্যবসায়িক সংযোগ, প্রযুক্তি প্রদর্শন, বিনিয়োগ আলোচনা এবং শিল্পখাতের আধুনিক সমাধান নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে মতবিনিময় হয়েছে। এ ছাড়া দুবাই ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো এবং বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিলের উদ্যোগে কয়েকটি বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনী শেষে আয়োজকরা বলেন, বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, সবুজ নির্মাণ এবং আধুনিক প্যাকেজিং খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজন আরো বৃহৎ পরিসরে করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে দেশের শিল্প খাত টেকসই, জ্বালানি-সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সঙ্গে আরো দ্রুত যুক্ত হতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









