প্রথম বেতন, প্রথম বাড়ি ভাড়া, প্রথম ক্রেডিট কার্ড কিংবা হঠাৎ কিছু কিনে পরে আফসোস করা—এসব অভিজ্ঞতার পাশাপাশি এ সময়েই শুরু হতে পারে প্রথম বিনিয়োগ। এই বয়সে অর্থ ব্যবস্থাপনা একই সঙ্গে আনন্দের ও বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে। এক মাস বেতন পাওয়ার পর নিজেকে সচ্ছল মনে হলেও কয়েক দিন পরই মনে হতে পারে, এত টাকা কোথায় খরচ হয়ে গেল।
তবে সম্পদ গড়ার জন্য শুরুতেই বড় অঙ্কের বেতন পাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং প্রয়োজন এমন কিছু আর্থিক অভ্যাস গড়ে তোলা, যা দীর্ঘ মেয়াদে কাজে আসবে। যত তাড়াতাড়ি এসব অভ্যাস আয়ত্ত করা যাবে, ভবিষ্যতে আর্থিক জীবন তত সহজ হবে। কুড়ির দশকেই গড়ে তোলা উচিত এমন ৯টি আর্থিক অভ্যাস তুলে ধরা হলো।
অন্যদের খরচ মেটানোর আগে নিজের জন্য সঞ্চয় করুন
বেশির ভাগ মানুষ মাসের শেষে খরচের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা সঞ্চয় করেন। কিন্তু এতে সাধারণত খুব বেশি অর্থ জমে না। এর পরিবর্তে বেতন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সঞ্চয়ের জন্য নির্দিষ্ট অর্থ আলাদা করে রাখা উচিত। আয়ের ১০ থেকে ২০ শতাংশ আলাদা ব্যাংক হিসাব বা বিনিয়োগে জমা রাখতে পারেন। অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে জীবনযাপনের অভ্যাস তৈরি করুন। সঞ্চয়কে ভবিষ্যতের জন্য প্রতি মাসের একটি বাধ্যতামূলক বিল হিসেবে বিবেচনা করুন।
টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে, তা জানুন
জটিল হিসাবের খাতা বা বাজেট তৈরির বিশেষ কোনো পদ্ধতি অনুসরণ না করলেও চলবে। তবে প্রতিদিনের খরচ সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। এক মাসের জন্য প্রতিটি খরচ লিখে রাখুন। চা-কফি, খাবার সরবরাহের খরচ, বিভিন্ন সেবার মাসিক মূল্য, কেনাকাটা কিংবা যাতায়াত—কোনো খরচই বাদ দেবেন না। এতে অনেকেই বুঝতে পারবেন, অপ্রয়োজনীয় ছোট ছোট খাতে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতা এড়িয়ে চলুন
বেতন বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই ভালো জিনিস কেনার ইচ্ছা তৈরি হয়। কিন্তু আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খরচও বাড়িয়ে দেওয়া বড় আর্থিক ভুলগুলোর একটি। এর পরিবর্তে বেতন বাড়ার সঙ্গে সঞ্চয়ের পরিমাণও বাড়ান। নিজের সাফল্য উপভোগ করুন, তবে প্রতিবার বেতন বাড়ার পর নতুন নতুন ব্যয়বহুল অভ্যাস গড়ে তুলে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করবেন না।
বিলাসী কেনাকাটার আগে জরুরি তহবিল গড়ুন
স্বপ্নের ভ্রমণ, দামি মুঠোফোন কিংবা নকশাদার ব্যাগ কেনার জন্য অপেক্ষা করা যায়। কিন্তু জরুরি প্রয়োজনে হাতে অর্থ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রত্যাশিত চিকিৎসার খরচ, চাকরি পরিবর্তন কিংবা পারিবারিক জরুরি পরিস্থিতিতে এই অর্থ কাজে আসবে। তাই কয়েক মাসের প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর মতো একটি জরুরি তহবিল গড়ে তুলুন। অর্থ এমন জায়গায় রাখুন, যেখান থেকে প্রয়োজনের সময় সহজেই তা পাওয়া যায়।
অল্প অর্থ দিয়েই বিনিয়োগ শুরু করুন
অনেকে মনে করেন, বিনিয়োগ শুরু করতে হলে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। এ ধারণা ঠিক নয়। কুড়ির দশকে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সময়। অল্প পরিমাণ অর্থ নিয়মিত বিনিয়োগ করলেও দীর্ঘ সময়ে তা বাড়তে পারে। তাই বড় অঙ্কের অর্থ জমার অপেক্ষা না করে সামর্থ্য অনুযায়ী বিনিয়োগ শুরু করুন। দেরিতে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করার চেয়ে আগে অল্প অর্থ দিয়ে শুরু করা অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হতে পারে।
চাহিদা ও প্রয়োজনের পার্থক্য বুঝুন
সব কেনাকাটাই ভুল নয়। তবে কোনো কিছু কেনার আগে সেটি কেন প্রয়োজন, তা ভেবে দেখা জরুরি। আপনি কি প্রয়োজনীয় কোনো জিনিস কিনছেন, নাকি একঘেয়েমি কাটাতে কেনাকাটা করছেন? পণ্যটি কি সত্যিই আপনার পছন্দ, নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের ব্যবহার করতে দেখে কেনার ইচ্ছা হচ্ছে? অপ্রয়োজনীয় কিছু কেনার আগে একটু সময় নিয়ে ভাবলে অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব।
আয়ের একাধিক উৎস তৈরির চেষ্টা করুন
চাকরির বেতন গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই আয়ের একমাত্র উৎস হতে হবে, এমন নয়। কুড়ির দশকে অনেকেই মূল চাকরির পাশাপাশি স্বাধীনভাবে কাজ, শিক্ষকতা, বিষয়বস্তু তৈরি, পরামর্শ প্রদান কিংবা ডিজিটাল পণ্য বিক্রির মাধ্যমে বাড়তি আয় করেন। অতিরিক্ত আয়ের উৎস থাকলে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি আর্থিক চাপও কমানো যায়। রাতারাতি ব্যবসা গড়ে তোলার প্রয়োজন নেই। বরং মূল চাকরির বাইরে আয় করতে সহায়ক দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করুন।
ঋণ নেওয়ার আগে শর্ত ভালোভাবে বুঝুন
সব ঋণ খারাপ নয়। তবে ঋণ নেওয়ার আগে এর শর্ত ও পরিশোধের নিয়ম ভালোভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি। ঋণ বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের আগে সুদের হার, কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা এবং নির্ধারিত সময়ে টাকা পরিশোধ করতে না পারলে কী ধরনের আর্থিক প্রভাব পড়তে পারে, তা জেনে নিন। কোনো কিছু কেনার আনন্দ কয়েক মাস ধরে কিস্তি পরিশোধের চাপের কারণে ম্লান হয়ে যেতে পারে। তাই প্রয়োজন ও সামর্থ্য বিবেচনা করেই ঋণ নিন।
টাকা-পয়সা নিয়ে আলোচনা করতে সংকোচ করবেন না
অনেকে বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক, কর্মজীবন কিংবা ভ্রমণ নিয়ে আলোচনা করলেও অর্থ নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন। অথচ বেতন, বিনিয়োগ, কর ও আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা থেকে অনেক কিছু শেখা যায়। নিজের আর্থিক অবস্থার সব তথ্য অন্যদের জানানো জরুরি নয়। তবে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে শেখার মানসিকতা থাকলে অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা বাড়বে এবং আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সচেতন হওয়া সম্ভব হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









