কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) নিয়ে আলোচনা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর বাংলাদেশ ও কোরিয়া বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বেসরকারি খাতের সহযোগিতা বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি খাতের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে সম্মত হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার সিউলে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী জুং-সুং পার্কের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী এবং ইআরডি ও ইনভেস্ট বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রস্তাবিত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও ব্যবসায়িক চেম্বারের প্রতিনিধিরা থাকবেন। গ্রুপটি অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার, বিনিয়োগের সুযোগ, ব্যবসা সহজীকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্র চিহ্নিত করবে।
বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সিইপিএ নিয়ে আলোচনা সম্পন্ন হওয়ায় বাংলাদেশ-কোরিয়া অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও গতিশীল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের এখন সুযোগ রয়েছে প্রচলিত বস্ত্র ও তৈরি পোশাকনির্ভর অংশীদারিত্বের গণ্ডি পেরিয়ে কোরিয়ার সঙ্গে আরও বিস্তৃত ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার।
তিনি ইলেকট্রনিক্স ও সেমিকন্ডাক্টর, জাহাজ নির্মাণ ও সামুদ্রিক শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল ও সৃজনশীল শিল্পকে সহযোগিতার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া জ্বালানি, ওষুধ, মেডিকেল ডিভাইস, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস, আধুনিক উৎপাদনশিল্প ও অবকাঠামো খাতে কোরীয় বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে চলমান উদ্যোগ সম্পর্কে কোরীয় পক্ষকে অবহিত করে মন্ত্রী বলেন, মূলধন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন, ইলেকট্রনিক্স শিল্পের কাঁচামালের ওপর শুল্ক ২৬ শতাংশ থেকে শূন্যে নামিয়ে আনা এবং কাস্টমস ও বন্দর কার্যক্রম সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৌশলগত অবকাঠামো, জ্বালানি ও অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক বিনিয়োগ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে সরকার-টু-সরকার (জি টু জি) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেলের ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী জুং-সুং পার্ক বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বের প্রতি তার দেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী কোরীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন সমস্যা ও আগ্রহের বিষয় তুলে ধরে তিনি জানান, এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ সহজ করতে বিষয়গুলোর একটি সমন্বিত তালিকা বাংলাদেশ সরকারের কাছে দেওয়া হবে।
কোরীয় কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ সম্ভাবনা অনুসন্ধান-
সফরের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল হুন্দাই গ্লোভিস, হানওয়া ওশান ও স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
হুন্দাই গ্লোভিসের প্রেসিডেন্ট লি কিউ-বকের সঙ্গে বৈঠকে লজিস্টিকস, বন্দর উন্নয়ন ও অটোমোটিভ খাত নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ পক্ষ লজিস্টিকস হাব, বন্দর, অর্থনৈতিক ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল, অটোমোটিভ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং স্মার্ট লজিস্টিকস খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরে। হুন্দাই গ্লোভিস বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা অনুসন্ধানে আগ্রহ প্রকাশ করে। এ বিষয়ে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নিতে উভয় পক্ষ ওয়ার্কিং-লেভেল টিম গঠনে সম্মত হয়েছে।
হানওয়া ওশানের সঙ্গে বৈঠকে জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ মেরামত, ড্রাই-ডকিং, সামুদ্রিক অবকাঠামো এবং ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। প্রতিষ্ঠানটি প্রথম পর্যায়ে জাহাজ মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের কাজ শুরু করে পরবর্তী সময়ে উচ্চমূল্য সংযোজিত জাহাজ নির্মাণ ও অন্যান্য সামুদ্রিক কার্যক্রমে সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেয়। এ বিষয়ে পরবর্তী কারিগরি আলোচনা ও ফলোআপ সফরের মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নিতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।
স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের প্রেসিডেন্ট কিম উ-জুনের সঙ্গে বৈঠকে ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল সংযোগ এবং দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বাংলাদেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান চালুর সম্ভাবনা অনুসন্ধানে স্যামসাংকে আহ্বান জানান। প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্টও বাংলাদেশে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত সহযোগিতার সম্ভাবনা অনুসন্ধানে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সিইপিএ পরবর্তী সুযোগকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দিতে বাংলাদেশ কোরিয়া সরকার ও দেশটির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্পের বহুমুখীকরণ, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা বাড়ানোই দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









